প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পুরনো জাহাজের ক্রেতা পাচ্ছে না বিএসসি

সাইফুল আলম সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকাধীন লোকসানি জাহাজ ‘বাংলার শিখা’ স্ক্র্যাপ হিসেবে প্রথমবার নিলামে তোলা হয়েছিল গত ২৪ মে। কিন্তু কোনো ক্রেতা না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফায় নিলামে বিক্রির দিন নির্ধারণ করা হয় গত ১৯ জুন। দ্বিতীয় দফায়ও নিলামে কেউ অংশগ্রহণ করেনি। ফলে জাহাজটি বিক্রি করতে তৃতীয় দফায় আবারও নিলাম ডেকেছে সংস্থাটি।

বিএসসি সূত্রে জানা যায়, লোকসানি বাংলার শিখা জাহাজটি চীন থেকে ১৯৯১ সালে কেনা হয়েছিল। ২৫ বছর আন্তর্জাতিক রুটে বিভিন্ন সংস্থার আমদানি করা পণ্য পরিবহন করে জাহাজটি। ২০১৩ সালে এটি আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলের সক্ষমতা হারায়। ফলে সংস্থাটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পরীক্ষামূলকভাবে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম-মোংলা-চট্টগ্রাম রুটে ফিডার সার্ভিস চালু করা হয়। কিন্তু লোকসানের কারণে ৮ মার্চ ২০১৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়। সে থেকে আজ পর্যন্ত জাহাজটির বাণিজ্যিক কাজ বন্ধ আছে। এতে গত দুবছরে কোনো ধরনের পরিচালনগত আয় নেই। অপরদিকে প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। এ নিয়ে দুবছরে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকারও বেশি। এ লোকসান কমাতে জাহাজটি স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির জন্য কয়েক দফা নিলামে তোলে সংস্থাটি। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় দফার নিলামে কোনো আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উপস্থিত ছিল না। এ প্রেক্ষিতে স্ক্র্যাপ হিসেবে ‘বাংলার শিখা’কে তৃতীয় দফায় নিলামে বিক্রির জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৮ আগস্ট।

বিএসসি’র শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, বিএসসি’র মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে মাদার ট্যাংকার ও সেলুলার কন্টেইনারসহ ২৫ থেকে ৩০টি জাহাজ দরকার হলেও ২৬ বছরেও কোনো জাহাজ কেনা হয়নি। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে এমভি বাংলার শিখা নামে জাহাজটি কেনা হয়েছিল। ফলে বিএসসি বাহন প্রতি বছরই ছোট হতে থাকে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বহরে ১৩টি জাহাজ ছিল। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পাঁচটি জাহাজ নিলামে বিক্রির ফলে সংস্থার বহরে জাহাজের সংখ্যা দাঁড়ায় আটটিতে। এর পরের বছর আরও পাঁচটি জাহাজ বিক্রি করা হয়। ফলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিএসসি’র বহরে জাহাজের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র তিনটিতে। এর মধ্যে বাংলার শিখার গত দুবছর কোনো পরিচালনাগত আয় ছিল না এবং গড় বয়স ৩৬ বছর হওয়ায় পুরোপুরি সক্ষমতা হারায় বাংলার শিখা। এছাড়া বাংলার জ্যোতি ও সৌরভ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তেল পরিবহনে থাকলেও এগুলো যে কোনো মুহূর্তে অকেজো হলে বিএসসিতে কোনো জাহাজ থাকবে না। অপরদিকে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার। আর এ বাণিজ্যের প্রায় ৮২ শতাংশ হয় সমুদ্রপথে। এতে বছরে সমুদ্রে পণ্য পরিবহনে ব্যবসা হয় প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ সংকটের কারণে নামমাত্র বাজারে অংশীদারিত্ব আছে সরকারি সংস্থাটির। পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তারা ক্রমে পিছিয়ে যাচ্ছে এ খাত হতে মুনাফা অর্জনেও। ফলে পুরো টাকাই চলে যাচ্ছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে।

বিএসসি’র মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) আলমগীর শেয়ার বিজকে বলেন, বাংলার শিখা পরিচালনায় প্রতি মাসে ব্যয় হয় ৬০ লাখ টাকা। অথচ গত দুবছর কোনো ধরনের আয় ছিল না। তাই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে এটি নিলামে তোলা হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানের খরচ ও লোকসান উভয়ই কমবে। স্ক্র্যাব হিসেবে ১৫ কোটি টাকায় যে কেউই এটি কিনবে।

চট্টগ্রামের একাধিক স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিকারক বলেন, বিভিন্ন কারণে দেশের জাহাজ ভাঙা ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। পাশাপাশি জাহাজটির দাম তুলনামূলকভাবে বেশি মনে হচ্ছে। ফলে ক্রয়ে আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাচ্ছে না।

সংস্থাটির মুখপাত্র ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) নওয়াব আসলাম হাবীব শেয়ার বিজকে বলেন, জাহাজটি মান অনুসারে আন্তর্জাতিকভাবে স্ক্র্যাপমূল্য ১৫ কোটি টাকা। আর মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে নিলামে ১৫ কোটি টাকায় বিক্রি করা হবে। দুই দফা নিলামে বিক্রির আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করলেও কোনো আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেনি। ফলে তৃতীয়বার আবারও এটি নিলামে বিক্রির দরপত্র প্রচার করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছয় কোটি ৭২ লাখ টাকা মুনাফা করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। মুনাফার ওপর শেয়ারহোল্ডারদের ১২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ।