প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পুঁজিবাজারে জেড’র অশুভ দাপট

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে ‘জেড’ ক্যাটাগরির বেশকিছু দুর্বল কোম্পানির শেয়ারদর ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সে তুলনায় মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারদর তেমন বাড়ছে না। এমনকি যেসব কোম্পানি শতভাগ লভ্যাংশ প্রদান করছে, সেসব কোম্পানির শেয়ারেরও নেই চাহিদা। বিষয়টি অস্বাভাবিক এবং পাশাপাশি দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের অকারণ দর বৃদ্ধি বাজারের জন্য অশুভ সংকেত বলেই মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কিছু দুর্বল কোম্পানির শেয়ারদরে আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে: জিলবাংলা সুগার, শ্যামপুর সুগার, আরএন স্পিনিং, রহিমা ফুড, মেঘনা পিইটি, ফাস্ট ফাইন্যান্স, মাইডাস ফাইন্যান্স, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, বিডি অটো কারস, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক ও ইমাম বাটন। এ সবগুলো কোম্পানিই বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। ফলে মৌলভিত্তির বিচারে এসব শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির বিষয়টি সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছেন সবাই।

বিষয়টি নজর এড়ায়নি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ (বিএসইসি) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষের। ইতোমধ্যে কয়েকটি কোম্পানিকে দর বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে নোটিস পাঠিয়েছে ডিএসই কর্তৃপক্ষ। জবাবে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তাদের শেয়ারদর বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। অন্যদিকে সম্প্রতি দুর্বল সাত কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠন করেছে বিএসইসি। কিন্তু তারপরও এসব কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধির দাপট থেমে নেই।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত এক মাস আগে জিলবাংলা সুগারের প্রতিটি শেয়ারদর ছিল ১৬ টাকা ৪০ পয়সা। গতকাল বৃহস্পতিবার এ শেয়ার লেনদেন হয় ৪১ টাকা ৯০ পয়সায়। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দর বেড়েছে ২৫ টাকা ৫০ পয়সা।

একই সময়ের ব্যবধানে শ্যামপুর সুগারের প্রতিটি শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ৯ টাকা। এক মাস আগে এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয় ১১ টাকা ২০ পয়সায়। গতকাল তা লেনদেন হয় ২০ টাকায়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শ্যামপুর সুগারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘শেয়ারের দর বৃদ্ধির কোনো কারণ আমার জানা নেই। এটা পুঁজিবাজারের ব্যাপার। এখানে শেয়ারদর ওঠানামা করবে এটাই স্বাভাবিক।’

এদিকে আরএন স্পিনিংয়ের শেয়ার গতকাল লেনদেন হয় ২৬ টাকা ৬০ পয়সায়। এক মাস আগে এর দর ছিল ১৭ টাকা ৪০ পয়সা। অর্থাৎ এ সময়ের ব্যবধানে এর প্রতিটি শেয়ারের দর বেড়েছে সাত টাকা ২০ পয়সা।

এক মাসের ব্যবধানে রহিমা ফুডের শেয়ারদর বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। মাসের ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ৪১ টাকা। এক মাস আগে এই শেয়ারের দর ছিল ৯৮ টাকা ৭০ পয়সা। গতকাল যা লেনদেন হয় ১৩৯ টাকা ৫০ পয়সায়।

একই সময় বিডি অটো কারসের প্রতিটি শেয়ারদর বেড়েছে ছয় টাকারও বেশি। এ সময়ের মধ্যে অভিহিত দরের নিচে থাকা মেঘনা পিইটির প্রতিটি শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় দুই টাকা। একইভাবে ফাস্ট ফাইন্যান্সের শেয়ারদর এক টাকা ৪০ পয়সা, মাইডাস ফাইন্যান্সের শেয়ার প্রায় এক টাকা এবং সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় দুই টাকা। এত অল্প সময়ের মধ্যে অভিহিত দরের নিচে থাকা কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে জেড ক্যাটাগরির শেয়ারের যেমন চাহিদা রয়েছে, সে তুলনায় চাহিদা নেই শতভাগ লভ্যাংশ দেওয়া মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের। তথ্যমতে, তালিকাভুক্ত ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো সর্বশেষ ৫৫০ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদান করেছে। এরপরও এই কোম্পানির শেয়ার চাহিদা কমেছে। এক মাসের ব্যবধানে এর প্রতিটি শেয়ারদর কমেছে ৫৪ টাকা। একইভাবে এ সময়ের মধ্যে ৩২০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া বাটা সু’র শেয়ারদর কমেছে ৫০ টাকা। ৫৫০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া অন্য কোম্পানি গ্ল্যাস্কোস্মিথক্লাইনের শেয়ারদর ৯ টাকা এবং ১৪০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া গ্রামীণ ফোনের শেয়ারদর কমেছে পাঁচ টাকা। চাহিদা নেই ম্যারিকো বাংলাদেশের শেয়ারের। এক মাসের ব্যবধানে এ কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে ১২৮ টাকা। অথচ কোম্পানিটি সর্বশেষ ৪৫০ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদান করেছে।

পুঁজিবাজারে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাপটের বিষয়ে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাদের বিনিয়োগকারীরা আগের চেয়ে সচেতন হয়েছেন। ফলে তাদের উচিত হবে না অন্য কারও কথায় বা গুজবে কান দিয়ে শেয়ার কেনাবেচা করা। ইনভেস্ট করার আগে তাদেরই ঠিক করতে হবে তিনি যে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছেন, সেটা ঝুঁকিমুক্ত কি-না। সিদ্ধান্ত ভুল হলে এর মাশুল তাকেই দিতে হবে।’

তিনি বিনিয়োগকারীদের ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির সঙ্গে থাকার আহ্বান জানান।

ডিএসইর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক শাকিল রিজবী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘পুঁজিবাজার এখন ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে। বিনিয়োগকারীরাও বাজারে ফিরে আসছেন; এটা ভালো খবর। তবে তাদের কাছে অনুরোধ থাকবে  তারা যেন কোনো ধরনের ভুল না করেন।’ তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজারে এখন অনেক ভালো মৌলভিত্তির শেয়ার ক্রয়যোগ্য রয়েছে। দুর্বল কোম্পানির দিকে না ঝুঁকে তারা যদি এসব কোম্পানিতে দেখেশুনে বিনিয়োগ করতে পারেন, তাহলে তারা ভালো ফল আশা করতে পারবেন।’

একই প্রসঙ্গে ডিএসইর এক সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ঊর্ধ্বমুখী বাজারে সুযোগ সন্ধানীরা ওঁৎ পেতে থাকে। এ সময় অনেকেই তাদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। কথাটি বিনিয়োগকারীদের মাথায় রাখা উচিত। কারণ পুঁজি যার, নিরাপদ রাখার দায়িত্ব তারই।’