দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

পুঁজিবাজারে চলমান সংকট নিরসনে দুটি কথা

. . আলী আকবর: সহজ ও নিশ্চিত পন্থায় কিছু আয় করে নির্বিবাদ ও ঝঞ্ঝামুক্ত জীবনযাপন কার না ভালো লাগে? আর আরামপ্রিয় বাঙালির ক্ষেত্রে বিষয়টি যে কত আগ্রহের, তা নিশ্চয় অধিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে না।

কিন্তু চাইলেই রাতারাতি স্কয়ার ফার্মার মতো রপ্তানি-সক্ষম একটি সুবিশাল কোম্পানি বানিয়ে, অথবা ‘ডাচ্-বাংলা ব্যাংক’-এর মতো একটা সফল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে, শতশত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তৃপ্তিদায়ক বেতন-বোনাস দিয়ে সুখী বানিয়ে, নিজেও সুখে-শান্তিতে জীবনযাপনের খায়েস পোষণ (!) কি কোনো বাস্তবানুগ ধারণা হতে পারে?

অবিশ্বাস্য মনে হলেও ‘পুঁজিবাজার’ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ন্যূনতম বোধ, সামর্থ্য ও ধৈর্যসম্পন্ন যে কেউ চাইলেই দেশের সফল সব কোম্পানি, ব্যাংক, বিমা প্রভৃতি সার্থক প্রতিষ্ঠানের বাজারে ফ্লোটেড অংশ হতে যত ইচ্ছা শেয়ার ক্রয় করে, রাতারাতি সেগুলোর ‘মালিক/অংশীদার’ বনে যেতে পারেন! চাহিবামাত্র দেশের ব্র্যান্ডেড কিছু প্রতিষ্ঠানের যথেচ্ছ অংশীদার বনে যাওয়ার এত সহজ সুযোগ এক্সাইটিং নয় কি?

স্কয়ার ফার্মার (শুধুই প্রতীকী অর্থে ব্যবহƒত) প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনে ১০ টাকা ফেসভ্যালুর (নিট অ্যাসেট ভ্যালু ৮৮ টাকা) প্রায় ৮৫ কোটি শেয়ার আছে। কেউ যদি স্কয়ার ফার্মার বর্তমান বাজারদর কমবেশি ১৮৭ টাকা দিয়ে আগামীকাল বাজার থেকে একটি শেয়ার ক্রয় করেন, তাহলে তিনি কাল থেকেই (আমার ভুল না হলে) সুপ্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিটির ‘৮৫ কোটি ভাগের এক ভাগ’-এর মালিক বনে যাবেন! আর সাহস করে ১৮/১৯ হাজার টাকায় ১০০টি শেয়ার ক্রয় করতে পারলে, কোম্পানিটির ‘৮৫ লাখ ভাগের এক ভাগ’ তার হয়ে যাবে! শুধু কি তা-ই? পরবর্তীকালে শেয়ার কটি বিক্রি না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে কোম্পানি থেকে তিনি তার বার্ষিক হিস্যা নিয়মমাফিক পেতেই থাকবেন!

একইভাবে বাজারদর কমবেশি ৬০ টাকায় ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের ব্যাংক ডাচ্-বাংলার একটি (যার এনএভি ৫৯ টাকা!) শেয়ার কিনলে মালিক হওয়া যাবে তার ৫০ কোটি ভাগের এক ভাগের! আর ছয় হাজার টাকা দিয়ে ১০০টি শেয়ার কিনতে পারলে ব্যাংকটির ৫০ লাখ ভাগের এক ভাগের মালিকানা পাওয়া যাবে!   

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারেÑসেই দুই পয়সার ‘সংখ্যালঘু’ মালিকানা গোনে কে? আমি বলি, কারও গোনা বা না গোনায় কিছু যায়-আসে কি? যদি শেয়ারহোল্ডার তার প্রাপ্য হিস্যাটুকু অনায়াসে (আমার মতে কমবেশি ৭৫ শতাংশ ন্যায্যতায়!) পেয়ে যান? কারণ শেয়ারহোল্ডারের মালিকানা তার সাংবিধানিক অধিকার, যার পক্ষে আছে স্বয়ং রাষ্ট্রীয় আইন, অর্থ মন্ত্রণালয়, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এবং তার বেচা-কেনার মাধ্যম/ক্ষেত্র হিসেবে আছে স্টক-এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক প্রভৃতি। লক্ষণীয় যে বর্তমান দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায়ও বার্জার, রেনাটা, বিএসআরএম, ব্র্যাক ব্যাংক. উত্তরা ব্যাংক, সিঙ্গার, ন্যাশনাল লাইফ প্রভৃতির মতো প্রায় দুই শতাধিক সফল প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য দিব্যি চলমান থাকা সত্ত্বেও বাজারদর প্রায় তলানিতে!

স্পষ্টত বলতে চাই, ‘সুবিধামতো বাজার থেকে যেকোনো সফল (অতি মূল্যায়িত শেয়ারের বিষয় ভিন্ন!) প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয় করে দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগে যাওয়া এই বিপদকালেও যে কোনো সঞ্চয় স্কিম অপেক্ষা অধিক লাভজনক ও ঝুঁকিমুক্তও বটে!’ দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগের এই সহজ ও নিশ্চিত পজিটিভ অঙ্কটির কথা কেউই বলছেন না কেন? প্রশ্ন হচ্ছে, আসল কথাটি না বলে টকশোগুলোর অধিকাংশতেই অর্থহীন ‘ভ্যাজর ভ্যাজর’ আর কত? এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ জনগোষ্ঠীকে পুঁজিবাজারে আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে কি?

দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক মহল ঝুঁকিমুক্ত লং-টার্ম বিনিয়োগের উজ্জ্বল দিকটিকে পাশ কাটিয়ে, এর ফটকাবাজি কার্যক্রমকে ঘিরেই যত হইচই করছে! ফলে দেশের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যাওয়ায়, লুজিং/সফল/আংশিক সফল প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মূল্য সার্কিট ব্রেকার নামক ‘মরণরেখায়’ নেমে এসেছে! তার পরও সেই পতিত দরে অন্তত ভালো শেয়ারগুলো ক্রয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারী দূরের কথা, কথিত কালোটাকার কুমিররাও এগিয়ে আসছেন না!  

মুষ্টিমেয় কতিপয় স্বার্থান্বেষীর গোষ্ঠীস্বার্থে, দেশের লাখ লাখ নি¤œ-মধ্যবিত্ত জনগণকে পথে বসিয়ে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক খাতটিকে সমূলে বিসর্জন দেওয়ার এ কোন মারণখেলা শুরু হয়েছে! সামনে কোনোই আসা নেই এজন্য যে, যারা এরই মধ্যে পালিয়ে বেঁচে গেছে, তারা তো গেছেই! আর যারা এখনও মাটি কামড়িয়ে অথবা ফাটা বাঁশে আটকিয়ে আছে তাদেরও বিদায় করার জন্য টকশো ও সভা-সমাবেশে, সার্কিট ব্রেকারে আটকানো অন্তত ভালো শেয়ারগুলো দ্রুত ক্রয়ের ‘জাতীয় আহ্বান’ না জানিয়ে, উল্টো বহুল কথিত ‘না বুঝে শেয়ার মার্কেটে ঢুকবেন না’ মর্মে তারস্বরে সাবধান করছেন! আর কালোটাকার মালিকেরা এখনও সুযোগটি না নিয়ে আরও সস্তায় শেয়ার সংগ্রহের ফন্দিতে ওত পেতে বসে আছেন! এ কোন সর্বনাশা খেলা?

বলা যায়, সার্কিট ব্রেকারের তলানিতে পরে থাকা অন্তত সুস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর সেল অর্ডারের শেয়ারগুলো কালকেই যদি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কিনে ফেলে এবং সেই সঙ্গে যুগপৎ ঘোষণা আসেÑ‘আর কোনো ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে মিথ্যা ডিক্লারেশনে বাজারে ঢুকতে দেওয়া হবে না’ এবং ‘বিদ্যমান সব ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ৮ ধারার উপধারা (১) এবং উপধারা (২)-এর (ক), (ঙ), (ছ) ও (জ) বলে, অথবা ওই আইনের ২৪ ধারা বলে প্রয়োজনে আরও নতুন বিধি প্রণয়ন করে, অচিরেই বাজেয়াপ্ত তথা বিলুপ্ত ঘোষণা করে যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ওয়ার্কার্স ও শেয়াহোল্ডারদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হবে!’ তখন বোঝা যেত জুয়াচোরের দল কোন পথে যায়!

উল্লেখ্য, আর্থিক খাতের অন্যতম স্তম্ভ পুঁজিবাজারের সুরক্ষা ও দেশের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে মাত্র শত দেড়েক কথিত মালিককে (যারা ক্রিমিনাল অথবা ক্রিমিনালদের ক্রীড়ানক!) শায়েস্তা প্রদান কোনোভাবেই রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে না!

আফসোস! যদি মিথ্যা ডিক্লারেশনের ভুয়া সিকিউরিটিজ বাজারে ঢুকতে না পারত, তাহলে কোনো আনাড়ি বিনিয়োগকারী কিছু না বুঝে শুধু বার্ষিক ডিভিডেন্ড খাওয়ার আশায় ভালো শেয়ারে লংটার্ম বিনিয়োগের ধৈর্যটুকু দেখাতে পারলে এই মরা বাজারেও যে কোনো সঞ্চয় স্কিম অপেক্ষা অধিক ও নিশ্চিত মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হতো! কারণ শেয়ার ব্যবসা এমন এক ব্যবসা, যেখানে ঘোষিত বার্ষিক ডিভিডেন্ডই মূল আয় নয়! এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক উল্লম্ফন, যেমন বোনাস, রাইট, চাঙা বাজার প্রভৃতি ‘মওকা’র দিকেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আবর্তিত হয়। এসব আর্থিক উল্লম্ফন বিনিয়োগকারীদের কেবল সুরক্ষা নয়, অনেক ক্ষেত্রে অভাবিত ও অস্বাভাবিক অর্জনে আপ্লুত করে থাকে! স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, ডিভিডেন্ডে তৃপ্ত সরলমনা বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে কথিত ঝুঁকির পরিবর্তে অভাবিত অর্জনের সম্ভাবনাই বেশি! কথা হচ্ছে, খুদে ও সাধারণ বিনিয়োগকারী কর্তৃক শেয়ারবাজারকে আঁকড়ে ধরে থাকার সেই সেল্ফ কনফিডেন্ট গড়ে দেওয়ার দায়িত্বটা আসলে কার? 

পরিতাপের বিষয় এই যে এক. বাংলাদেশের শেয়ারবাজারটিকে সার্কিট ব্রেকার নামক শেষ অস্ত্র ‘কোরামিন’ প্রয়োগ করে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে! দুই. দেশের ‘স্বীকৃত শেয়ার বোদ্ধাদের’ অহর্নিশ প্রচেষ্টায়ও বাজারটিকে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না! তিন. শেয়ার ব্যবসা মানেই, ‘মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ঠগবাজি’র ব্যবসা মনে করছে সাধারণ মানুষ এমনকি বিনিয়োগকারীরাও! চার. এ মুহূর্তে বাজারে বিদ্যমান ৩৫৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ফেস ভ্যালু ১০ টাকার নিচে নেমে গেছে, যার ৩৫-৪০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার আবার পাঁচ টাকা থেকে এক টাকা পর্যন্ত নেমে গেছে! পাঁচ. তদুপরি এর আগেই স্বাভাবিক মার্কেট হারিয়ে ওটিসি মার্কেটে চলে যাওয়া আরও ‘করুণ দশাগ্রস্ত’ ৬৫টি প্রতিষ্ঠানের কথা কারও ভাবনায়ই নেই! ছয়. ওটিসি মার্কেটের ৬৫টি প্রতিষ্ঠান এবং চলমান মার্কেটের ফেস ভ্যালুর নিচে নেমে যাওয়া শতখানেক প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় শতদেড়েক প্রতিষ্ঠানই যে বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির অন্যতম মূল কারণ, তা নিয়ে কেউ ভাবছে না!  সাত. বাংলাদেশের দুর্দমনীয় নদীভাঙনে ধস আর শেয়ারবাজারের অপ্রতিরোধ্য ধস যেন আজ একাকার হয়ে গেছে! আট. নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নেওয়া কিছু আইনগত সংশোধনীসহ নানা ধরনের শর্টটার্ম পদক্ষেপ তেমন কোনো কাজেই আসছে না! নয়. সমালোচনা যা-ই থাক, মার্কেট অটোমেশন, শেয়ারের ইলেকট্রনিক কনভার্সন, সিডিবিএল স্থাপন, এক দরে (১০ টাকা) শেয়ার, লট বিলোপ, ডিমিউচুয়ালাইজেশন প্রভৃতি নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে মার্কেটের আধুনিকায়ন সত্ত্বেও এহেন করুণ পরিণতি চিন্তার অতীত!        

পরিণতির সম্ভাব্য কারণ

বাংলাদেশ পুঁজিবাজারের বর্তমান করুণ পরিণতির মূল কারণ হচ্ছে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় প্রায় সব ধরনের বিনিয়োগকারী বর্গের একযোগে মার্কেট ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা! আর সবার পালিয়ে যাওয়ার মূল কারণ বিরামহীন অপ্রতিরোধ্য ধস! আর বিরামহীন ধসের মূল কারণ নিয়ন্ত্রক বর্গের আশ্রয়-প্রশ্রয়/ব্যর্থতার সুযোগে মিথ্যা তথ্যসমৃদ্ধ বহু ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে বাজারে এনে কতিপয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট কর্তৃক ছোট এই মার্কেটটিতে নির্দয়ভাবে একতরফা ‘ফটকাবাজির খেলা’ খেলে যাওয়া!

তার পরও মার্কেটের এই করুণ পরিণতি হতো না, যদি সফল প্রতিষ্ঠানগুলোর কতিপয় পরিচালক সর্বনাশা সিন্ডিকেটগুলোর ক্রীড়ানক না হতো এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অন্তত ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিনিয়োগের সাহস দেখিয়েই যেতে পারত! দরপতনের আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছেÑক. ‘ব্যবসাসফল প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে যে কোনো অবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগে কোনোই ঝুঁকি নেই!’ এই অমোঘ সত্যটি দেশের অধিকাংশ বিনিয়োগকারী জানেনই না! পক্ষান্তরে দেশের ১৮ কোটি নাগরিকের প্রায় সকলেরই শেয়ারবাজার সম্পর্কে ভীতিকর, বিরূপ ও নেগেটিভ ধারণা বিদ্যমান! খ. শেয়ারবাজার মানেই ফটকাবাজি! এমনকি দেশের নাটক-সিনেমার কাহিনিতেও শেয়াবাজারকে সংসারজীবনের ‘করুণ পরিণতির অন্যতম দায়’ হিসেবে অহরহ দেখানো হচ্ছে! গ. মার খাওয়া বিনিয়োগকারীদের ভীতিকর প্রচারণায় সাহসী বিনিয়োগকারীরাও শেয়ারবাজারকে ভয় পাচ্ছেন! ঘ. দেশের খুদে-মাঝারি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, এফডিআর প্রভৃতি কার্যক্রমে পাঁচ বছর, ১০ বছর এমনকি যুগের পর যুগ অতি নগণ্য মুনাফা সঞ্চয়ে ধৈর্য রাখতে পারছেন! অথচ পুঁজিবাজারে এলেই তাদের সেই ধৈর্য আর থাকছে না! সপ্তাহ/মাসান্তেই কয়েক গুণ মুনাফা অর্জন করে রাতারাতি ধনী হওয়ার লালসায় নানা প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন! ঙ. পছন্দমতো ভালো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনে লং-টার্ম বিনিয়োগ করে ধৈর্য ধরে এর ডিভিডেন্ড খেলেও যথেষ্ট লাভজনক! সেইসঙ্গে কোনো আর্থিক উল্লম্ফন হলে কয়েক গুণ, এমনকি ক্ষেত্রভেদে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন একমাত্র শেয়াবাজারেই সম্ভব, যা অনেক বিনিয়োগকারী জানেনই না! চ. মূল কারণ অনুসন্ধান করে দীর্ঘমেয়াদি, স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে দুষ্টু চক্রের ক্রীড়ানক কথিত অ্যাকশনের কোনো কার্যকারিতা আসলেই নেই! জ. এখনও দেশের সুপরিচিত লাভজনক প্রতিষ্ঠান (কোম্পানি, ব্যাংক, বিমা…) যেগুলো কেবলই ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে অযাচিতভাবে সার্কিট ব্রেকারের রশিতে ঝুলছে, যেগুলোতে বিনিয়োগ এই মহা দুঃসময়েও সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত! সেগুলোর ব্যাপারেও নিয়ন্ত্রক মহোদয় বর্গের কোনো উচ্চবাচ্য নেই! ঝ. বাজারের বর্তমান শ্বাসরুদ্ধকর করুণ দশায় মনে হচ্ছে, শেয়াবাজার স্বাভাবিকীকরণের কোনো পন্থাই আর অবশিষ্ট নেই! ঞ. ‘বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা’ বিষয়টি কাগজে-কলমেই ঘুরপাক খাচ্ছে, এর ‘যথাযথ কার্যকারিতা’ এমনকি কর্তৃপক্ষের ন্যূনতম উদ্বেগের প্রতিফলনও কোথাও নেই! এদের ঘুম ভাঙাবে কে? ট. আইপিও অনুমোদন, নিবন্ধন, তালিকাভুক্তি প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট ‘সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন’-এর ‘লুপহোল’ বন্ধের কার্যকর পদক্ষেপের কোনো লক্ষণই নেই! 

সহজ প্রতিকার

কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগকারীদের মাত্র তিনটি ‘কার্যকর’ পদক্ষেপে অভিশপ্ত পুঁজিবাজারটি নিশ্চিতভাবেই রাহুগ্রাস মুক্ত হতে পারে! এক. ‘পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় মিথ্যা ও ভুয়া ডিক্লারেশন চিরতরে বন্ধ করতে হবে!’ যা বাস্তবায়নের পুরো দায় এসইসি তথা সদাশয় সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল! দুই. সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন-১৯৯৩-এর ৮নং ধারায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির স্বার্থে প্রয়োজনে তার ২৪নং ধারা বলে যুগোপযোগী সংশোধনী এনে এসইসির সব অনৈতিক ফুটো বন্ধ করতে হবে! এবং এর সার্বিক ক্ষমতার প্রয়োগ নিশ্চিত করে ‘এ মুহূর্তে অন্তত শতদেড়েক কলঙ্কিত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার ও কর্মচারীদের স্বার্থ রক্ষাপূর্বক কোম্পানিগুলোকে বাজেয়াপ্ত করতে হবে।’  তিন. যার নাম স্টক বিজনেস বা বান্দাই ব্যবসা! এখানে তাড়াহুড়ার স্থান কোথায়? দেখে-শুনে-বুঝে ঠাণ্ডা মাথায় সফল প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মওকামতো কিনে বান্দাই করতে হবে! তদুপরি কোনো সমস্যায় হতাশ না হয়ে চোখ-কান খোলা রেখে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আর বার্ষিক ডিভিডেন্ডসহ সুযোগমতো বোনাস-রাইট শেয়ারগুলো নিতে হবে এবং লাভজনক স্টকগুলোর আংশবিশেষ সুবিধামতো বিক্রি করে বুঝে-শুনে কম দরের নতুন স্টকে পুঁজি ডাইভার্সিফাই করে শেয়ার লালন-পালন আর বেচা-কেনা চালিয়ে যেতে হবে। নিজকে চালাক ভেবে ভুলেও শর্টকাট অর্জনের ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না!

এককথায়, ‘বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে পুঁজিবাজারে সকল প্রকার ভুয়া ডিক্লারেশন বন্ধে কঠোর সরকারি উদ্যোগ নিতেই হবে এবং বিনিয়োগকারীদেরও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে লংটার্ম বিনিয়োগে সাহস নিয়ে এগিয়ে আসতেই হবে!’

এতে ফটকাবাজের দল তাদের গণ্ডির মধ্যে আর যা-ই করুক না কেন পুঁজিবাজারের গোড়া ধরে আর কোনো দিন ‘টানা-হেঁচড়া’ করতে পারবে না! 

নানা চাপে থাকা তৃতীয় বিশ্বের কোনো সরকারের ঘাড়ে দেশের শেয়াবাজারের দায় সম্পূর্ণ অর্পণ করা যুক্তিসংগত নাও হতে পারে! তাই বলে মুষ্টিমেয় স্বার্থান্বেষীর পদতলে বিশাল এক জনগোষ্ঠীনির্ভর অর্থনীতির স্তম্ভ ‘পুঁজিবাজার’কে সমর্পণ, কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না! তাই তো রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থেই আলোচিত জঞ্জাল পরিষ্কারের জন্য ‘আইনের কঠোর প্রয়োগ’-এর নিশ্চয়তা অত্যাবশ্যক! 

পুঁজিবাজারে চলমান সংকট নিরসনে দুটি কথা

. . আলী আকবর: সহজ ও নিশ্চিত পন্থায় কিছু আয় করে নির্বিবাদ ও ঝঞ্ঝামুক্ত জীবনযাপন কার না ভালো লাগে? আর আরামপ্রিয় বাঙালির ক্ষেত্রে বিষয়টি যে কত আগ্রহের, তা নিশ্চয় অধিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে না।

কিন্তু চাইলেই রাতারাতি স্কয়ার ফার্মার মতো রপ্তানি-সক্ষম একটি সুবিশাল কোম্পানি বানিয়ে, অথবা ‘ডাচ্-বাংলা ব্যাংক’-এর মতো একটা সফল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে, শতশত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তৃপ্তিদায়ক বেতন-বোনাস দিয়ে সুখী বানিয়ে, নিজেও সুখে-শান্তিতে জীবনযাপনের খায়েস পোষণ (!) কি কোনো বাস্তবানুগ ধারণা হতে পারে?

অবিশ্বাস্য মনে হলেও ‘পুঁজিবাজার’ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ন্যূনতম বোধ, সামর্থ্য ও ধৈর্যসম্পন্ন যে কেউ চাইলেই দেশের সফল সব কোম্পানি, ব্যাংক, বিমা প্রভৃতি সার্থক প্রতিষ্ঠানের বাজারে ফ্লোটেড অংশ হতে যত ইচ্ছা শেয়ার ক্রয় করে, রাতারাতি সেগুলোর ‘মালিক/অংশীদার’ বনে যেতে পারেন! চাহিবামাত্র দেশের ব্র্যান্ডেড কিছু প্রতিষ্ঠানের যথেচ্ছ অংশীদার বনে যাওয়ার এত সহজ সুযোগ এক্সাইটিং নয় কি?

স্কয়ার ফার্মার (শুধুই প্রতীকী অর্থে ব্যবহƒত) প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনে ১০ টাকা ফেসভ্যালুর (নিট অ্যাসেট ভ্যালু ৮৮ টাকা) প্রায় ৮৫ কোটি শেয়ার আছে। কেউ যদি স্কয়ার ফার্মার বর্তমান বাজারদর কমবেশি ১৮৭ টাকা দিয়ে আগামীকাল বাজার থেকে একটি শেয়ার ক্রয় করেন, তাহলে তিনি কাল থেকেই (আমার ভুল না হলে) সুপ্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিটির ‘৮৫ কোটি ভাগের এক ভাগ’-এর মালিক বনে যাবেন! আর সাহস করে ১৮/১৯ হাজার টাকায় ১০০টি শেয়ার ক্রয় করতে পারলে, কোম্পানিটির ‘৮৫ লাখ ভাগের এক ভাগ’ তার হয়ে যাবে! শুধু কি তা-ই? পরবর্তীকালে শেয়ার কটি বিক্রি না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে কোম্পানি থেকে তিনি তার বার্ষিক হিস্যা নিয়মমাফিক পেতেই থাকবেন!

একইভাবে বাজারদর কমবেশি ৬০ টাকায় ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের ব্যাংক ডাচ্-বাংলার একটি (যার এনএভি ৫৯ টাকা!) শেয়ার কিনলে মালিক হওয়া যাবে তার ৫০ কোটি ভাগের এক ভাগের! আর ছয় হাজার টাকা দিয়ে ১০০টি শেয়ার কিনতে পারলে ব্যাংকটির ৫০ লাখ ভাগের এক ভাগের মালিকানা পাওয়া যাবে!   

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারেÑসেই দুই পয়সার ‘সংখ্যালঘু’ মালিকানা গোনে কে? আমি বলি, কারও গোনা বা না গোনায় কিছু যায়-আসে কি? যদি শেয়ারহোল্ডার তার প্রাপ্য হিস্যাটুকু অনায়াসে (আমার মতে কমবেশি ৭৫ শতাংশ ন্যায্যতায়!) পেয়ে যান? কারণ শেয়ারহোল্ডারের মালিকানা তার সাংবিধানিক অধিকার, যার পক্ষে আছে স্বয়ং রাষ্ট্রীয় আইন, অর্থ মন্ত্রণালয়, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এবং তার বেচা-কেনার মাধ্যম/ক্ষেত্র হিসেবে আছে স্টক-এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক প্রভৃতি। লক্ষণীয় যে বর্তমান দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায়ও বার্জার, রেনাটা, বিএসআরএম, ব্র্যাক ব্যাংক. উত্তরা ব্যাংক, সিঙ্গার, ন্যাশনাল লাইফ প্রভৃতির মতো প্রায় দুই শতাধিক সফল প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য দিব্যি চলমান থাকা সত্ত্বেও বাজারদর প্রায় তলানিতে!

স্পষ্টত বলতে চাই, ‘সুবিধামতো বাজার থেকে যেকোনো সফল (অতি মূল্যায়িত শেয়ারের বিষয় ভিন্ন!) প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয় করে দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগে যাওয়া এই বিপদকালেও যে কোনো সঞ্চয় স্কিম অপেক্ষা অধিক লাভজনক ও ঝুঁকিমুক্তও বটে!’ দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগের এই সহজ ও নিশ্চিত পজিটিভ অঙ্কটির কথা কেউই বলছেন না কেন? প্রশ্ন হচ্ছে, আসল কথাটি না বলে টকশোগুলোর অধিকাংশতেই অর্থহীন ‘ভ্যাজর ভ্যাজর’ আর কত? এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ জনগোষ্ঠীকে পুঁজিবাজারে আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে কি?

দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক মহল ঝুঁকিমুক্ত লং-টার্ম বিনিয়োগের উজ্জ্বল দিকটিকে পাশ কাটিয়ে, এর ফটকাবাজি কার্যক্রমকে ঘিরেই যত হইচই করছে! ফলে দেশের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যাওয়ায়, লুজিং/সফল/আংশিক সফল প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মূল্য সার্কিট ব্রেকার নামক ‘মরণরেখায়’ নেমে এসেছে! তার পরও সেই পতিত দরে অন্তত ভালো শেয়ারগুলো ক্রয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারী দূরের কথা, কথিত কালোটাকার কুমিররাও এগিয়ে আসছেন না!  

মুষ্টিমেয় কতিপয় স্বার্থান্বেষীর গোষ্ঠীস্বার্থে, দেশের লাখ লাখ নি¤œ-মধ্যবিত্ত জনগণকে পথে বসিয়ে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক খাতটিকে সমূলে বিসর্জন দেওয়ার এ কোন মারণখেলা শুরু হয়েছে! সামনে কোনোই আসা নেই এজন্য যে, যারা এরই মধ্যে পালিয়ে বেঁচে গেছে, তারা তো গেছেই! আর যারা এখনও মাটি কামড়িয়ে অথবা ফাটা বাঁশে আটকিয়ে আছে তাদেরও বিদায় করার জন্য টকশো ও সভা-সমাবেশে, সার্কিট ব্রেকারে আটকানো অন্তত ভালো শেয়ারগুলো দ্রুত ক্রয়ের ‘জাতীয় আহ্বান’ না জানিয়ে, উল্টো বহুল কথিত ‘না বুঝে শেয়ার মার্কেটে ঢুকবেন না’ মর্মে তারস্বরে সাবধান করছেন! আর কালোটাকার মালিকেরা এখনও সুযোগটি না নিয়ে আরও সস্তায় শেয়ার সংগ্রহের ফন্দিতে ওত পেতে বসে আছেন! এ কোন সর্বনাশা খেলা?

বলা যায়, সার্কিট ব্রেকারের তলানিতে পরে থাকা অন্তত সুস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর সেল অর্ডারের শেয়ারগুলো কালকেই যদি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কিনে ফেলে এবং সেই সঙ্গে যুগপৎ ঘোষণা আসেÑ‘আর কোনো ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে মিথ্যা ডিক্লারেশনে বাজারে ঢুকতে দেওয়া হবে না’ এবং ‘বিদ্যমান সব ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ৮ ধারার উপধারা (১) এবং উপধারা (২)-এর (ক), (ঙ), (ছ) ও (জ) বলে, অথবা ওই আইনের ২৪ ধারা বলে প্রয়োজনে আরও নতুন বিধি প্রণয়ন করে, অচিরেই বাজেয়াপ্ত তথা বিলুপ্ত ঘোষণা করে যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ওয়ার্কার্স ও শেয়াহোল্ডারদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হবে!’ তখন বোঝা যেত জুয়াচোরের দল কোন পথে যায়!

উল্লেখ্য, আর্থিক খাতের অন্যতম স্তম্ভ পুঁজিবাজারের সুরক্ষা ও দেশের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে মাত্র শত দেড়েক কথিত মালিককে (যারা ক্রিমিনাল অথবা ক্রিমিনালদের ক্রীড়ানক!) শায়েস্তা প্রদান কোনোভাবেই রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে না!

আফসোস! যদি মিথ্যা ডিক্লারেশনের ভুয়া সিকিউরিটিজ বাজারে ঢুকতে না পারত, তাহলে কোনো আনাড়ি বিনিয়োগকারী কিছু না বুঝে শুধু বার্ষিক ডিভিডেন্ড খাওয়ার আশায় ভালো শেয়ারে লংটার্ম বিনিয়োগের ধৈর্যটুকু দেখাতে পারলে এই মরা বাজারেও যে কোনো সঞ্চয় স্কিম অপেক্ষা অধিক ও নিশ্চিত মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হতো! কারণ শেয়ার ব্যবসা এমন এক ব্যবসা, যেখানে ঘোষিত বার্ষিক ডিভিডেন্ডই মূল আয় নয়! এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক উল্লম্ফন, যেমন বোনাস, রাইট, চাঙা বাজার প্রভৃতি ‘মওকা’র দিকেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আবর্তিত হয়। এসব আর্থিক উল্লম্ফন বিনিয়োগকারীদের কেবল সুরক্ষা নয়, অনেক ক্ষেত্রে অভাবিত ও অস্বাভাবিক অর্জনে আপ্লুত করে থাকে! স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, ডিভিডেন্ডে তৃপ্ত সরলমনা বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে কথিত ঝুঁকির পরিবর্তে অভাবিত অর্জনের সম্ভাবনাই বেশি! কথা হচ্ছে, খুদে ও সাধারণ বিনিয়োগকারী কর্তৃক শেয়ারবাজারকে আঁকড়ে ধরে থাকার সেই সেল্ফ কনফিডেন্ট গড়ে দেওয়ার দায়িত্বটা আসলে কার? 

পরিতাপের বিষয় এই যে এক. বাংলাদেশের শেয়ারবাজারটিকে সার্কিট ব্রেকার নামক শেষ অস্ত্র ‘কোরামিন’ প্রয়োগ করে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে! দুই. দেশের ‘স্বীকৃত শেয়ার বোদ্ধাদের’ অহর্নিশ প্রচেষ্টায়ও বাজারটিকে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না! তিন. শেয়ার ব্যবসা মানেই, ‘মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ঠগবাজি’র ব্যবসা মনে করছে সাধারণ মানুষ এমনকি বিনিয়োগকারীরাও! চার. এ মুহূর্তে বাজারে বিদ্যমান ৩৫৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ফেস ভ্যালু ১০ টাকার নিচে নেমে গেছে, যার ৩৫-৪০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার আবার পাঁচ টাকা থেকে এক টাকা পর্যন্ত নেমে গেছে! পাঁচ. তদুপরি এর আগেই স্বাভাবিক মার্কেট হারিয়ে ওটিসি মার্কেটে চলে যাওয়া আরও ‘করুণ দশাগ্রস্ত’ ৬৫টি প্রতিষ্ঠানের কথা কারও ভাবনায়ই নেই! ছয়. ওটিসি মার্কেটের ৬৫টি প্রতিষ্ঠান এবং চলমান মার্কেটের ফেস ভ্যালুর নিচে নেমে যাওয়া শতখানেক প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় শতদেড়েক প্রতিষ্ঠানই যে বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির অন্যতম মূল কারণ, তা নিয়ে কেউ ভাবছে না!  সাত. বাংলাদেশের দুর্দমনীয় নদীভাঙনে ধস আর শেয়ারবাজারের অপ্রতিরোধ্য ধস যেন আজ একাকার হয়ে গেছে! আট. নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নেওয়া কিছু আইনগত সংশোধনীসহ নানা ধরনের শর্টটার্ম পদক্ষেপ তেমন কোনো কাজেই আসছে না! নয়. সমালোচনা যা-ই থাক, মার্কেট অটোমেশন, শেয়ারের ইলেকট্রনিক কনভার্সন, সিডিবিএল স্থাপন, এক দরে (১০ টাকা) শেয়ার, লট বিলোপ, ডিমিউচুয়ালাইজেশন প্রভৃতি নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে মার্কেটের আধুনিকায়ন সত্ত্বেও এহেন করুণ পরিণতি চিন্তার অতীত!        

পরিণতির সম্ভাব্য কারণ

বাংলাদেশ পুঁজিবাজারের বর্তমান করুণ পরিণতির মূল কারণ হচ্ছে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় প্রায় সব ধরনের বিনিয়োগকারী বর্গের একযোগে মার্কেট ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা! আর সবার পালিয়ে যাওয়ার মূল কারণ বিরামহীন অপ্রতিরোধ্য ধস! আর বিরামহীন ধসের মূল কারণ নিয়ন্ত্রক বর্গের আশ্রয়-প্রশ্রয়/ব্যর্থতার সুযোগে মিথ্যা তথ্যসমৃদ্ধ বহু ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে বাজারে এনে কতিপয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট কর্তৃক ছোট এই মার্কেটটিতে নির্দয়ভাবে একতরফা ‘ফটকাবাজির খেলা’ খেলে যাওয়া!

তার পরও মার্কেটের এই করুণ পরিণতি হতো না, যদি সফল প্রতিষ্ঠানগুলোর কতিপয় পরিচালক সর্বনাশা সিন্ডিকেটগুলোর ক্রীড়ানক না হতো এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অন্তত ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিনিয়োগের সাহস দেখিয়েই যেতে পারত! দরপতনের আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছেÑক. ‘ব্যবসাসফল প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে যে কোনো অবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগে কোনোই ঝুঁকি নেই!’ এই অমোঘ সত্যটি দেশের অধিকাংশ বিনিয়োগকারী জানেনই না! পক্ষান্তরে দেশের ১৮ কোটি নাগরিকের প্রায় সকলেরই শেয়ারবাজার সম্পর্কে ভীতিকর, বিরূপ ও নেগেটিভ ধারণা বিদ্যমান! খ. শেয়ারবাজার মানেই ফটকাবাজি! এমনকি দেশের নাটক-সিনেমার কাহিনিতেও শেয়াবাজারকে সংসারজীবনের ‘করুণ পরিণতির অন্যতম দায়’ হিসেবে অহরহ দেখানো হচ্ছে! গ. মার খাওয়া বিনিয়োগকারীদের ভীতিকর প্রচারণায় সাহসী বিনিয়োগকারীরাও শেয়ারবাজারকে ভয় পাচ্ছেন! ঘ. দেশের খুদে-মাঝারি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, এফডিআর প্রভৃতি কার্যক্রমে পাঁচ বছর, ১০ বছর এমনকি যুগের পর যুগ অতি নগণ্য মুনাফা সঞ্চয়ে ধৈর্য রাখতে পারছেন! অথচ পুঁজিবাজারে এলেই তাদের সেই ধৈর্য আর থাকছে না! সপ্তাহ/মাসান্তেই কয়েক গুণ মুনাফা অর্জন করে রাতারাতি ধনী হওয়ার লালসায় নানা প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন! ঙ. পছন্দমতো ভালো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনে লং-টার্ম বিনিয়োগ করে ধৈর্য ধরে এর ডিভিডেন্ড খেলেও যথেষ্ট লাভজনক! সেইসঙ্গে কোনো আর্থিক উল্লম্ফন হলে কয়েক গুণ, এমনকি ক্ষেত্রভেদে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন একমাত্র শেয়াবাজারেই সম্ভব, যা অনেক বিনিয়োগকারী জানেনই না! চ. মূল কারণ অনুসন্ধান করে দীর্ঘমেয়াদি, স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে দুষ্টু চক্রের ক্রীড়ানক কথিত অ্যাকশনের কোনো কার্যকারিতা আসলেই নেই! জ. এখনও দেশের সুপরিচিত লাভজনক প্রতিষ্ঠান (কোম্পানি, ব্যাংক, বিমা…) যেগুলো কেবলই ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে অযাচিতভাবে সার্কিট ব্রেকারের রশিতে ঝুলছে, যেগুলোতে বিনিয়োগ এই মহা দুঃসময়েও সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত! সেগুলোর ব্যাপারেও নিয়ন্ত্রক মহোদয় বর্গের কোনো উচ্চবাচ্য নেই! ঝ. বাজারের বর্তমান শ্বাসরুদ্ধকর করুণ দশায় মনে হচ্ছে, শেয়াবাজার স্বাভাবিকীকরণের কোনো পন্থাই আর অবশিষ্ট নেই! ঞ. ‘বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা’ বিষয়টি কাগজে-কলমেই ঘুরপাক খাচ্ছে, এর ‘যথাযথ কার্যকারিতা’ এমনকি কর্তৃপক্ষের ন্যূনতম উদ্বেগের প্রতিফলনও কোথাও নেই! এদের ঘুম ভাঙাবে কে? ট. আইপিও অনুমোদন, নিবন্ধন, তালিকাভুক্তি প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট ‘সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন’-এর ‘লুপহোল’ বন্ধের কার্যকর পদক্ষেপের কোনো লক্ষণই নেই! 

সহজ প্রতিকার

কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগকারীদের মাত্র তিনটি ‘কার্যকর’ পদক্ষেপে অভিশপ্ত পুঁজিবাজারটি নিশ্চিতভাবেই রাহুগ্রাস মুক্ত হতে পারে! এক. ‘পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় মিথ্যা ও ভুয়া ডিক্লারেশন চিরতরে বন্ধ করতে হবে!’ যা বাস্তবায়নের পুরো দায় এসইসি তথা সদাশয় সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল! দুই. সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন-১৯৯৩-এর ৮নং ধারায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির স্বার্থে প্রয়োজনে তার ২৪নং ধারা বলে যুগোপযোগী সংশোধনী এনে এসইসির সব অনৈতিক ফুটো বন্ধ করতে হবে! এবং এর সার্বিক ক্ষমতার প্রয়োগ নিশ্চিত করে ‘এ মুহূর্তে অন্তত শতদেড়েক কলঙ্কিত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার ও কর্মচারীদের স্বার্থ রক্ষাপূর্বক কোম্পানিগুলোকে বাজেয়াপ্ত করতে হবে।’  তিন. যার নাম স্টক বিজনেস বা বান্দাই ব্যবসা! এখানে তাড়াহুড়ার স্থান কোথায়? দেখে-শুনে-বুঝে ঠাণ্ডা মাথায় সফল প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মওকামতো কিনে বান্দাই করতে হবে! তদুপরি কোনো সমস্যায় হতাশ না হয়ে চোখ-কান খোলা রেখে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আর বার্ষিক ডিভিডেন্ডসহ সুযোগমতো বোনাস-রাইট শেয়ারগুলো নিতে হবে এবং লাভজনক স্টকগুলোর আংশবিশেষ সুবিধামতো বিক্রি করে বুঝে-শুনে কম দরের নতুন স্টকে পুঁজি ডাইভার্সিফাই করে শেয়ার লালন-পালন আর বেচা-কেনা চালিয়ে যেতে হবে। নিজকে চালাক ভেবে ভুলেও শর্টকাট অর্জনের ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না!

এককথায়, ‘বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে পুঁজিবাজারে সকল প্রকার ভুয়া ডিক্লারেশন বন্ধে কঠোর সরকারি উদ্যোগ নিতেই হবে এবং বিনিয়োগকারীদেরও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে লংটার্ম বিনিয়োগে সাহস নিয়ে এগিয়ে আসতেই হবে!’

এতে ফটকাবাজের দল তাদের গণ্ডির মধ্যে আর যা-ই করুক না কেন পুঁজিবাজারের গোড়া ধরে আর কোনো দিন ‘টানা-হেঁচড়া’ করতে পারবে না! 

নানা চাপে থাকা তৃতীয় বিশ্বের কোনো সরকারের ঘাড়ে দেশের শেয়াবাজারের দায় সম্পূর্ণ অর্পণ করা যুক্তিসংগত নাও হতে পারে! তাই বলে মুষ্টিমেয় স্বার্থান্বেষীর পদতলে বিশাল এক জনগোষ্ঠীনির্ভর অর্থনীতির স্তম্ভ ‘পুঁজিবাজার’কে সমর্পণ, কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না! তাই তো রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থেই আলোচিত জঞ্জাল পরিষ্কারের জন্য ‘আইনের কঠোর প্রয়োগ’-এর নিশ্চয়তা অত্যাবশ্যক! 

প্রকৌশলী, সাবেক ডিএমডি, তিতাস গ্যাস

[email protected]

প্রকৌশলী, সাবেক ডিএমডি, তিতাস গ্যাস

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..