মত-বিশ্লেষণ

পার্থক্য শুধু গ্রাম আর শহরের, মেধার নয়

শতাব্দী জুবায়ের: এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে সম্প্রতি। অনেক শিক্ষার্থীর বাবা-মা, অভিভাবক আনন্দে আত্মহারা হয়েছেন, অনেকে শোকে নিস্তব্ধ হয়ে আছেন। কারণ, তাদের সন্তান জিপিএ-৫ পেয়েছে অথবা পায়নি। জিপিএ-৫ এখন এমন এক প্রত্যাশা হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, সবার এটা চাই-ই। এটা যেন সামাজিকভাবে ছোট করছে পরিবারকে। তাই জিপিএ-৫ চাই-ই চাই যে কোনোভাবেই হোক। তাই পরীক্ষার আগে বা ফল প্রকাশের পর আশানুরূপ ফল না হলে যেন অনাকাক্সিক্ষত এক ক্ষতি হয়ে যায় পরিবারের। তাই ফল খারাপের সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানেরও খারাপ সম্পর্ক তৈরি হয়।
এদিকে খারাপ ফল হলে ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া যায় না। এটা ভালো ফলের আরেক দিক। তাই ভালো ফল করতেই হবে। এই খারাপ ফলের প্রভাব শহরের চেয়ে গ্রামে বা মফস্বলে বেশি। এখানে ফল খারাপ হওয়ার নানাবিধ কারণ আছে। খারাপ ফল হওয়ায় গ্রাম থেকে শহরের ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া সম্ভব হয় না। তাই কারণে-অকারণে পিছিয়ে পড়ে গ্রামের শিক্ষার্থীরা। একটি কথা বলতে চাই: পার্থক্য শুধু গ্রাম আর শহরের, মেধার নয় এটা মাথায় রাখতে হবে। তাদের ভালো সুযোগ-সুবিধা দিলে তারাও জিপিএ-৫ পেত, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এই পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য এগিয়ে আসা দরকার সরকারের। গ্রাম-শহর সব স্থানে সমান সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা অতিব জরুরি আগামীর সুবর্ণ স্বর্ণালি বাংলাদেশের জন্য।
আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়; ভালো ফলে নতুন সংশয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তির জন্য চাহিদার চেয়েও প্রায় সাড়ে ১২ লাখ আসন বেশি আছে। তারপরও আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তায় আছে সর্বোচ্চ ফল জিপিএ-৫ প্রাপ্তরা। কারণ, দেশের মানসম্মত প্রায় পৌনে ২০০ কলেজের ৫০ হাজারের মতো আসনের বিপরীতে এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৯৪ শিক্ষার্থী। সে হিসেবে জিপিএ-৫ পেয়েও প্রায় অর্ধলাখ শিক্ষার্থী প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাবে না। এদের অধিকাংশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। ফলে মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া নিয়ে রয়েছে উৎকণ্ঠা। শুরু হয় অসুস্থ প্রতিযোগিতা। কারণ, সন্তান কোন কলেজে পড়ছে এটা যেন পারিবারিক অহংকার আর গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমার ছেলে স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে পড়ে, আমার মেয়ে এখানে পড়ে। কিন্তু কলেজ কি কারও ফল ভালো করে দিতে পারে? যদি শিক্ষার্থীরা নিজে না পড়ে। অবশ্য পরিবেশ মানুষকে অনেক পরিবর্তন করে দেয়, তা সত্য। তাই সবার একই আকাক্সক্ষা ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া। কিন্তু যে সংখ্যক জিপিএ-৫ এ বছর শিক্ষার্থীরা পেয়েছে, সবার জন্য ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিশেষ করে যারা গ্রামে, তাদের ফলের করুণ অবস্থা। কারণ, শহরে যে রকম সুযোগ-সুবিধা, সেরকম সুবিধা গ্রাম বা মফস্বল শহরগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই। তাই গ্রামের শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে থাকে নানা দিক দিয়ে। কিন্তু গ্রামের শিক্ষার্থীদের মেধা কমÑসেটা বলা যায় না। সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ-সুবিধা পেলে তারা ভালো ফল করত, তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। এ অবস্থায় জেলা ও জেলার বাইরের মফস্বল এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
যারা জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাদের বেশিরভাগই শহরের। কারণ, তাদের কোচিং-প্রাইভেটের মাধ্যমে সেভাবে তৈরি করা হয়েছে। শহরের স্কুলগুলোয় সুযোগ-সুবিধাও বেশি। তাই তারা ভালো ফল করছে। সীমিত সুবিধা নিয়ে তারা চেষ্টা করছে ভালো করার। গ্রামের একটি ছেলের সঙ্গে শহরের ভালো স্কুলের ছেলের মধ্যে মেধার কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য হলো কেবল সুযোগ-সুবিধার। তাই এসব মেধাবীকে সামনে এগিয়ে নিতে গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
গ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ শিক্ষকের অভাব, বিশেষ করে ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে ভালো শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা শহরের ভালো প্রতিষ্ঠানমুখো হয়। ফলে শহরের মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য ভিড় বাড়ে। তাই মফস্বলের স্কুলগুলোর মান কীভাবে বাড়ানো যায় সে চেষ্টা করা উচিত সরকারকে। যদি মফস্বলে সার্বিক সুবিধা দেওয়া যায়, তাহলে শহরমুখো শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন কমবে, তেমনি শহর আর গ্রামের যে বৈষম্য সেটি দূর হবে। গ্রামের শিক্ষার্থীরাও এগিয়ে যাবে। দৃঢ়চিত্তে আবারও বলতে চাই গ্রাম আর শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পার্থক্য শুধু সুযোগ-সুবিধার, মেধার নয়। তাই তাদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত। সুন্দর, সুষ্ঠু পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা পেলে তারাও এগিয়ে যাবে। গ্রামের শিক্ষা যথার্থভাবে এগিয়ে গেলেই সত্যিকারভাবে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..