মত-বিশ্লেষণ

পারিবারিক সহিংসতা আইনের আশ্রয় গ্রহণ ও প্রয়োগ

জুবায়ের আহমেদ: জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নারীর প্রতি সর্বপ্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ, ১৯৭৯’ ও ‘শিশু অধিকার সনদ, ১৯৮৯’-এ স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ২০১০ সালে নারী ও শিশুর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পারিবারিক সহিংসতা থেকে নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’ পাস করে। ওই আইনের লঙ্ঘন কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও পারিবারিক সহিংসতা থেকে নারী ও শিশুরা এখনও নিরাপদ নয়। বিশেষ করে স্ত্রীকে অধিকারবঞ্চিত করে রাখা, কন্যাসন্তানকে অধিকারবঞ্চিত করে রাখা, তাদের অধিকার প্রয়োগে বাধাদান এবং শিশুসন্তানকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের মধ্যে নারীকে ধর্মীয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইনেও বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনও স্ত্রীরা স্বামীর বাড়িতে নিরাপদ নয় স্বামী-শ্বশুর ও দেবর-ননদ দ্বারা নির্যাতনের শিকার হতে হয়, অবহেলার শিকার হতে হয়। শিশুসন্তানকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য কিংবা শাসনের নামে নির্যাতন করা হয়। একাধিক কন্যাসন্তানের জন্ম দিলে, কিংবা পুত্রসন্তানের জ দিতে না পারা স্ত্রীর দোষ হিসেবে গণ্য করে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়, তার অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করে রাখা হয়। কন্যাশিশুকে অনাদর-অবহেলায় ফেলে রাখা হয়। পারিবারিক সহিংসতা এমনই ভয়ানক কর্মকাণ্ড যে, এসব অপরাধকে পারিবারিক বিষয় হিসেবে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে আমাদের সমাজব্যবস্থা। এর ফলে নারী ও শিশু নীরব অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

২০১৭ সালে বিশ্বে মোট ৮৭ হাজার নারীকে হত্যা করা হয়েছে। তার মধ্যে ৫৮ শতাংশ খুন হয়েছে একান্ত সঙ্গী অথবা পরিবারের সদস্যদের হাতে। অ্যাকশানএইড বাংলাদেশের এক গবেষণার তথ্যমতে, বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার দুই-তৃতীয়াংশই হয় পারিবারিক পরিমণ্ডলে। আর সহিংসতার প্রায় ৯৭ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়ে যায় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বিবাহিত নারীর ৮০ শতাংশই নির্যাতনের শিকার হয় স্বামী দ্বারা। এছাড়া শ্বশুর-শাশুড়ি-দেবর-ননদদের দ্বারাও নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয় নারী।

বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী পূর্ণ অধিকার কখনও পায়নি। নারী শিক্ষার হার বাড়লেও তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সম্মান জানানো, সম্পদের অংশ প্রদান এবং পরিবারে তাদের পূর্ণ অধিকার বাস্তবায়নে স্বয়ং বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবারের সদস্যরাই। এর জন্য সমাজও কম দায়ী নয়। পারিবারিক সহিংসতা আইনের বিষয়টি শুধু পরিবারের অন্যান্য সদস্যের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে হলেও এর সঙ্গে জড়িত আছে সমাজের ভুল প্রচলিত নিয়মকানুনও। নারী মানেই ভোগের বস্তু এবং ঘরে থাকার মানুষ মনে করে সমাজে নারীদের নিয়ে যে ভুল রীতিনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, তা থেকে বের হওয়াও জরুরি। এর জন্য সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারের সদস্যদেরই। নারীর প্রতি সব ধরনের পারিবারিক সহিংসতা পরিহার করে নারীকে তার স্বাধীন মতামত গ্রহণের সুযোগ এবং পরিবারের ওপর তার অধিকার প্রয়োগের সুযোগ করে দিতে হবে কোনো ধরনেরর প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। পাশাপাশি কন্যাসন্তান অভিশাপ নয়, সম্পদ এবং নারী-পুরুষের মধ্যে ধর্মীয়ভাবেও কোনো বৈষম্য নেই, এই সত্যটি হƒদয়ে ধারণ করতে হবে।

পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাগুলোয় আইনের আশ্রয় গ্রহণ করে খুব কম সংখ্যক নারী, কিংবা আইনের আশ্রয় গ্রহণ করলেও তা নিষ্পত্তি হয়ে যায় অপরাধ প্রমাণের আগেই। এটি নারীর উদারতার অংশ হলেও নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না, বরং বাড়ছেই দিন দিন। ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’-এ নারী ও শিশুর সব অধিকার সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং ওই আইনের লঙ্ঘনের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। নারী ও শিশুর অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা ও কার্যক্রম গ্রহণের পদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। এই অবস্থায় পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়া ব্যক্তিরা ওই আইনের আশ্রয় নিতে পারে এবং একই সঙ্গে আদালতসহ সব দায়িত্ববান মানুষকে পারিবারিক সহিংসতার শিকার সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এই আইন বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য রোধ করার বিকল্প নেই।

শিক্ষার্থী

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম), ঢাকা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..