প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পুঁজিবাজার ২০১৬: হতাশায় শুরু স্বস্তিতে শেষ

 

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ ও নিয়াজ মাহমুদ: বিদায়ী বছরের শুরুর দিকে পুঁজিবাজারে মন্দাভাব বিরাজ করলেও শেষে এসে স্বস্তিতে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। বছর শেষে পুরোপুরি পাল্টে গেছে পুঁজিবাজার চিত্র। কারণ প্রত্যাশানুযায়ী বছরের প্রথম থেকেই বাজার একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। জুনে এসে আরও গতি পায়। এ সময় সূচক ও লেনদেন বাড়তে শুরু করে। বাড়তে থাকে বিদেশি বিনিয়োগও। বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকায় বাড়ে বাজার মূলধনও। সব মিলে বাজারে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে বলে মনে করছেন বাজার-সংশ্লিষ্টরা।

এ বছরের বাজারচিত্রে দেখা যায় লেনদেন আশানুরূপ বেড়েছে। বছরের আট কার্যদিবসে হাজার কোটি টাকার ঘরে লেনদেন হয়। ২৩ নভেম্বর সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৪৭৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে, ১০ জুলাই বছরের সর্বনিম্ন লেনদেন হয়েছে। এদিন ২০৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়। বছর শেষে এসে ৫০০ কোটি টাকা গড় লেনদেন ছাড়িয়ে যায়। আগের বছর যা ছিল ৪২২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে এ বছর চার হাজার ৬২৯ পয়েন্ট সূচক নিয়ে চলতি বছরের যাত্রা শুরু হয়। বছরের প্রথম কার্যদিবসেই প্রায় ছয় পয়েন্ট পতন দিয়ে শুরু হয়। এরপর কয়েক কার্যদিবসের উত্থানে ১৯ জানুয়ারি সূচক চার হাজার ৬৯৭ পয়েন্টে দাঁড়ায়। পুনরায় এ মূল্যসূচকে পৌঁছাতে অপেক্ষা করতে হয় ৪ অক্টোবর পর্যন্ত। এর মধ্যে ধারাবাহিক পতনে ২ মে চলতি বছরের মূল্যসূচক সর্বনিন্ম অবস্থানে চলে যায়। ওইদিন মূল্যসূচক ছিল চার হাজার ১৭১ পয়েন্টে। এরপর আবার ধারাবাহিক উত্থানে বছরের শুরুর সূচকে (চার হাজার ৬২৯ পয়েন্ট) পৌঁছায় ৪ অক্টোবর। এদিকে ৪ অক্টোবরের পর পুঁজিবাজারে কিছুটা নেতিবাচক অবস্থা দেখা যায়। যাতে কয়েক দিনের লেনদেনে প্রায় ১০০ পয়েন্ট কমে ৩১ অক্টোবর ৪৫৯২ পয়েন্ট দাঁড়ায়। এরপরই মূল্যসূচকের উত্থানে চমক দেখা যায়। ডিসেম্বরের শেষদিকে সূচক উঠে যায় পাঁচ হাজার পয়েন্টে। যা স্পর্শ করে প্রায় ২৫ মাসেরও বেশি সময় পর। বছরের শেষদিনে সূচক অবস্থান করে পাঁচ হাজার ৩৬ পয়েন্টে।

এদিকে চলতি বছরের প্রতি মাসেই বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৮৮টি কোম্পানিতে বিদেশিদের মোট বিনিয়োগ ছিল বাজারদরে ৯ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। বছর শেষে ১১৪ কোম্পানিতে বিদেশিদের মোট বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ বছর শেষে বিদেশিদের পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বেড়েছে ছয় হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা বা প্রায় ৭২ শতাংশ।

এ বছর বেড়েছে আশানুরূপ বাজার মূলধনও। প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল তিন লাখ ১৫ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। বছরের শেষ কার্যদিবসে যা দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪১ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বছর ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে বছর শেষে  বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ অ্যাকাউন্টে নিট বিনিয়োগ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ সময় বিদেশিরা কিনেছেন চার হাজার ৪৩৬ কোটি টাকার শেয়ার। বিক্রি করেছেন তিন হাজার ৪২১ কোটি টাকার। এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক সময়ের লেনদেনে বিদেশিদের অংশগ্রহণ প্রায় আট দশমিক ৩৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে চলতি বছর আটটি কোম্পানি এবং তিনটি মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ২০১৫ সালে কোনো রইট শেয়ার ইস্যু হয়নি। ২০১৬ সালে তিনটি কোম্পানি রাইট শেয়ার ছেড়ে মূলধন বৃদ্ধি করেছে। কেমন গেলো পুঁজিবাজার এমন প্রশ্নে ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী বলেন, বছরটি মূলত টেক-অফের বছর গেছে। বাজার স্থিতিশীলতার মধ্যে পার করেছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। পাশাপাশি দেশি বড় এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। এর প্রতিফলন দেখা গেছে লেনদেনে। বছরের শেষ মাসে গড় লেনদেন ৯০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এছাড়া বছরজুড়ে তারল্য সংকট ছিল না।

এক প্রশ্নে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘শেষ দুই সপ্তাহে বাজার নড়েচড়ে বসেছে। বছরজুড়ে বাজার শীতল ছিল। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে কিছু নতুন টাকা ঢুকেছে। সেটি ডে-ট্রেডিংয়ে ব্যবহার হয়েছে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে করপোরেট গভর্নেন্স গাইডলাইনের বাস্তবায়ন ও ভালো শেয়ারের জোগান দরকার।’

অন্যদিকে ২০১৬ সালে শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারেনি পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। বিচারিক মামলা না থাকায় প্রায় পুরো বছর ট্রাইব্যুনালের অলস সময় কেটেছে। তবে বছরের শেষদিকে একটি মামলা মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে স্থানান্তর হয়ে এসেছে ট্রাইব্যুনালে। মাত্র একটি মামলা নিয়েই বিচারকার্য চালিয়ে যাচ্ছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। যদিও এ সংশ্লিষ্ট ৫৩৫টি মামলা রয়েছে। তবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর হয়েছে মাত্র ২৫টি। এর মধ্যে ছয়টির রায় হয়েছে। বিচারিক ক্ষমতা না থাকায় দুটি মামলা মহানগর দায়রা জজ আদালতে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং ১৬টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে।

বাজারের এ ঘুরে দাঁড়ানোকে শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা, বিশেষত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কর্মকর্তারা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরার লক্ষণ হিসেবেই দেখছেন।

ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর দুই অ্যাসোসিয়েশন নেতারা বলেন, শেয়ারবাজারে মানুষের আস্থা ফিরেছে বলেই নতুন অর্থ নিয়ে বিনিয়োগে এসেছেন। এতে শেয়ার চাহিদার সঙ্গে বেড়েছে শেয়ারদর ও সূচক।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএএম মাজেদুর রহমান শেয়ার বিজকে  জানান, ‘শেয়ারবাজারে প্রতিদিন উন্নয়ন হচ্ছে। যা দেখে বিদেশিরা বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছেন। একইসঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।’