হাঙ্গেরির নির্বাচনে ভিক্টর অরবানের অভাবনীয় পরাজয় মস্কোর জন্য একটি চরম দুঃসংবাদ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদিও এই পরাজয় নিয়ে এখন পর্যন্ত রাশিয়া থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভ্লাদিমির পুতিন ইউরোপের ভেতরে তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং শক্তিশালী মিত্রকে হারালেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তাসের তত্ত্বের কথা বললে বলতে হয়, গত দেড় দশক ধরে ভিক্টর অরবান ছিলেন পুতিনের হাতের সবচেয়ে শক্তিশালী ট্রাম্প কার্ড। এর প্রধান কারণগুলো হলো হাঙ্গেরি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও অরবান ক্রমাগত রাশিয়ার পক্ষে এবং পুতিনের সমর্থনে কথা বলে আসছিলেন।
রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করে, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখনই রাশিয়ার ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চেয়েছে, অরবান বারবার তাতে বাধা সৃষ্টি করেছেন। এ ছাড়াও তিনি ইউক্রেনকে সামরিক বা আর্থিক সহায়তা প্রদানের কট্টর বিরোধী ছিলেন এবং ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্যপদ লাভের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। পুতিনের কাছে অরবান ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোকে ভেতর থেকে অস্থিতিশীল করার একটি মোক্ষম হাতিয়ার। অরবানের প্রস্থানে সেই কৌশলগত সুবিধা এখন ক্রেমলিনের হাতছাড়া হয়ে গেল।
তবে মস্কো এখনই হাল ছেড়ে দিচ্ছে না। হাঙ্গেরির ওপর এখনও রাশিয়ার কিছু প্রভাব রয়ে গেছে, যা পুতিন ব্যবহার করার চেষ্টা করবেন। অরবানের শাসনামলে হাঙ্গেরি রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই নির্ভরতা রাতারাতি কাটিয়ে ওঠা নতুন প্রধানমন্ত্রী পিটার ম্যাগিয়ারের জন্য সহজ হবে না।
ক্রেমলিন সম্ভবত নতুন প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে এবং জ্বালানি সরবরাহকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে হাঙ্গেরির রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
গত কয়েক মাস ধরে রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটি তত্ত্ব প্রচার করছেন। তাঁদের মতে, যদি ইউরোপের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় এবং জ্বালানি সংকট তীব্রতর হয়, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে অস্থিতিশীলতা অনিবার্য। মস্কো আশা করছে, জ্বালানি সরবরাহে টান দিয়ে তারা হাঙ্গেরি তথা পুরো ইউরোপকে চাপে রাখতে পারবে।
কিন্তু অরবানের মতো একজন সরাসরি মিত্রকে হারানো মানে হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারণী সভায় পুতিনের কোনো জোরালো সমর্থক আর রইল না। এখন হাঙ্গেরি যদি পিটার ম্যাগিয়ারের নেতৃত্বে পুরোপুরি প্রো ইউরোপীয় বা পশ্চিমা বলয়ে ফিরে যায়, তবে পুতিনের জন্য ইউরোপের ঐক্য ভাঙা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ভিক্টর অরবানের পতন পুতিনের জন্য একটি বড় কৌশলগত পরাজয়। যে নেতা এতদিন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর ভেতরে রাশিয়ার সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁর বিদায়ে রাশিয়া এখন ইউরোপীয় রাজনীতিতে আরও বেশি একা হয়ে পড়ল।
যদিও জ্বালানি কার্ড ব্যবহার করে পুতিন এখনও কিছুটা প্রভাব রাখার চেষ্টা করবেন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধুকে হারানো মস্কোর জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। স্টিভ রোজেনবার্গের মতে, অরবানের বিদায়ে পুতিন ইউরোপের দাবার বোর্ডে তাঁর সবচেয়ে বড় ঘুঁটিটি হারিয়েছেন। এখন হাঙ্গেরির নতুন সরকার ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন বাড়িয়ে রাশিয়ার ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি করবে, যা ক্রেমলিনের জন্য এক চরম দুঃস্বপ্ন। তথ্যসূত্র: বিবিসি।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post