সুশিক্ষা

কৃষি ও কৃষকের বঙ্গবন্ধু

পুস্তক সমালোচনা

গত ১০ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য অধ্যাপক ড. শামসুল আলম রচিত বই ‘কৃষি ও কৃষকের বঙ্গবন্ধু’। চলতি বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপিত হচ্ছে। বছরটির নামকরণ করা হয়েছে ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে। এ উদ্যাপনের ক্ষণগণনা যেদিন শুরু হয়েছে, সেদিনই বইটি প্রকাশ পেয়েছে। কাজেই এটি মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম বই। বইটিতে লেখক মূলত কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে এনেছেন, যদিও এর কিছু বিষয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য লেখকের বইতে পাওয়া যাবে। তবে সেসব রচনার সঙ্গে এ বইটির পার্থক্য হলো কৃষি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর যত উদ্যোগ ছিল, তার সিংহভাগই অত্যন্ত তথ্যবহুলভাবে বইটিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বইটি মূলত প্রবন্ধ-ধাঁচে লেখা। ফলে এখানে অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য ও উপাত্তের সমাবেশ ঘটেছে। একই সঙ্গে তত্ত্বের চেয়ে তথ্যই বইটিতে প্রধান উপজীব্য হিসেবে ধরা দিয়েছে। গ্রন্থটির ৯টি প্রবন্ধের মধ্যে সাতটিতেই মুক্তিযুদ্ধের পর মাত্র সাড়ে তিন বছরে কৃষির উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু যেসব অভাবনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেগুলো বর্ণিত হয়েছে। আর দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে বর্ণনা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বকালে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কিছু কর্মকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ এবং প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হিসেবে তাঁর কৃষকদের জন্য ভূমিকা রাখার প্রয়াস। আর নবম প্রবন্ধটিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

দেশ স্বাধীনের পর দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি, কিন্তু তখনও খাদ্যঘাটতি ছিল প্রকট। সনাতন চাষাবাদ ব্যবস্থা চালু থাকায় কৃষক যে ফসল উৎপাদন করতে পারত, তা ছিল জমির সক্ষমতার তুলনায় অপ্রতুল। আর বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা সাড়ে ১৬ কোটিরও ওপরে; তার পরও বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এমনকি চাল রপ্তানির সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। মূলত কৃষির আধুনিকায়নের ফলে এটি সম্ভব হয়েছে। আর এ আধুনিকায়নের সূত্রপাত যে বঙ্গবন্ধুর হাত দিয়ে শুরু হয়েছিল, সে বিষয়টিই বর্ণিত হয়েছে বইটির ‘আজকের কৃষির যে ভিত্তি’ শীর্ষক প্রবন্ধে।

বইটি থেকে জানা যাবে, স্বাধীনতাপূর্বকালে পূর্ব পাকিস্তানের কৃষকদের নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর তেমন নজর ছিল না বললেই চলে। কৃষির প্রতি তখনকার শাসকদের উদাসীনতা বঙ্গবন্ধুকে ভীষণভাবে পীড়িত করেছে। সেই অনুধাবন থেকেই তিনি স্বাধীনতার পর ভূমির বণ্টন ব্যবস্থায় হাত দিয়েছিলেন। ভূমিসংস্কারের অংশ হিসেবে ১০০ বিঘার বেশি ভূমির মালিক বা পরিবারের কাছ থেকে শত বিঘার অতিরিক্ত জমি রাষ্ট্রের হাতে ন্যস্ত করে তা দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বিতরণের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তবে সমবায়ভিত্তিক কৃষিব্যবস্থা এর আওতার বাইরে রেখেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, দরিদ্র কৃষকরা যাতে খাজনা পরিশোধের চাপে পিষ্ট না হন, সেজন্য বঙ্গবন্ধু ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান আমলে কৃষকদের যত ভূমি-খাজনা বকেয়া ছিল, স্বাধীনতার পর তার পুরোটাই মওকুফ করেন বঙ্গবন্ধু।

স্বাধীনতার পর জনগণের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া যে কতটা কঠিন কাজ ছিল, তার অত্যন্ত তথ্যবহুল বর্ণনা উত্থাপন করেছেন লেখক ড. শামসুল আলম। সে সময় কলের লাঙল ছিল না বললেই চলে, হালের বলদই ছিল চাষাবাদের প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু যুদ্ধের সময় অধিকাংশ কৃষক ঘরছাড়া হতে বাধ্য হয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হালের বলদ আর পাওয়া যায়নি। ফলে কৃষক জমি চাষ করতে পারছিলেন না। এমন পরিস্থিতিতে দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে এক লাখ হালের বলদ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ৫০ হাজার গাভীও বিতরণ করা হয়। একই সঙ্গে সে সময়েই উদ্যোগ নেওয়া হয় বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা প্রচলনের।

বইটি থেকেই জানা যাবে, কৃষিতে নতুন নতুন জাত উপহার দেওয়া বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বা বিনা বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই যাত্রা করে। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) বঙ্গবন্ধুরই অবদান। কৃষির আধুনিকায়নে গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর অধিক জোর দিতেন বঙ্গবন্ধু। এমনকি স্বাধীনতার পর প্রথম অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন খাতে যে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেছিল, তার ১০০ কোটি দেওয়া হয়েছিল কৃষিতে। আর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষি ও গবেষণা খাতে ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এটা ওই সময়ের জন্য অনেক বড় বরাদ্দ নিঃসন্দেহে।

বইটি পড়লেই জানা যাবে, যুদ্ধের সময় ঘরহারা মানুষদের পুনর্বাসনে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন উদ্যোগের কথা। যুদ্ধের সময় প্রায় ৪৩ লাখ পরিবার ঘরহারা হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তাদের ২২ লাখ পরিবারকেই পুনর্বাসন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। যুদ্ধের সময় যেহেতু দেশে খাদ্য উৎপাদন হয়নি, তাই অনাহারে ৫০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ধারণা করেছিল; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সরকারের দূরদর্শিতায় সে রকম ঘটনা ঘটেনি।

এছাড়া বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে কৃষি উৎপাদন কীভাবে বাড়তে শুরু করে, তার কংক্রিট পরিসংখ্যান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে ‘কৃষি ও কৃষকের বঙ্গবন্ধু’ থেকে। বঙ্গবন্ধু উচ্চশিক্ষিত মানুষদের সব সময় কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মেশার পরামর্শ দিতেন, যার প্রতিফলন পাওয়া যায় ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার প্রদত্ত একটি ভাষণে। তিনি কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের কৃষকদের সঙ্গে মিশে বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এমনকি কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের মর্যাদা বৃদ্ধির দাবি তিনি মেনে নিয়েছিলেন। সেই গ্র্যাজুয়েটদের হাত ধরেই দেশের কৃষি আজকের এই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এসব ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা প্রাঞ্জলভাবে গ্রন্থটিতে বিধৃত হয়েছে।

বইটি তথ্য ও পরিসংখ্যাননির্ভর হওয়ায় তা অন্যান্য গবেষণার ক্ষেত্রে কাজে লাগবে বলে আমার ধারণা। অল্প বর্ণনায় এত বেশি তথ্য-উপাত্ত খুব কম বইয়েই পাওয়া যাবে। পুস্তকটির বহুল প্রচার কামনা করছি।

  মাসুম বিল্লাহ

বই   : কৃষি ও কৃষকের বঙ্গবন্ধু

লেখক      : ড. শামসুল আলম

প্রকাশনী   : পার্ল পাবলিকেশন্স

প্রচ্ছদ       : বিডি ৭১

প্রকাশকাল       : ১০ জানুয়ারি, ২০২০

দাম  : ২০০ টাকা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..