আজকের পত্রিকা প্রচ্ছদ প্রথম পাতা মত-বিশ্লেষণ

পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুফল

 মো. রকিবুর রহমান: বর্তমান বিশ্ব করোনা ভাইরাস আতঙ্কে নিমজ্জিত, বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এই লেখাটি আমার দীর্ঘদিনের বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা নিয়ে এ মুহূর্তে সব প্রকার বিনিয়োগকারী বিশেষ করে ইনস্টিটিউশনাল এবং যে সব প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীর পক্ষে পোর্টফোলিও ম্যানেজ করে, বড় বড় বিনিয়োগকারী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারী এবং সর্বশেষ যে সব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি মিউচুয়াল ফান্ড ম্যানেজ করে এবং যে সব বিনিয়োগকারী ডে ট্রেডিং করতে অভ্যস্ত তাদের প্রতি আমার বিনিয়োগে অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু সুপারিশ তুলে ধরলাম। আশা করি এই লেখাটি বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগে সিদ্ধান্ত নিবেন।

 সার্বিক করোনাভাইরাস (কোভিড ১৯) কে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক, দ্বিতীয়ত কম বেশি সব দেশেরই অর্থনৈতিক মন্দা, কল কারখানা বন্ধ, উৎপাদন, আমদানি, রফতানি সব খাত কম বেশি স্থবির৷ আইএমএফ প্রধান বলেছেন, সারা পৃথিবীর অর্থনীতির মন্দা ভাব চলতে থাকবেl বাংলাদেশের অর্থনীতিও বাইরে না৷ তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে, কোন দেশ কত দ্রুত তার আর্থিক সংকট কাটিয়ে, কে কিভাবে ঘুরে দাঁড়াবে? আমি বিশ্বাস করি, ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ পৃথিবীর কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি হবে যেটি মন্দা দ্রুত কাটিয়ে উঠবে৷ 

পুঁজিবাজারে কখন এবং কেন বিনিয়োগ করবো?

সাধারণত কোনো সফল বিনিয়োগকারীর যদি আমরা হিস্ট্রি দেখি যেমন ওয়ারেন বাফেট একজন সফল বিনিয়োগকারী হিসেবে সারা বিশ্বে সমাদৃত, পুঁজিবাজার থেকে তিনি পৃথিবীর অন্যতম সফল শ্রেষ্ঠতম সম্পদশালী ব্যক্তি হয়েছেন। কীভাবে? তিনি নিজে বলেছেন যখন পুঁজিবাজারে ধস নামে, যখন বিনিয়োগকারী হতাশ হয়ে শেয়ার বিক্রি করে দেয়, তখন ওয়ারেন বাফেট ভালো ভালো ফান্ডামেন্টাল শেয়ার অত্যন্ত কম দামে কিনে ফেলেন এবং দীর্ঘ দিন ধরে রাখেন। পুঁজিবাজারের ধর্মই হলো, যে কোনো ভালো শেয়ার যদি কোনো বিনিয়োগকারী সঠিক সময়ই কিনে ফেলতে পারেন এবং দীর্ঘদিন ধরে রাখার ক্যাপাসিটি অর্জন করেন, দেখা গেছে ২-৪ বছরের মাঝে যে টাকাটি তিনি বিনিয়োগ করেছিলেন বাজারের খারাপ সময়ে, এখন সেই শেয়ারটি বিক্রি করে বিশাল পরিমাণে ক্যাপিটাল গেইন করেছেন। এখন আমি আমার একটি বিনিয়োগ অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

আপনারা জানেন, ১৯৯৬ সালে শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি হচ্ছিলো, আমি শুধু বলবো একটি শেয়ারের কথা যেটি আমার কাছে ছিল। সেই শেয়ারটির নাম ছিল চিটাগাং সিমেন্ট ক্লিংকার গ্র্যান্ডিং ফ্যাক্টরি। শেয়ারটি আমার কেনার অ্যাভারেজ প্রাইস ছিল ১২০০ টাকা, আমি এই শেয়ারটি কেনার সময় সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা লোন নিয়েছিলাম, অ্ন্যান্য ব্যাংক থেকেও আমি বিভিন্ন শেয়ার কেনার জন্য লোন নিয়েছিলাম। এই শেয়ারটির দাম উঠেছিল সর্বোচ্চ ১৪ হাজার টাকা, এরই মধ্যে এই শেয়ারটির দাম যখন ১১ হাজার ৫০০ টাকা করে চলছিল তখন ইচ্ছা করলেই শেয়ার পাওয়া যেতো না, আমাদের একজন মেম্বার তখন ১১,৫০০ টাকা দিয়ে কিছু শেয়ার কিনেছিল, আমি তার থেকে অনেক অনুরোধ করে এই দামে ৫০০ শেয়ার নিয়েছিলাম। ওই সময় আমাদের একজন মেম্বারের নাম বলতে হয়, তার নাম হলো শাহ মোহাম্মদ সগীর, তিনি আমাদের মাঝে নাই, এই নামটি এ জন্যই আনলাম, তখন বাজারে একটি কথা প্রচলন ছিল শাহ মোহাম্মদ সগীর যেই শেয়ার ধরবে সেটাই বাড়বে। অবশ্যই শাহ মোহাম্মদ সগীরের কথায় আমিও কিছু শেয়ার কিনেছিলাম।

আরেকটি কথা বলতে হয়, ওই সময়ে আমাদের একজন মেম্বার আমার কাছে এসেছিলেন বাজার পরিস্থিতি বোঝার জন্য এবং কিছু উপদেশ নেয়ার জন্য, তিনি বললেন রকিব ভাই আমার কাছে অনেক এপেক্স ফুডের শেয়ার আছে, তখন এইটার বাজার মূল্য ছিল ১৮,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা। তিনি জানতে চাইলেন আমি এখন শেয়ার বিক্রি করবো না ধরে রাখবো। আমি চিন্তা করে দেখলাম এই মুহূর্তে বিক্রি করার কথা বললে কেউ বিক্রি করবে না। তখন আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসলো। আমি উনাকে বললাম যে আপনি একটা কাজ করতে পারেন, অর্ধেক শেয়ার বিক্রি করে দেন আর বাকি অর্ধেক শেয়ার রেখে দেন। তাতে আপনার দুদিকে উপকার হবে। প্রথম উপকার হবে, অর্ধেক শেয়ার বিক্রি করার পর যদি শেয়ার এর দাম কমে যায়, তবে আপনি আপসোস করবেন না এই কারণে যে আপনি অলরেডি ভালো দামে অর্ধেক শেয়ার বিক্রি করেছেন। আর যদি দাম বাড়ে তবে আপনার কোনো আপসোস থাকবে না এ কারণে যেহেতু অর্ধেক শেয়ার আপনার হাতে আছে।

আমি কী করলাম?

তখন আমি আমার হাতে থাকা ১২ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছি। অপরপক্ষে ১০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছি অথচ চিটাগং ক্লিংকারের একটি শেয়ারও বিক্রি করিনি। একেবারেই বুঝতে পারিনি, বাজারে কোনো বড় ধরনের ধস নামবে। ১৯৯৬, নভেম্বর এর প্রথম সপ্তাহে বড় ধরনের ধস নামা শুরু হয়েছিল, বিনিয়োগকারীসহ আমরা সবাই হতভম্ব হয়ে গেলাম। প্রতিদিন শেয়ারের দাম পড়তে থাকলো, কিন্তু কেন জানি আমার একটি দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আমার মতো অনেকেরই এই বিশ্বাস ছিল যে, বাজার অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে, কিন্তু আমাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল হয়ে চিটাগাং সিমেন্ট ক্লিংকারের দাম ১৪০০০/১৫০০০ হাজার থেকে নেমে ৫০০ টাকায় চলে আসলো, যা আমার অ্যাভারেজ প্রাইসের অনেক কম। এরপর আমি যে সিদ্ধান্তটি নিলাম, আজকের এই পরিস্থিতিতে সকল বিনিয়োগকারীকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করবে।

প্রথমত আমি দেখলাম, বাজার যখন চূড়ান্ত ক্রাশ করলো তখন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে আমরা যারা লোন নিয়েছিলাম আমাদের লোনের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ শুরু করলো। আমার তখন শেয়ারের দাম যেটা সর্বোচ্চ ২৩ কোটি টাকা ছিল এক সময় তা কমে ৬ কোটি টাকার নিচে চলে এলো, অপরদিকে আমার ব্যাংক লোন প্রায় ৬ কোটি টাকার কাছাকাছি, আমি ধৈর্য সহকারে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সচেষ্ট হলাম এবং আমি চিন্তা করলাম কোনো অবস্থাতেই আমি কোনো শেয়ার বিক্রি করবো না। এখান থেকে আমি সচেষ্ট হলাম, এটলিস্ট কিছু টাকা দিয়ে আমার ব্যাংক লোন ২ বছরের জন্য রি-সিডিউল করার জন্য মুভ করলাম। আমি মনে মনে ভাবলাম এই শেয়ারগুলো যদি আমি দুই তিন বছর ধরে রাখতে পারি, যেহেতু শেয়ারগুলো অত্যন্ত ফান্ডামেন্টাল শেয়ার ছিল, এখান থেকে আমি বিক্রি করে লাভ না করতে পারি কিন্ত মন বলছে আমি অন্তত লোনের টাকা শোধ করতে পারবো৷ কিন্ত তখন ব্যাংক লোনের ইন্টারেস্ট অনেক হাই ছিল এবং চক্র বৃদ্ধি হরে ইন্টারেস্ট বাড়ছিল ।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে চিটাগং সিমেন্ট ক্লিংকারের শেয়ারের দাম যখন হাই প্রাইসের দিকে যাচ্ছিলো তখন ১৯৯৫-৯৬ ইয়ারইন্ডের জন্য ডিভিডেন্ড ঘোষণা করছিলো একটি শেয়ারের বিপরিতে ৫০% বোনাস এবং ৫০% রাইট ৷ এতে করে আমি উপকৃত হয়ে গেলাম৷ আমার ১২০০০ শেয়ার ২৪০০০ হলো এবং আমার এভারেজ প্রাইসও কমে গেলো এবং আমি দেখলাম ২, ৩ বছরের মাথায় আমার চিটাগাং সিমেন্ট ক্লিংকারের শেয়ারের দাম আমার এভারেজ ক্রস করে লাভ চলে আসলো৷ ঠিক তেমনি ভাবে অন্যান্য ভালো শেয়ারগুলো আমার এভারেজ প্রাইসের উপরে উঠতে থাকলো৷ অপর পক্ষে যত বাজে শেয়ার ছিলো সব গুলো পড়তে থাকলো৷ তখন আমি আর দেরি না করে সিদ্ধান্ত নিলাম লাভের আর দরকার নাই৷ আমাকে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে হবে, আমি আর লোভ না করে ক্রমান্বয়ে ভালো ভালো শেয়ারগুলো বিক্রি করে সকল লোন পরিশোধ করে দিলাম এবং ঋণ মুক্ত হলাম, সাথে কিছু টাকাও পেলাম৷

এটা থেকে এটাই প্রমাণ হয়, যদি আপনি কোনো ভালো শেয়ারে দীর্ঘ মেয়াদে থাকতে পারেন৷ অন্তত আপনার লস হবেনা, আরেকটি জিনিস অনুভব করলাম, আমি তখন পুঁজিবাজারে ছোট খাটো একজন নেতা, সারাক্ষণ বক্তব্য দিয়ে বেড়াতাম ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একজন পরিচালক হিসেবে৷ আমার বড়ো সান্তনা এইটা, আমি আমার বিনিয়োগকারী ভাইদের উপর আনজাস্টিফায়েড প্রাইসে কোনো দিনও কোনো শেয়ার বিক্রি করিনি৷ মহান আল্লাহর কাছে এইজন্য হাজার শুকরিয়া৷ আর যে মেম্বার ভাইটিকে আমি এপেক্স ফুডের বাপারে যে পরামর্শ দিয়ে ছিলাম তিনি কিন্ত একটি শেয়ারও বিক্রি করেন নাই, লোভে পড়ে বা উচ্চ দাম পাওয়ার আসায়৷ পরবর্তীতে উনি বড় ধরনের লস করেছিলেন৷ আরেকটি উদাহরণ এখানে আনতে পারি, আজকের এনসিসি ব্যাংক সেই সময় একটি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ছিলো, তখন ১৯৯৪, ৯৫, ৯৬ এ তারা অনেক ভালো ভালো শেয়ার এ ইনভেস্টমেন্ট করেছিল এবং আমাদেরকেও শেয়ার বিনিয়োগে ঋণ দিয়েছিল৷ তারাও বাজার যখন উচ্চ দামে ছিলো, তারা কিন্ত তখন শেয়ার বিক্রি করে নাই, পরবর্তীতে দর পতনের সময় তারা তাদের শেয়ার বিক্রি না করে ধরে রেখেছিলো৷ দুই চার্ বছরের মধ্যে যখন ভালো শেয়ারের দাম বাড়া শুরু হলো তখন তারা আস্তে আস্তে শেয়ার বিক্রি করে প্রচুর লাভ করেছিলো৷ ওই লাভের টাকা দিয়ে তারা পরবর্তীতে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক এনসিসি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন৷ এটাও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে থাকে ভাল শেয়ারে বিনিয়োগ করার ব্যাপারে ৷

এবার আমরা মূল বিষয়ে আসি, সার্বিক করোনাভাইরাস (কোভিড ১৯) কে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক, দ্বিতীয়ত কম বেশি সব দেশেরই অর্থনৈতিক মন্দা, কল কারখানা বন্ধ, উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি সব খাত কম বেশি স্থবির৷ আইএমএফ প্রধান বলেছেন করোনা ভাইরাসের কারণে সারা পৃথিবীর অর্থনীতির মন্দা ভাব চলতে থাকবেl এই অবস্থা থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিও বাহিরে না৷ তবে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে, কোন দেশ কত দ্রুত তার আর্থিক সংকট কাটিয়ে, কে কিভাবে ঘুরে দাঁড়াবে? আমি বিশ্বাস করি, ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ পৃথিবীর কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি হবে যেটি মন্দা দ্রুত কাটিয়ে উঠবে৷ এখন এই মুহূর্তে বিভিন্ন বিনিয়োগকারী, কি কি বিবেচনায় এনে কোন কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করবে৷ কোনটা দীর্ঘমেয়াদি করবে, অথবা কোনটা স্বল্পমেয়াদি করবে (স্বল্পমেয়াদি বলতে ন্যূনতম ৬ মাস)l স্বল্প মেয়াদি করুন আর দীর্ঘমেয়াদি করুন, দেখতে হবে করোনা ভাইরাসের কারণে কোন কোন লিস্টেড কোম্পানি এফেক্টেড হয়েছে আর কোন কোনটি এফেক্টেড হয়নি৷ যেমন এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড গার্মেন্টস যেগুলো লিস্টেড আছে, সেগুলোর এফেক্ট আমরা দেখতে পাচ্ছি, কারণ এক্সপোর্ট অর্ডার গুলো বন্ধ হয়ে গেছে৷ তাতে করে এই লিস্টেড কোম্পানি গুলো সামনে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে৷ দ্বিতীয়ত, যারা ইম্পোর্ট করে ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসা করছেন তারাও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন৷ এই দুইটাকে বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ করতে হবে৷ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী যারা ডে ট্রেডিং এ অভ্যস্ত তাদের প্রতি আমার কোনো সুপারিশ নেই৷ শুধুমাত্র সুপারিশটি হলো যে সকল বিনিয়োগকারী ফান্ডামেন্টাল দেখে, কোম্পানির গ্রোথ দেখে সত্যিকার ভাবে কোম্পানি বিশ্লেষণ করে, তাদের রিজার্ভ দেখে, বিগত ৫ বছরে তাদের পে আউট দেখে বিচার বিশ্লেষণ করে যারা বিনিয়োগ করে, তাদের প্রতি বিনিয়োগে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমার সুপারিশ৷ যারা টেম্পটেড হয়ে শেয়ার কিনে অথবা সার্কুলার ট্রেডিং এর প্রভাবলে শেয়ার কিনে অথবা রুমারের ভিত্তিতে শেয়ার কিনে অথবা নিজেরা কোনো বিচার বিশ্লেষণ না করে শেয়ার কিনে তাদের প্রতি আমার কোনো সুপারিশ নেই৷

কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করবো?

লিস্টেড কোম্পানির মধ্যে এমন কিছু শেয়ার আছে যারা, করোনা ভাইরাসে এফেক্টেড না, যেমন, পাওয়ার সেক্টর, গ্যাস এবং ইলেকট্রিকাল ট্রান্সমিশন সেক্টর অথবা ফার্মাসিউটিকাল সেক্টরস যেগুলো এইমুহূর্তে খুব বেশি এফেক্টেড হওয়ার কথা না৷

যখন একটি দেশের অর্থনৈতিক মন্দা চলতে থাকে তখন কিন্ত প্রাইভেট সেক্টর দুর্বল হয়ে তখন পাবলিক সেক্টর মানে সরকার এগিয়ে এসে বড় বড় প্রজেক্ট করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য৷ সব দেশের সরকার যখন এই কার্যক্রম গুলো শুরু করে শুধুমাত্র কর্মসংস্থানের জন্য তখন কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি গুলো যেগুলো রড, সিমেন্ট, বালু, কোম্পানিগুলো উপকৃত হয়৷ একজন বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রত্যেকটি অবস্থানকে বিশ্লেষণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অবস্থান সুযোগ হয়েছে৷ বিশেষ করে আমি প্রথম বলবো, ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন যাদেরকে বাংলাদেশ ব্যাংক সহজ শর্তে বিনিয়োগের জন্য যে ২০০ কোটি টাকা দিয়েছেন তাদেরই প্রথম উদ্বেগটা নিতে হবে৷ যেহেতু এই ২০০ কোটি টাকা ৫ বছরের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছেন৷ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এক্সপার্ট বা এনালিস্টরা সরকারের দেয়া ২০০ কোটি টাকার সুযোগ নিয়ে যদি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেন তাতে অবশ্যই তারা লাভবান হবেন এবং পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে বড়ধরণের ভূমিকা রাখতে পারবেন৷ কোরোনা ভাইরাসের কারণে যে অর্থনৈতিক মন্দা আমি মনে করি বেশি দিন হবেনা ইনশাআল্লাহ৷

বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু সুপারিশ:

আমাদের মধ্যে আমরা যারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে থাকি তারা অবশ্যই বিনিয়োগ করে বসে আছি৷ দ্বিতীয়ত, অনেক বড় বিনিয়োগকারী আছেন তারা হাত গুটিয়ে বসে আছেন আমাদের সবার জন্য একটি সুযোগ আছে যেমন আমি যে শেয়ারগুলো কিনেছি সেই শেয়ার গুলো দাম অনেক কমে গেছে, বিশেষ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মূল্য একেবারে তলানিতে, যদি আমার কাছে টাকা থাকে আমি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ফান্ডামেন্টাল দেখে কিছুটা অ্যাভারেজ করতে পারি , মার্কেট ক্লোস ডাউনের আগে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একটি শেয়ার এ বিনিয়োগ করে আমি সুফল পেতে যাচ্ছি এর এক মাত্র কারণ হলো আইনের মাধ্যমে সকল লিস্টেড কোম্পানিকে বাধ্য করা হচ্ছে৷ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয়ার জন্য ইতিমধ্যে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্যাশ প্লাস বোনাস ঘোষনা করেছেন৷ আমরা আশা করি অন্যান্য ভালো আর্থিক প্রতিষ্ঠান গুলো এই মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষনা করবে৷ অপরদিকে আমি মনে করি লিস্টেড যতগুলো ভালো ভালো কোম্পানি আছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ স্ব স্ব কোম্পানিতে যারা স্পনসর পরিচালক আছেন তাদেরকে অনুরোধ করবো এই পর্যায়ে আপনাদের কোম্পানিতে শেয়ারের দাম সবনিম্নে আছে, এটাও আপনাদের জন্য শেয়ার কিনার একটি বড় সুযোগ৷ যেহেতু, কোম্পানি বাই ব্যাক আইন আমাদের দেশে নাই সেহেতু ভালো ভালো কোম্পানি স্ট্রং রিজার্ভ থেকে শেয়ার কিনতে পারছেনা৷ মাননীয় অর্থমন্ত্রী লিস্টেড কোম্পানি বাই ব্যাক আইন করার জন্য উদ্বেগ নিয়েছেন, আশা করি এই আইন বাস্তবায়ণন হলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশের পুঁজিবাজার উপকৃত হবে বিনিয়োগকারীও উপকৃত হবে৷ সকল দিক বিবেচনা করে নিজেদের অভিজ্ঞতা খাটিয়ে আশাকরি বিনিয়োগকারীরা হতাশ না হয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগে থাকবেন৷ ইমোশনকে কোনো দাম দিবেন না৷ কোনো প্রকার সার্কুলার ট্রেডিং ও ম্যানিপুলেশন এর সাথে জড়িত থাকবেন না, বেশি বেশি করে টেমপেড হবেননা লোভ সংবরণ করবেন৷ কারণ রাতারাতি পুঁজিবাজার থেকে টাকা কামিয়ে বড়োলোক হবার স্বপ্ন ত্যাগ করুন৷

সকল দিক বিচার বিবেচনা করে পুঁজিবাজারের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সবাইকে সবার স্থান থেকে কিছু কাজ করতে হবে৷ মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে আমি অনুরোধ করবো, লিস্টেড কোম্পানি বাই ব্যাক আইনটি জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর করার জন্য৷ যেসকল লিস্টেড কোম্পানি করোনা ভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদেরকে স্বল্প সুদে আর্থিক প্রণোদনা দেয়ারl আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সুশাসনের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য৷ তৃতীয়ত, যখন আর্থিক মন্দা চলে তখন প্রাইভেট সেক্টর দুর্বল হয়ে পরে৷ প্রচুর বেকার সমস্যার সৃষ্টি হয়৷ কনস্ট্রাশন কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন ম্যানুফ্যাকচারিং বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন হয়৷ এইসময়, সরকারের উদ্বেগে বড় বড় প্রজেক্টে কাজ শুরু হলে আবার কর্ম সংস্থান সৃষ্টি হবে৷ মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে আমি অনুরোধ করবো, লিস্টেড কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট ট্যাক্স কমিয়ে দেয়ার জন্য৷ তাতে করে , লিস্টেড কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের ভালো ডিভিডেন্ড দিতে পারবে৷ শুধু একটি কথা এইখানে বলতে চাই, একই পণ্য উৎপাদনকারী একটি লিস্টেড কোম্পানি এবং নন লিস্টেড কোম্পানি দুই রকমের ট্যাক্স দেয়, লিস্টেড কোম্পানিকে একটি স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য অডিটেড একাউন্টস তৈরির মাধ্যমে ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়, অপরদিকে একটি নন লিস্টেড কোম্পানির তেমন কোনো জবাদিহিতা থাকেনা৷ সম পরিমানের উৎপাদন এবং বিক্রয়ের পরেও লিস্টেড কোম্পানি বেশি পরিমানের ট্যাক্স দিয়ে থাকে৷ কারণ লিস্টেড কোম্পানিকে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার তেমন কোনো সুযোগ নাই, কারণ তাকে কিছু ইন্টারন্যাশনাল একাউন্টসের আইন মেনে কাজ করতে হয় এবং প্রতি তিন মাস পর পর তাকে কোম্পানির সর্বশেষ অবস্থা বিনিয়োগকারীকে জানাতে হয়৷ অপরদিকে, নন লিস্টেড কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগ নিজেদের প্রয়োজন মতো একাউন্টস তৈরী করেন৷ সেহেতু তাদের কোনো জবাব দিহিতা করতে হয়না৷

আমরা পুঁজিবাজারের স্বার্থে যে যেখানে আছি আমাদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে কাজ করতে হবে৷ করোনা ভাইরাস আতঙ্ক অর্থনৈতিক দীর্ঘমেয়াদি মন্দার সম্ভাবনা সামনে রেখে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে কিছু কিছু ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ভূমিকা পালনের অনুরোধ করছি৷ যে সকল কোম্পানির পরিচালকদের সম্মিলিত ৩০% শেয়ার নেই এবং এককভাবে ২% শেয়ার নেই তাদেরকে আইনের আওতার মধ্যে এনে বাধ্য করতে হবে ৩০% শেয়ার পূরণ করার জন্য৷ কোনো লিস্টেড কোম্পানি যেন কোনো ধরণের অনিয়ম করতে না পারে তারজন্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে৷ নতুন আইপিও দেয়ার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে অথবা প্রিমিয়াম দেয়ার ক্ষেত্রে বড়ধরণের যাচাই বাচাই করতে হবে৷ একাউন্টস ও অডিট রিপোর্ট, প্রসপেক্টসে ১০০% স্বচ্ছতা থাকতে হবে৷ বিশেষ করে ক্যাপিটাল রেইজে যারা টাকা ইনজেক্ট করে, উৎপাদন এবং গোডাউনে সংরক্ষিত মাল এবং জমির মূল্যের ক্ষেত্রে সন্দেহ থাকলে ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন করতে হবে৷ ক্যাপিটাল রেইজে যে টাকা ইঞ্জেক্ট করা হচ্ছে সেই টাকার উপর ট্যাক্স দেওয়া হচ্ছে কিনা তা কনফার্ম করতে হবে৷ পুঁজিবাজারে আসার আগে কোনো কোম্পানি রাতারাতি যদি সন্দেহজনক কোনো ক্যাপিটাল রেইজ করে অথবা উৎপাদন বৃদ্ধি পায় অথবা বিক্রি বেড়ে যায় অথবা গোডাউনে অতিরিক্ত তৈরী মাল থাকে যেগুলো দেখিয়ে শেয়ার প্রাইসকে বাবল করা হয় এবং বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করা হয় সেখানে আমাদেরকে দেখতে হবে যে কোম্পানিটি বাজারে আসছে অথবা কোনো এক্সিস্টিং কোম্পানি বাজারে উৎপাদিত অবস্থায় আছে সেখানে তুলনা করে দেখতে হবে আদৌ আইপিও তে আনার জন্য যে কোম্পানি তথ্য দিচ্ছে সেটা সত্য কিনা? পুঁজিবাজারে সার্কুলার ট্রেড এবং ম্যানুপুলেশন কঠোরভাবে দমন করতে হবে৷ যে যত বড়োই হউক আইনের আওতায় এনে শাস্তির বন্দোবস্ত করতে হবে৷ দেশের অর্থনৈতিক উন্নোয়নের জন্য একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজারের কোনো বিকল্প নেই৷ বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান যারা এখনো বড় বড় প্রতিষ্ঠান পারিবারিকভাবে পরিচালনা করে তাদেরকে পুঁজিবাজারে আনার জন্য উৎসাহিত করতে হবে৷ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে তাদেরকে সম্পূর্ণ ফান্ডিং বন্ধ করতে হবে৷

সরকারের হাতে থাকা লাভজনক ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে যেটার কাজ ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মাননীয় অর্থমন্ত্রী শুরু করেছেন সেটা ত্বরান্বিত করতে হবে৷ বাংলাদেশ ব্যাংকেরও সহযোগিতার হাত এগিয়ে আনতে হবে৷ পুঁজিবাজারে সরকারের পক্ষ থেকে ২০০ কোটি টাকা করে দেওয়া হয়েছে৷ এই টাকাটি যেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান সহজভাবে নিতে পারে এবং বিনিয়োগ করতে পারে তার সুযোগ করে দেওয়া৷

লেখক: সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান পরিচালক
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..