‘পুঁজিবাজার এখন বিনিয়োগের সর্বোৎকৃষ্ট জায়গা’

প্রায় আট মাস আগে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর বেশকিছু মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির আইপিওর অনুমোদন দেয়ার পাশাপাশি বাতিল করা হয়েছে বেশকিছু দুর্বল কোম্পানির আইপিও আবেদন। পাশাপাশি তার দায়িত্ব নেয়ার পর পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক স্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি তিনি পুঁজিবাজারের বর্তমান অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন দৈনিক শেয়ার বিজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ।  পাঠকদের জন্য এ সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

শেয়ার বিজ: দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সার্বিক অবস্থা ভালো এরই মধ্যে আগস্টে পারফরম্যান্সের দিক থেকে পৃথিবীর সেরা পুঁজিবাজারের খেতাব অর্জন করেছে ডিএসই আপনার মতে এর মূল কারণ কীশেয়ারদর, ইপিএস, পিইরেশিও সব দিক দিয়ে পুঁজিবাজার বিনিয়োগযোগ্য অবস্থানে সেজন্য, নাকি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য?

শিবলী রুবাইয়াতউলইসলাম: আমার মনে হয় পুঁজিবাজারের এই অবস্থার জন্য বিনিয়োগকারীদের মনোভাবটা অনেক বেশি কাজ করেছে। বাজারের প্রতি তাদের আস্থা বেড়েছে। যে কোনো সঞ্চয়ের জন্য বিনিয়োগকারীরা নিরাপত্তা ও বিশ্বাস খোঁজেন।  নিরাপত্তা পেলেই তারা বিনিয়োগ নিয়ে আসেন। বর্তমান পুঁজিবাজারে সেই পরিবেশ বিরাজ করছে। আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করার পর গত ছয় মাসে বাজার মূলধন বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে রয়েছে ধারাবাহিক স্থিতিশীলতা। এটা সম্ভব হয়েছে শুধু বাজারের প্রতি বিনিয়োগারীদের আস্থা ফেরার কারণে, যার ফলে ওই সময়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার পৃথিবীর সেরা পুঁবাজারের খেতাব অর্জন করতে পেরেছে।

শেয়ার বিজ: আমাদের দেশের পুঁজিবাজারের যে সাইজ (আকার), এটা নিয়ে বাজার মূলধন কত হওয়া উচিত, সঙ্গে সঙ্গে দৈনিক গড় লেনদেন কত হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

শিবলী রুবাইয়াতউলইসলাম: বাজার মূলধন কত হওয়া উচিত তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে এখন আমাদের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের বাজার মূলধন প্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। বাজারে এখন যে স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোয় বাজার মূলধন অনেক বেশি বাড়বে। আসলে পুঁজিবাজার বলতে যা বোঝায় আমাদের দেশে এখনও তা হয়নি। এখানে বন্ডগুলো নিয়মিত লেনদেন হতে হবে। সব ট্রেজারি বন্ড লেনদেন হতে হবে। সব ধরনের মিউচুয়াল ফান্ডে লেনদেনযোগ্য হতে হবে। এসব শুরু হলে বাজারের সাইজ আরও বাড়বে। আর পুঁজিবাজার ভালো থাকলে শেয়ারদর বাড়বে, বাড়বে লেনদেনও। এতে বাজার মূলধন বাড়ার সম্ভব তৈরি হবে। বর্তমানে ধীরে ধীরে লেনদেন বাড়ছে। এভাবে দুই-তিন মাস থাকলে গড় লেনদেন দেড়-দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করি।

শেয়ার বিজ: দীর্ঘ ১০ বছর পর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে একটি বহুজাতিক কোম্পানি একটি কোম্পানির পর আরেকটি বহুজাতিক কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে এই লম্বা বিরতির কারণ কী হতে পারে

শিবলী রুবাইয়াতউলইসলাম: আসলে বহুজাতিক কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনার জন্য আমাদের একক প্রচেষ্টায় হবে না। এর জন্য এনবিআরের সাহায্য দরকার। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সহজে এবং অল্প খরচে বাইরের থেকে অর্থ পায়। তাদের টাকার দরকারও সেইভাবে নেই। সেজন্য তাদের পুঁজিবাজারে আনার জন্য সুযোগ-সুবিধা বেশি দিতে হবে। তাহলেই তারা পুঁজিবাজারমুখী হবে। এ ব্যাপারে বাজেটের আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে কথা বলব। যদি সফল হই তবে আরও বেশি বহুজাতিক কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসবে।

শেয়ার বিজ: ওটিসি মার্কেটে অনেক কোম্পানি রয়েছে, যেগুলোর লেনদেনও তেমন হয় না। অথচ এখানে বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি টাকা আটকে রয়েছে। এই মার্কেটের উন্নয়ন নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম: হ্যাঁ, এই মার্কেটে অনেক কোম্পানি রয়েছে। এই কোম্পানিগুলোর ধরন ভিন্ন ভিন্ন। এর মধ্যে কিছু কোম্পানির অবস্থা খুবই নাজুক। আবার কিছু কোম্পানি রয়েছে যারা আর্থিকভাবে ভালো করছে। এ কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। তাই এসব কোম্পানি যাতে দ্রুত মূল মার্কেটে লেনদেন করতে পারে, আমরা সেই ব্যবস্থা করব। এতে বিনিয়োগকারীরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। পাশাপাশি ওটিসি মার্কেটে কিছু কোম্পানি রয়েছে, যাদের অস্তিত্ব নেই। আমরা তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছি। আবার কিছু কোম্পনি রয়েছে যাদের একটু নার্সিং করা দরকার। নার্সিং করলে তারা হয়তো টিকে থাকবে। এসব কোম্পানি নিয়েও চিন্তা করছি আমরা। অর্থাৎ প্রতিটি কোম্পানি নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনাও ভিন্ন ভিন্ন। প্রতিটি কোম্পানির বর্তমান আর্থিক অবস্থা দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শেয়ার বিজ: বর্তমানে আইপিওর শেয়ারে প্রথম দুই দিন থেকেই সার্কিটব্রেকার বা মূল্যসীমা দেয়া থাকে, যে কারণে প্রথম দুই দিন শেয়ারের কাক্সিক্ষত দর বৃদ্ধি পায় না বিনিয়োগকারীরা চান এটা বাড়িয়ে তিন বা চার দিন করা হোক তাদের দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত?

শিবলী রুবাইয়াতউলইসলাম: একটি ১০ টাকা দরের শেয়ার প্রথম দিন ৫০ শতাংশ দর বাড়লে তা ১৫ টাকায় চলে যায়। পরের দিন একই হারে বাড়লে দর গিয়ে দাঁড়ায় ২২ টাকা ৫০ পয়সা। এই হারে যদি আরও দুই দিন বাড়ে তাহলে দর অনেক বেড়ে যাবে। চার দিনে ১০ টাকার শেয়ার হয়ে যাবে ৫০ টাকার বেশি। এতে প্রথম অবস্থায়ই অনেক শেয়ার অতিমূল্যায়িত হয়ে যাবে। যেহেতু শেয়ার অতিমূল্যায়িত রোধে প্রথম দুই দিন থেকে সার্কিট ব্রেকার দেয়া হয়েছে, সুতরাং সময় বাড়ানোর সুযোগ নেই। এখন যেটা আছে তা ঠিক আছে। এটা বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো।

শেয়ার বিজ: শোনা যাচ্ছে অচিরেই আইপিওর শেয়ারে লটারি প্রথা উঠে যাচ্ছে এর বদলে আনুপাতিক হারে শেয়ার দেয়া হবে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

শিবলী রুবাইয়াতউলইসলাম: আমি তাদের সঙ্গে একমত। আনুপাতিক হারে শেয়ার পেলে সব আবেদনকারীই উপকৃত হবেন। বাইরের দেশগুলোয় আইপিওর শেয়ারের অভাব নেই। সব কোম্পানিই আইপওতে চলে আসে। অনেক কোম্পানি আন্ডার সাবক্রাইব হয়। আমাদের দেশে তেমন নেই। সে কারণে সবার জন্য আইপিওর শেয়ার দেয়ার বিষয়টি ভালো সিদ্ধান্ত হবে।

শেয়ার বিজ: আপনি বিএসইসির চেয়ারমানের দায়িত্ব দেয়ার পর স্বল্প সময়ে সর্র্বোচ্চ সংখ্যক কোম্পানির আইপিওর অনুমোদন দিয়েছেন। এসব কোম্পানির অনুমোদনের বেলায় কোন বিষয়টিতে নজর দিচ্ছেন?

শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম: হ্যাঁ, আমরা অল্প সময়ে অনেক কোম্পানির আইপিওর অনুমোদন দিয়েছি। এই ক্ষেত্রে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী বা হিসাবের দিকে বেশি নজর রাখা হয়েছে। একটি কোম্পানির সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে আমরা অনুমোদন দিতে সময় ক্ষেপণ করছি না।

শেয়ার বিজ: সম্প্রতি বিএসইতে থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্রোকারেজ হাউসের বুথ খোলা যাবে সেখান থেকে বিনিয়োগকারীরা লেনদেন করার সুযোগ পাবেন আমাদের দেশে বিনিয়োগ শিক্ষাসম্পন্ন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কম সেক্ষেত্রে এখানে সফলতা কতটুকু দেখছেন?

শিবলী রুবাইয়াতউলইসলাম: ইউনিয়ন পর্য়ায়ে থেকে একজন বিনিয়োগকারী যাতে পুঁজিবাজারের সঙ্গে থাকতে পারেন, সেজন্যই এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে শর্ত দেয়া আছে। যারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে চান সবারই বিনিয়োগ শিক্ষা থাকতে হবে। কারণ জেনে-বুঝে না এলে পুঁজিবাজারে এসে তারা হোঁচট খেতে পারেন। সেজন্যই সবারই বিনিয়োগ শিক্ষা থাকাটা জরুরি। মূলত এ কারণেই শর্ত জুড়ে দেয়া। এটা করলে বিনিয়োগকারীরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি বিনিয়োগ শিক্ষাটাও সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে।

শেয়ার বিজ: বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্য কী বলবেন?

শিবলী রুবাইয়াতউলইসলাম: এখন পুঁজিবাজার অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। পুঁজিবাজার এখন বিনিয়োগের সর্বোচ্চ উৎকৃষ্ট জায়গা। আমরাও এর নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করছি। এখন পুঁজিবাজার মানি মার্কেট থেকে অনেক ভালো থেকে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে বিনিযোগকারীদের ভালো মানের কোম্পানির পাশাপাশি ভালো পোর্টফলিও ম্যানেজারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে হবে।

শেয়ার বিজ: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ

শিবলী রুবাইয়াতউলইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।


সর্বশেষ..