মত-বিশ্লেষণ

পাহাড়ধসে মৃত্যু রোধে পূর্বসতর্কতা প্রয়োজন

আমাদের দেশে প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে ভারী বর্ষণে বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ঘটে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি হলেও বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে নতুন বসতি গড়ে উঠছে। এক্ষেত্রে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধস বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রতি বছরই এর পাহাড়ি অঞ্চল থেকে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঠেকাতে নেওয়া হয় না দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। ফলে পাহাড় ও দেয়ালধসে মৃত্যু ঘটছেই।
গত ১৩ অক্টোবর রাতে সংঘটিত মর্মান্তিক ঘটনার কথা অনেকের মনে থাকবে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ভারী বর্ষণের পর চট্টগ্রাম মহানগরীর আকবর শাহ থানাধীন পূর্ব ফিরোজ শাহ কলোনি এবং পাঁচলাইশ থানাধীন রহমান নগর এলাকায় দেয়াল ধসে যাওয়ায় একজনের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১৩ অক্টোবর দিবাগত রাত ২টায় ফিরোজ শাহ কলোনিতে পাহাড় ধসে গিয়ে ঘরের ওপর পড়লে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু হয়। এর আগে রাত ১টায় মাহানগরীর রহমাননগর এলাকায় দেয়াল ধসে যাওয়ায় নিহত হন আরেকজন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে নিহত হন ১২৭ জন।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ৩০টি পাহাড়ে স্বল্প ও বেশি ঝুঁকিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কমবেশি ১০ লাখ বলে ধারণা। স্থায়ী ও কঠোর কোনো উদ্যোগ না থাকায় দিন দিন এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বাড়ছে।
২০০৭ সালের ১১ জুন সংঘটিত দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি পাহাড়ে মৃত্যু ঠেকাতে ৩৬ দফা সুপারিশ দেয়। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড় দখলমুক্ত করে বনায়ন, ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের পুনর্বাসন, পাহাড় কাটা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা, পাহাড় ইজারাদান ও দখল বন্ধ করা। কিন্তু সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই প্রতীয়মান। নইলে কেন প্রতিবছর পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটবে? এটি ঠিক, ঝুঁকিপূর্ণভাবে যারা বসবাস করে, ঘটনার জন্য তাদেরও দায় রয়েছে। এদের একদিক থেকে তুলে দিলে অন্যদিকে গিয়ে আবার ঘর তোলে, কিংবা বৃষ্টি কমলে আবার গিয়ে একই জায়গায় বসবাস শুরু করে। আবার স্থানীয় প্রভাবশালীরা পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি বানায়। এক থেকে দু’হাজার টাকায় এখানে ঘর ভাড়া পাওয়া যায়। নিন্মআয়ের লোকজন অনেকটা নিরুপায় হয়ে সেখানে থাকছে। এটি ঠেকাতে স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
পাহাড় ধস ঠেকাতে প্রশাসনিক কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি পাহাড় কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ আদালতও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে নজরদারির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। পাহাড়ধসে প্রাণহানির পর তাৎক্ষণিকভাবে কিছু পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা সবকিছু ভুলে যান।
পাহাড়ধসে প্রাণহানি রোধে বর্ষা মৌসুমের আগে ‘পাহাড়ে অবৈধ বসবাস প্রতিরোধ সপ্তাহ’ পালন করা যেতে পারে। পাহাড় বা এর পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বই বেশি। তারা সতর্ক ও যত্নবান হলেই পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস অন্তত নিয়ন্ত্রিত হবে। পাহাড়ধসে প্রাণহানিও তাতে কমিয়ে আনা যাবে। আমরা আশা করি, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।

আবদুল মান্নান
এম এম আলী রোড
চট্টগ্রাম

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..