প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পুঁজিবাজারে একটি সুন্দর সময়ের অপেক্ষা করছি

সাক্ষাৎকার

ওয়াফি এসএম খান

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম পলাশ

শেয়ার বিজ: বর্তমান পুঁজিবাজারে গুজব-নির্ভরতা সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

ওয়াফি এসএম খান: পুঁজিবাজারে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে দুই দফায় ধস হয়েছিল। ওই দুই ধসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা যথেষ্ট ম্যাচিউরডও হয়েছেন। তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ করছেন এখন। কয়েক বছর আগেও পুঁজিবাজার সম্পূর্ণ রিউমার বা গুজবনির্ভর ছিল। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর সিংহভাগই গুজবের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন। পরে তাদের গুজবনির্ভরতা কমেছে। বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করার জন্য বিএসইসি, ডিএসই, সিএসইসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, হচ্ছে। এসব কারণে বর্তমান বাজার নিয়ে আমরা আশাবাদী। বাজারকে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক ভূমিকা রাখতে হবে।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজারে সচেতনতার জন্য নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ওয়াফি এসএম খান: বিএসইসি কয়েক বছর আগে সিকিউরিটিজ হাউজের সব ব্রাঞ্চে, সব ফরম-কাগজপত্রে ‘শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ, বুঝে বিনিয়োগ করুন’ লেখা বাধ্যতামূলক করেছে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা আনতে ভালো একটা প্রভাব ফেলেছে। সংস্থাটি ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসিসহ আরও কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিএসইসি, ডিএসই, সিএসইর এসব পদক্ষেপকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে বিনিয়োগকারীদের বাজার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা সম্ভব। এখানে মার্কেট রিসার্চের দিকেও নজর দিতে হবে।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজারে কাক্সিক্ষত স্থিতিশীলতা কবে আসবে?

ওয়াফি এসএম খান: স্থিতিশীলতা ফেরার অনেক ইঙ্গিত দেখছি। মার্কেটের ম্যাচুরিটি আছে, এখন বাইরে থেকে প্রচুর ইনভেস্টর আসছেন। প্রতিকূলতার কারণে গত কয়েক বছর সবাই পর্যবেক্ষণ করেছেন। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক একটি পর্যায়ে আসার পর বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে। বাংলাদেশ একটি অদ্ভুত সম্ভাবনাময় দেশ, এ দেশকে বলা হয় ‘নেক্সট এশিয়ান টাইগার্স’। এটা বলা হচ্ছে, কারণ আমরা সেই স্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি। গার্মেন্ট, বিদ্যুৎ, মেডিসিন, ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর বহুদূর এগিয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরের গ্রোথ মানে হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এসব সম্ভাবনা দেখে এগিয়ে আসছেন। আমরা তাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। এসব কারণে আমরা একটা ভালো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। পুঁজিবাজারে একটি সুন্দর সময়ের জন্য অপেক্ষা করছি।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজার ঘিরে নানা আশঙ্কার কথা বলা হয়…

ওয়াফি এসএম খান : আসলে খারাপ-ভালো ডিসাইড করে কোনো মন্তব্য করা কঠিন। আমরা আশা করছি, ভালো কিছু ঘটবে। বিশ্বমন্দার মধ্যেও প্রবাসী বাঙালিরা কাজ করে যাচ্ছেন। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ একটি সন্তোষজনক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। আমরা যারা দেশে সিকিউরিটিজ হাউজের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি, আমাদের নলেজ লেভেলও অনেকখানি গ্রো করেছে। বাইরে থেকে প্রচুর ইনভেস্টর আনতে পারছি, তাদের চাহিদা পূরণে কাজ করছি। এটা করতে গিয়ে আমাদের হাউজগুলো ক্রমে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডে পৌঁছে যাচ্ছে। এটি একটি পজিটিভ সাইন। বিএসইসি, ডিএসই ও সিএসইর বেশ কিছু পদক্ষেপের কারণে হাউজগুলো একটি প্রফেশনাল প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছে। ওই প্রফেশনাল প্ল্যাটফর্ম যত বেশি উন্নত হবে, তত বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। আর বাইরের বিনিয়োগ মানেই দেশ এগিয়ে যাওয়া। বাইরে থেকে বিনিয়োগ করে তারা মুনাফা নিয়ে যাবে এটা সত্য। কিন্তু তাদের বিনিয়োগের কারণেই সেক্টরগুলো উন্নত হচ্ছে।

শেয়ার বিজ: আপনি পুঁজিবাজার নিয়ে গবেষণার কথা বলছিলেন?

ওয়াফি এসএম খান: পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নিতে গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য। কারণ তারা বিনিয়োগের আগে দেশের অর্থনীতি নিয়ে, বিনিয়োগ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চায়। তাই এখানে গবেষণা খুব গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বাজারে বিনিয়োগ করে পুঁজি নিরাপদ রাখতে জেনে ও বুঝে বিনিয়োগ করার কথা বলা হয়। এই জানা ও বোঝার জন্যও গবেষণা দরকার।

শেয়ার বিজ: এ মুহূর্তে গবেষণার ব্যবস্থা কতটুকু আছে?

ওয়াফি এসএম খান: গবেষণা হচ্ছে। যাদের বাইরের বিনিয়োগ আছে, তারাই গবেষণা করছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য গবেষণা করতেই হয়। তবে এটা খুবই সামান্য। বিদ্যমান হাউজগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হাউজ এটা করছে। এখানে আরেকটি বিষয় আছে, সিকিউরিটিজ হাউজের পক্ষ থেকে আমি কিন্তু গবেষণা করতে পারি না। গবেষণা করতে হচ্ছে মার্চেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে। আর মার্চেন্ট ব্যাংকের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট করে। সিকিউরিটিজ হাউজগুলোকে গবেষণার অনুমতি দেওয়া হলে সেই রিসার্চ বিনিয়োগকারীদের হাতের নাগালে পৌঁছানো সহজ হবে। গবেষণাপত্র বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য একটা কাগজ। এর মধ্যে দেশ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সংশ্লিষ্ট দিকগুলো তুলে ধরা হয়, যেগুলো আমাদের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

শেয়ার বিজ: গবেষণা বাড়াতে আরও কী করণীয়?

ওয়াফি এসএম খান: আমি বারবারই গবেষণার ওপর জোর দেবো। কারণ গবেষণা শুধু একটি-দুটি কোম্পানি বা খাতের ওপর হয় না। পুঁজিবাজারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন সব বিষয়ই থাকে গবেষণা প্রতিবেদনে। একজন বিনিয়োগকারী হিসেবে আপনার কাছে গবেষণা প্রতিবেদন থাকা উচিত। যেটা দেখে আপনি নিজেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে আমাদের দেশে গবেষণার জন্য পৃথক কোনো প্রতিষ্ঠান এখনও গড়ে ওঠেনি। কিছু সিকিউরিটিজ হাউজ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য গবেষণা করছি। আর বাজারের কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তবে সে রিপোর্টগুলো দেশে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পায় না। পৃথক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনসহ এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ, নাকি না বুঝে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ?

ওয়াফি এসএম খান: পুঁজিবাজার বা ওই বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ নয়। বরং না জেনে-বুঝে মূল্যবান পুঁজি বিনিয়োগ করাই ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু পুঁজিবাজার নয়, সমাজে যে কোনো কাজ করতে গেলেই ঝুঁকি আছে। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে, ঝুঁকি কমিয়ে আনা বা এড়িয়ে চলা। পুঁজিবাজারে যতখানি ঝুঁকি এড়ানো যায়, সেটাই কিন্তু এক্সপার্টনেস। সচেতনতা সৃষ্টির জন্যই ‘পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে সতর্ক করা হচ্ছে, যাতে সবাই জেনে ও বুঝে বিনিয়োগে আসেন। আর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করে তার সুফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে। আজ বিনিয়োগ করে তিন দিন পরই মুনাফা করা পুঁজিবাজার কেন, বিশ্বের কোনো ব্যবসায়ই তা সম্ভব নয়। তাই পুঁজিবাজারে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো জানা-বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার বিজ: বিনিয়োগকারীদের জানানো ও বোঝানোর জন্য যে পদক্ষেপ, তা কতটা পর্যাপ্ত?

ওয়াফি এসএম খান: জানানো ও বোঝানোর জন্য ডিএসই, সিএসই কিন্তু বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মশালা করছে। আমাদের চিঠি পাঠিয়ে সে বিষয়ে জানাচ্ছেন। এ মার্কেটে বিনিয়োগের জন্য যে বেসিক নলেজ দরকার, সে বিষয়ে তারা কাজ করছে। এখন ডিএসই-সিএসইর বাইরে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রেনিং সেন্টার, একাডেমি গড়ে উঠছে। দেখুন, আমরা বাঙালিরা অন্যকে দেখে বিনিয়োগে আসি। কিন্তু আরেকজনকে দেখে ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়। আপনার সামর্থ্য আর ওনার সামর্থ্য কিন্তু এক নাও হতে পারে। তাই যেখানে বিনিয়োগ করবেন সেটা বুঝে করুন।