প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পুঁজিবাজারে তারল্য সংকটের শঙ্কা নতুন বছরে

শেখ আবু তালেব: কয়েক মাস ধরেই মিশ্র প্রবণতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। লেনদেনের পরিমাণ ও শেয়ারের দরে নেই স্থিতিশীলতা। মৌসুমি ও সুযোগসন্ধানী বিনিয়োগকারীরা এখন অর্থ সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। এতে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের তারল্য কমে যাবে বলে মনে করা হয়। এ-সংক্রান্ত এক গবেষণাও করেছে একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান।

পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নেয়ায় এ সমস্যার শুরু হয়েছে, যা চলতি বছরে তারল্য সংকটের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আবার পুঁজিবাজার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় ব্যাংকগুলো নিরাপদ খাত হিসেবে সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে, যদিও এখনও অধিকাংশ ব্যাংকই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সক্ষমতার নিচে রয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সদ্যবিদায়ী বছরের শেষের দিক থেকে করোনা সংক্রমণের প্রকোপ কিছুটা কমে আসছে। অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই কর্মতৎপরতা বাড়তে শুরু করে। এতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে জাতীয় অর্থনীতিতে। এর চাপে পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নিতে শুরু করেছে অনেক বিনিয়োগকারী। এ তালিকায় রয়েছে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। পুঁজিবাজারে এসব বিনিয়োগকারীর উপস্থিতি গত বছরের সূচক ও লেনদেন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এখন তারা বিনিয়োগ তুলে নেয়া শুরু করলে বাজার অনেকটা নড়বড়ে হয়ে ওঠে। কখনও সূচকের উত্থান, কখনও পতন হচ্ছে।

বিনিয়োগ যে ক্রমান্বয়ে সরে যেতে শুরু করেছে, তা বোঝা যায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন তথ্য বিশ্লেষণ করলে।

জানা গেছে, ডিএসইতে কয়েক মাস ধরে হওয়া লেনদেন অনেকটা গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের ওপর ভর করে চলছে। হাতে গোনা পাঁচ থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠান মোট লেনদেনের এক-চতুর্থাংশ থেকে শুরু করে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখছে। দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে একক কোম্পানি হিসেবে।

সর্বশেষ গত ৯ ও ১০ জানুয়ারি ডিএসইর মোট লেনদেনে ২৫ শতাংশ অবদান রেখেছে পাঁচটি কোম্পানি। শীর্ষ ২০ কোম্পানির অবদান রেখেছে ৫০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ শীর্ষ ২০ কোম্পানিই লেনদেনে অর্ধেকের বেশি অবদান রেখেছে। এর মধ্যে একক কোম্পানি হিসেবে সর্বোচ্চ ছয় দশমিক ৯ শতাংশ একটি কোম্পানি। আর একক হিসেবে তিন শতাংশের ওপরে অবদান রাখে সাত কোম্পানি। দুই শতাংশের উপরে ও তিন শতাংশের নিচে অবদান রাখা কোম্পানির সংখ্যা হচ্ছে দুটি। অবশিষ্ট কোম্পানিগুলো দুই শতাংশের নিচে অবদান রাখে। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর ভর করেই চলছে বাজারের সূচক ও লেনদেন। কিছু সময় সূচক ও শেয়ারের দর পতন হলে পরে এসব কোম্পানিই ভূমিকা রাখছে। মাঝে মাঝে প্রাতিষ্ঠানিক খাত এগিয়ে আসছে।

গত ১০ জানুয়ারি ডিএসইর লেনদেনের শুরু হয় টালমাটাল অবস্থার মধ্যে দিয়ে। পতন হওয়া সূচক তুলতে ভূমিকা রাখে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো। দিনটিতে শেয়ারের দর, লেনদেন ও সূচক বৃদ্ধিতে এগিয়ে আসে পাওয়ার গ্রিড, তিতাস গ্যাস ও বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল। এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেক্সিমকো, বেক্সিমকো ফার্মা, স্কয়ার ফার্মা, বিএসআরএম, জিএসপি ফাইন্যান্স ও জিপিএইচ ইস্পাত। ব্যাংক খাতের মধ্যে এগিয়ে আসে এনআরবি এবং ওয়ান ব্যাংক।

এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেছেন, ‘গত বছর খাতভিত্তিক অবস্থানের চেয়ে কোম্পানির শেয়ারের প্রতি ঝোঁক ছিল একশ্রেণির বিনিয়োগকারীর। আগে এটি তেমন দেখা দেয়নি। কোম্পানিভিত্তিক শেয়ারের বিপরীতে বিনিয়োগ করেছেন তারা। এসব শেয়ারের দর অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, যার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। যারা পুঁজিবাজার না বুঝেই বিনিয়োগ করেছেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসব শেয়ারের লেনদেন তথ্য যাচাই করে দেখতে পারে, এখানে কোনো সিন্ডিকেটেড বা আর্টিফিশিয়াল ট্রেড হয়েছি কি না।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় অঙ্কের বিনিয়োগ তুলে নেয়ায় শেয়ারের নতুন ক্রেতা সেভাবে মিলছে না পুঁজিবাজারে। আবার সামর্থ্যবানরা সতর্ক রয়েছেন এই ভেবে যে, যেকোনো সময় বাজার নেতিবাচক ধারায় চলে যেতে পারে। বাজার একবার নেতিবাচক ধারায় গেলে আগের অবস্থানে ফিরতে দীর্ঘ সময় নিচ্ছে। সূচক বাড়লেও শেয়ারের দরে আগের অবস্থানে ফিরছে না।

জানা গেছে, করোনার সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময় এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঋণ ঘোষণা করা হয়। গণহারে এ সুবিধা পান সব ধরন ও শ্রেণির উদ্যোক্তারা। আগের মূল ঋণের বিপরীতে নতুন করে ৩০ শতাংশ হারে প্রণোদনার ঋণ পান উদ্যোক্তারা। এসব ঋণের একটি বড় অংশ গিয়েছিল পুঁজিবাজারে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেও উঠে আসে।

অপরদিকে অর্থনীতির প্রায় সব খাতের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এ সময়ে পুঁজিবাজারের পতন ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বেশকিছু নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেয়, যা পুঁজিবাজারে বেশ ইতিবাচক হিসেবে দেখা দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ। এতে অনেকেই বাজারমুখী হন। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ শুরু করেন। মৌসুমি এসব বিনিয়োগকারীর কারণে বাজারও ইতিবাচক প্রবণতায় ফেরে। ২০২১ সালের প্রথমার্ধে ডিএসইর সূচকগুলো অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেতে থাকে। এতে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি রিটার্ন পেয়েছেন অনেকে। তাদের কাছে শেয়ারগুলো এখন বিনিয়োগ ঝুঁকির সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়েছে। শেয়ার বিক্রির এখনই সময়। সেই হিসাব কষেই শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, এখন সেই মৌসুমি বা সুযোগসন্ধানী বিনিয়োগকারীরা অর্থ সরিয়ে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোথাও বিনিয়োগ শুরু করেছেন, যা শুরু হয়েছে কয়েক মাস ধরেই। ফলে বছরের শুরুতেই তারল্য সংকটে ভুগবে পুঁজিবাজার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।