পুস্তক পর্যালোচনা গতিময় অর্থনীতি: সমকালীন অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রতিবিম্ব

মাসুম বিল্লাহ: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলমের লেখা নিবন্ধ সমগ্র নিয়ে প্রকাশিত বই ‘গতিময় অর্থনীতি’। বইটিতে স্থান পেয়েছে সমকালীন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নানা বাকবদলের চিত্র। বইটিতে প্রকাশিত মোট নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও পুস্তক পর্যালোচনার সংখ্যা ৪৮টি। ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সময়ে এসব নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকার দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলোর একটি সমন্বিত রূপ ‘গতিময় অর্থনীতি’ শীর্ষক বইটি।
বইটির একেকটি নিবন্ধে একেক বিষয়ের ওপর দৃষ্টিপাত ও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এটির প্রথম নিবন্ধ ‘বাঙালি জাতির বিস্ময়কর উত্থানে বর্ণিল সুবর্ণজয়ন্তী’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি চাকার গতিময়তার বিষয়টি উঠে এসেছে। বাংলাদেশ কীভাবে একটি দারিদ্র্যক্লিষ্ট ভূখণ্ড থেকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে, তা চিত্রিত হয়েছে এ নিবন্ধে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনাসমূহ দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে কী ধরনের ভূমিকা রেখেছে, সে বিষয়টিও এখানে উঠে এসেছে। বইয়ের দ্বিতীয় নিবন্ধটিতে শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের বিষয়টি উঠে এসেছে। নিবন্ধটিতে লেখক বিভিন্ন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেছেন। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের উন্নতি সাধনে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন এবং প্রয়োজনীয় যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেসব বিষয়ে বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ভর করেই বাংলাদেশ আজ বর্তমানের উন্নয়ন সোপানে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে বলে নিবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপরের নিবন্ধটিতে উপমহাদেশে পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ইতিহাস পর্যালোচনার পাশাপাশি উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্নে বিভিন্ন পরিকল্পনার সফলতার দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। ‘পরিকল্পনা সফলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত’ শীর্ষক এ নিবন্ধে লেখক রাশিয়ায় ১৯২০ সালে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার গোড়াপত্তনের বিষয়টি উল্লেখ করার পাশাপাশি বিশ্বেও বিভিন্ন দেশে পরবর্তী সময়ে এ ধারা ছড়িয়ে পড়া ও সেসব দেশের উন্নয়ন সাধনে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অবদানের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে এ যাবত বাস্তবায়িত্ব ও বাস্তবায়নাধীন আটটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দারিদ্র্য বিমোচন ও অবকাঠামো উন্নয়নে কী ধরনের ভূমিকা রেখেছে, তা উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশে এ পর্যন্ত প্রণীত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০। এটি এটি শতবর্ষী পরিকল্পনা, যার বাস্তব রূপায়ণ নিশ্চিত হবে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মতো মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে। আর পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা যাতে বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে জন্য বদ্বীপ পরিকল্পনার নানা অভীষ্ট ও লক্ষ্য পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদ থেকে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা স্থান পেয়েছে ‘অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০-এর বাস্তবায়ন কৌশল’ শীর্ষক নিবন্ধে। কর্মসংস্থান বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। প্রতি বছর ২০ লাখের অধিক নতুন মুখ দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হয়। কিন্তু সেই সমসংখ্য কর্মসংস্থান প্রতি বছর সৃষ্টি হচ্ছে না। নিবন্ধটিতে কর্মসংস্থানের কৌশল বিষয়েও আলোকপাত করা হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়িত হচ্ছে। তা হলো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি)। বাংলাদেশ এ বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। তার অংশ হিসেবে দেশীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোয় এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাগুলো সন্নিবেশ করা হয়েছে। বিশেষ করে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে যাতে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাগুলোও অর্জিত হয়ে যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনাটিতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বইটির ‘এসডিজি অর্জনে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা’ শীর্ষক নিবন্ধে এ বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
একটি দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয়ের পরিমাণও বাড়তে থাকে। আমাদের দেশেও এর ব্যক্তিক্রম ঘটেনি। কার্যকর উপায়ে সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএসএস) প্রণীত হয়। এ কৌশল বাস্তবায়নের রূপরেখাও দাঁড় করানো হয়েছে। এতে মানুষের জীবনচক্রভিত্তিক প্রয়োজন অনুসারে কী উপায়ে তাকে সহায়তা দেয়া যায়, সে বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব বিষয় উঠে এসেছে গতিময় অর্থনীতি বইটির ‘সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়ন, পর্যালোচনা ও করণীয়’ শীষক নিবন্ধে।
কার্যকর উপায়ে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন নদীতে লাগসই বাঁধ নির্মাণ, কৃষিতে কার্যকর উপায়ে পানির ব্যবহার নিশ্চিত করা, সংশ্লিষ্ট নদী অববাহিকা এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন ইত্যাদি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে তিস্তা ব্যারেজ এক্ষেত্রে উপযুক্ত উদাহরণ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। এ বাঁধের কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শন করে অত্র এলাকার পানি ব্যবস্থাপনায় আরও কী ধরনের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া যায়, সে বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে বইটির ‘ছোট-বড় জলাধার নির্মাণই পানি সমস্যা সমাধানের অন্যতম উপায়’ শীর্ষক নিবন্ধে। নিবন্ধটিকে প্রাকৃতিক জলাশয়ের কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার উপায় সম্বলিত রূপরেখা বিধৃত হয়েছে।
আমাদের দেশে ভোগ্যপণ্যের বাজার ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। কখন কোন পরিপ্রেক্ষিতে একটি পণ্যের দাম গগনচুম্বী হয়ে পড়ে, তা ঠাহর করা যায় না। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল ২০১৯ সালে পেঁয়াজের দাম নিয়ে। হঠাৎ করেই মসলাজাতীয় পণ্যটির দাম এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, তা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল। কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে পণ্য বাজারের এমন লাগামহীনতা রোধ করা যায়, সে বিষয়ে বিধৃত হয়েছে ‘পেঁয়াজ বয়কট: বাজার সমস্যা বিশ্লেষণে আসল নায়ক অদৃশ্যই থেকে যায়’ শীর্ষক নিবন্ধে। এটিতে বাজারের বিভিন্ন অনুঘটকের ভূমিকা তুলে ধরার পাশাপাশি দেশের বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে এসব অনুঘটক কেমন ভূমিকা পালন করছে, তা তুলে ধরা হয়েছে।
গত বছরের মার্চে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। সংক্রমণ থেকে বাঁচতে দেশে নানা সময়ে ধাপে ধাপে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এতে করে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চাপের মুখে পড়ে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমও বিঘিœত হয়। এমন পরিস্থিতিতে কী ধরনের বাজেট দেশের জন্য উপযোগ্য হবে, সে বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে ‘দুঃসময়ের বাজেট একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক নিবন্ধে। একই সঙ্গে করোনাকালে মানুষের জীবন রক্ষার পাশাপাশি অর্থনীতিকেও কীভাবে গতিশীল রাখা যায়, সে বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে করোনায় মৃত্যু নয়, অর্থনীতিও ধ্বংস নয়’ শীর্ষক নিবন্ধে।
২০৪১ সাল নাগাদ উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে। এ লক্ষ্য প্রণয়ন করা হয়েছে রূপকল্প ২০৪১ শীর্ষক একটি ২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে বাংলাদেশকে কী ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে, সে বিষয়ে এ-সংক্রান্ত পরিকল্পনায় দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যা বইটির ‘রূপকল্প ২০৪১: উচ্চ আয়ের অর্থনীতি অভিমুখে আমাদের যাত্রা’ শীর্ষক নিবন্ধে।
সামগ্রিকভাবে বইটিতে প্রকাশিত নিবন্ধগুলোতে দেশের সমকালীন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। সরকার কোন লক্ষ্যের দিকে দেশকে ধাবিত করতে চাই, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বইটিতে প্রকাশিত নিবন্ধগুলোর মাধ্যমে। পরিকল্পনামাফিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করার বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য পাওয়া যাবে এখানে। আমি বইটির বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করি।
বই: গতিময় অর্থনীতি
লেখক: ড. শামসুল আলম
প্রকাশনী: আলোঘর প্রকাশনা
প্রচ্ছদ: শতাব্দী জাহিদ
প্রকাশকাল: আগস্ট, ২০২১
মূল্য: ৮৫০ টাকা।

সর্বশেষ..