পারিবারিক সংকট মোকাবিলায় নারীর ক্ষমতায়ন

জিনাত আরা আহমেদ: পরিবারের সংকট-সন্তাপ, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্যÑসব ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি যেন অপরিহার্র্য।  পারিবারিক বিপর্যয়, ভাগ্যবিড়ম্বনা, পরিবারের কারও অসুস্থতা অথবা সমস্যায় নারীকে একাই অনেক সময় হাল ধরতে হয়। এ সময় নারীর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এবং বলিষ্ঠ অবস্থান পরিবারকে সংকট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। পরিবারের বিভিন্ন সমস্যায় কোনো পুরুষ যতটা দায়িত্ব নিতে পারে, তার তুলনায় নারী অনেক বেশি দায়িত্বের সঙ্গে সব দিক সামলে ওঠে। সংসারে বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতি যোগ্যতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হলে নারীর ক্ষমতায়নের কোনো বিকল্প নেই।

উম্মে হাবিবার অল্প বয়সে বিয়ে হয়, বলতে গেলে বাল্যবিয়ে। তৃতীয় সন্তানটির জšে§র আগেই তার স্বামী মারা যান। এমন পরিস্থিতিতে তিনি চোখে অন্ধকার দেখেন। স্বামীর বেসরকারি সংস্থায় চাকরিকাল বিবেচনায় অফিস থেকে হাবিবা ১০ লাখ টাকা পেয়েছিলেন। নিজে কিছুটা হাতের কাজ জানতেন, তা-ই দিয়ে একটা ছোট বুটিক শপ চালু করলেন।  প্রথমে নিজে তারপর দুই কর্মী নিয়োগ করে ব্যবসা বাড়াতে থাকেন। এরই মধ্যে সন্তানদের পড়াশোনা এবং সংসার সামলানো সবকিছু করেছেন একাই। তিন সন্তানের সবাই এখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। সরকারিভাবে উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে হাবিবাও এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

আরেক নারী বিলকিস বানুর স্বামী হঠাৎ স্ট্রোক করে শয্যাশায়ী। একে তো একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটার চিকিৎসা ব্যয়, অন্যদিকে দুটি সন্তানের লেখাপড়াসহ সংসারের অন্যান্য খরচ। এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতিতেও ভেঙে পড়েননি বিলকিস বানু। যেটুকু লেখাপড়া জানতেন, তাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনলাইন ব্যবসা খুব সহজেই রপ্ত করে ফেলেন। বাড়িতে বসে স্বামীর দেখাশোনা, সন্তান প্রতিপালন এবং সংসারের কাজের পাশাপাশি অনলাইনে পণ্য বেচাকেনা চলতে থাকে। দিনে দিনে পরিচিতি বাড়তে থাকায় বিলকিস বানু এখন অনেকটাই স্বাবলম্বী। সমাজে এমন নানা ধরনের সংকটের সঙ্গে আমরা পরিচিত।

এটা সত্যি মানুষের জীবন সবসময় একরকমভাবে যায় না। একেকজনের জীবনে একেকভাবে পারিবারিক বিপর্যয় আসতে পারে। পরিবারে কারও মৃত্যু অথবা অসুস্থতা অনেক বড় সংকট। এর বাইরে আর্থিক অনিশ্চয়তাও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করে। এছাড়া সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের নতুন সমস্যা আসতে থাকে। অনেকের ক্ষেত্রে স্বামী ব্যবসায়ে লোকসান করে বড় অঙ্কে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তখন পরিবারে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়।

পরিবারের প্রধান হিসেবে স্বামীর অনুপস্থিতি নারীকে ব্যাপকভাবে ভারাক্রান্ত করে তোলে। প্রথমত, সন্তান থাকলে তার দেখাশোনা এবং দায়িত্ব পালন করতে হয় প্রধানত মাকে। আর্থিক বিষয়টা তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরকম পরিস্থিতিতে নারী কর্মজীবী হলে তার পক্ষে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে সন্তান মানুষ করা কিছুটা সহজ হয়। কিন্তু কর্মহীন হলে মাকে অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হয়, এটা তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। যেমনÑনারীর ইচ্ছার বাইরে আত্মীয়স্বজনের চাপে আবার বিয়েতে রাজি হওয়া অথবা সন্তানকে রেখে কাজে যোগদান। এক্ষেত্রে সন্তানের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। অথচ একটা শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী প্রজš§ গঠনে নারী, অর্থাৎ মায়ের অনেক অবদান রয়েছে। নারীরা তাদের যোগ্যতা অর্থাৎ মেধা, শ্রম, সাহসিকতা, শিক্ষা ও নেতৃত্ব দিয়ে সমাজ তথা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু ক্ষমতায়ন ছাড়া নারীর যোগ্যতার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না।

আমাদের দেশে নারী-পুরুষের সংখ্যা সমান হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতায়নে নারী এখনও পিছিয়ে। যোগ্যতার সঙ্গে পরিবার ও সমাজে অবস্থান তুলে ধরার মাধ্যমে কোনো নারীর ক্ষমতায়ন হয়ে থাকে। নারীর বড় নিরাপত্তা হলো তার আর্থিক সক্ষমতা। যেকোনো সংকটে প্রথমেই অর্থের সংস্থান জরুরি বিষয়, এরপর আসে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা। আর্থিক কারণে অনেক সময় যোগ্যতার তুলনায় যেনতেনভাবে কাজে নেমে পড়তে হয়, যা নারীকে কখনোই নিরাপত্তা দেয় না। তাই ক্ষমতায়নের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নারীর ক্ষমতায়নে শুধু শিক্ষিত নারী নয়, বরং শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া দরকার। আর্থিক সক্ষমতা এবং মানসম্মত শিক্ষা নারীকে সিদ্ধান্ত ও মতামত বাস্তবায়নে যোগ্য করে তোলে। এর ফলে নারী অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সার্বিক অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবে। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে ২০১১ সালে নারী উন্নয়ন নীতির লক্ষ্যই ছিল নারীর ক্ষমতায়ন। বিগত এক দশকে এই লক্ষ্য পূরণে অসংখ্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর সর্বশেষ সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০২০) অনুযায়ী সরকারের উদ্দেশ্য হলো, নারী-পুরুষ সমান সুযোগ ও সম-অধিকার। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে উভয়ের সমান অবদান থাকবে। এছাড়া আত্মনির্ভরশীল হিসেবে নারীর অগ্রযাত্রা নিশ্চিতকরণ। এক্ষেত্রে  সেবা, দক্ষতা, সম্পত্তি, আয় এবং কারিগরি ও আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে নারীর প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করায় অসংখ্য নারী আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পাশাপাশি নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেরও স্বত্বাধিকারী হয়েছেন।

শুধু লেখাপড়া জানলেই ক্ষমতায়ন হয় না, এর জন্য সাহসও জরুরি বিষয়। পারিবারিক সংকটে সঠিক সময়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা একজন নারীর যোগ্যতার প্রতিফলন। সমাজে বহুমুখী ব্যক্তিত্বের মানুষ রয়েছে। একেক রকমের সংকটে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে সাড়া দেয়। কেউ যোগ্যতার সঙ্গে মোকাবিলা করে সংকট কাটিয়ে ওঠে, আবার কেউ বিপর্যয়ে দিশাহারা হয়ে নিয়তিকে দোষ দেয়। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে যে নারী এটা করতে পারেন, তিনি ক্ষমতায়নে এগিয়ে থাকেন। যোগ্যতা মূল্যায়নের পারিপার্শ্বিক সব নিয়ামকের উপস্থিতি সত্ত্বেও কোনো নারী যেমন সাহস ও আত্মবিশ্বাসের অভাবে সমস্যার আবর্তে হারিয়ে যেতে পারেন, তেমনি শুধু এটুক থাকলেই অন্ধকারের বুক চিরে নারী বহুদূর এগিয়ে যান।

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য মূল্যায়নও জরুরি বিষয়। কারণ স্বীকৃতির মাধ্যমেই কোনো নারী আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন, ফলে সুচারুভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এ সবকিছুর প্রভাব পড়ে পরিবার ও সমাজে। পরিবারে নারীর ক্ষমতায়নের ফলে সন্তানেরা মায়ের আদর্শকে নিজেদের জীবনেও বাস্তবায়ন করতে উদ্যোগী হতে পারে। তাছাড়া সম্পদ ও আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে নারী ভালোভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেন। এভাবে নারী তার জীবনধারার পরিবর্তনে কাজ করতে সক্ষম হন। এতে করে সমাজে সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বের গুণাবলির বিকাশ ঘটে, যা উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন এঁকে দেয়।

পিআইডি নিবন্ধন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯২৭  জন  

সর্বশেষ..