মত-বিশ্লেষণ

পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রয়োজন

পৃথিবীর সব সমাজে বিভিন্ন মাত্রায় নারীদের ওপর নির্যাতন হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব বিষয়ে বিতর্কও রয়েছে। কিন্তু এই নারীদের হাতে পুরুষও নির্যাতিত হয়। যদিও তার মাত্রা, ধরন ও পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন। পাষণ্ড-দুর্বৃত্ত স্বামীর হাতে স্ত্রীরা প্রহার, লাঞ্ছনা ও নিগ্রহের শিকার হয়; একইভাবে স্ত্রীর হাতে স্বামীরাও যে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, তার দৃষ্টান্তও কম নয়। এভাবে নির্যাতিত ও ভুক্তভোগী অনেক পুরুষ আমার পরিচিত।

এই সংকটটি বর্তমান বাংলাদেশে প্রকট রূপ লাভ করেছে। সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার পুরুষ আজ স্ত্রী ছাড়াও অন্য কোনো না কোনো নারী দ্বারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এসব নির্যাতনের ধরন-প্রকৃতিতেও রয়েছে ভিন্নতা। যেমন শারীরিক, মানসিক, দৈহিক, আর্থিক কিংবা সামাজিক। তাছাড়া ঘরে-বাইরে শাসন-শোষণের মতো নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। সাম্প্রতিককালে দেশের নানা প্রান্ত থেকে স্ত্রীর অত্যাচারে বেশ কিছু স্বামীর আত্মহত্যার খবর উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের তরুণ সম্ভাবনাময় ডাক্তার আকাশের আত্মহত্যা তারই উদাহরণ।

ইদানীং ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আকাশসংস্কৃতির প্রভাব, পারিবারিক বন্ধনের অভাব এবং নারীর ক্ষমতায়নের ফলে বেশিরভাগ নারী বিয়েকে ‘দাসত্ব’ মনে করছে। অনেক নারীই ভাইবোনসহ তৃতীয় পক্ষের উসকানিতে স্বামীর বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। অতিমাত্রায় আর্থিক চাহিদা থেকে স্বামীর ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। অতিরিক্ত যৌন চাহিদা, সামাজিক কর্মকাণ্ডের নামে ক্লাব-পার্টিতে যাতায়াত, গভীর রাতে বাসায় ফেরা, সিগারেট-ইয়াবার মতো মাদকে আসক্তি, একাধিক ছেলেবন্ধুর সঙ্গে ফোনালাপ, মেলামেশা ও পরকীয়া এবং সন্তানকে অবহেলা করার মতো বিচিত্র ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে নারীরা। এগুলো পুরুষের পারিবার ও সামাজজীবনকে বিষিয়ে তোলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লোকলজ্জার ভয়ে এবং সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে পুরুষেরা স্ত্রীর অনেক অন্যায় দাবি মেনে নিলেও সমাজে পুরুষ নির্যাতন কিন্তু কমেনি। বরং কথায় কথায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কিংবা যৌতুকের মামলায় জেল খাটানোর হুমকি দিয়ে স্ত্রীরা অন্যায় আবদার পূরণ করছে।

দু-চারটা পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ পেলেও লোকলজ্জার কারণে অসংখ্য-অগণিত ঘটনা চোখের আড়ালে রয়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে পুরুষরা একেবারে অসহায়। ফলে ক্রমাগত নারীদের অনৈতিক ও অসামাজিক অন্যায় আচরণ বেড়েই চলেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেনমোহরের বড় অঙ্কের দায়বদ্ধতায় পুরুষ কলহের মধ্যেও বিয়ে টিকিয়ে রাখছে, বিচ্ছেদ ঘটাতে পারছে না।

শত শত নির্যাতিত পুরুষ আইনজীবীদের কাছে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো সহায়তা পাচ্ছে না। নারী ও শিশু নির্যাতনে পাঁচটি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে, পুরুষদের জন্য একটিও নেই। আমাদের সংবিধানে নারীর অধিকারের কয়েকটি ধারাসহ বিভিন্ন আইন রয়েছে। এগুলো অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ নির্যাতনে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে পুরুষ জেল-জরিমানা ভোগ করছে। পরিবারে কর্তৃত্ববাদী পুরুষতন্ত্র হটিয়ে কর্তৃত্ববাদী নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কাম্য নয়। বরঞ্চ নারী ও পুরুষের সাম্য ও সমঝোতা জরুরি।

বিশ্বের অনেক দেশের মতো এরই মধ্যে ঢাকায় ‘পুরুষ রক্ষা আন্দোলন’-এর সূচনা করেছে ‘বাংলাদেশ মেন’স রাইটস ফাউন্ডেশন’। নারীবাদী ও বিভিন্ন আইনি সংগঠনসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোও প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু তেমন সুফল দেখা যাচ্ছে না। এখন আইন সংশোধনের দাবি উঠছে।

কিন্তু আইন সংশোধনে বাস্তবতা উপেক্ষা করা চলবে না। নারী নির্যাতনের পাশাপাশি পুরুষ নির্যাতন আইন প্রণয়ন জরুরি। এ জন্য সরকারকে আরও সচেষ্ট হতে হবে।

সংসারে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও মান-অভিমান থাকবে। কিন্তু অতিমাত্রায় স্বাধীনতা হরণ কাম্য নয়। একে অপরকে ছাড় দিতে হবে, যতটুকু সম্ভব দুজন মিলে সব বিষয় ভাগ করে নিতে হবে।

জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য হাজি সেলিমহ আরেক সংসদ সদস্য ‘পুরুষ নির্যাতন দমন আইন’ প্রণয়নের দাবি তুলেছেন। আসলে নারী বা পুরুষের জন্য আলাদা অধিকার নয়, চাই সমান অধিকার। সর্বত্র সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে নারীদের পাশাপাশি পুরুষের জন্য পৃথক বিশেষ আইন জরুরি।

নাজমুল হোসেন

প্রকৌশলী ও লেখক

[email protected]

০০০০০০০০০০

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..