প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি সিইটিপি, দূষণ বাড়ছে ধলেশ্বরীতে

নাজমুল হুসাইন: চামড়া শিল্পনগরীর প্রধান বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র (সিইটিপি) চালু থাকলেও ট্যানারি বর্জ্যে পরিবেশ দূষণ বন্ধ হয়নি। সেখানকার রাস্তাঘাটসহ নিম্নাঞ্চলে ট্যানারিগুলোর দূষিত পানি জমে থইথই করছে। এ ছাড়া রাসায়নিক মিশ্রিত এসব বর্জ্যের পানিতে সবচেয়ে বেশি হুমকির মধ্যে পড়েছে ধলেশ্বরী নদী। যদিও বুড়িগঙ্গা নদী বাঁচাতেই এ শিল্পনগরী হাজারীবাগ থেকে সরিয়ে সাভারে নেওয়া হয়েছে।

সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরী সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এখনও ট্যানারিগুলো থেকে সিইটিপি পর্যন্ত মেইন বর্জ্যের লাইন বসানোর কাজ শেষ হয়নি। ফলে অনেক ট্যানারির পাশে জমে আছে বিষাক্ত পানি। যা বৃষ্টিতে ধুয়ে সাধারণ ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে পড়ছে।

এদিকে সিইটিপি এখনও সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি। ফলে এখন যে পরিমাণে বর্জ্য পরিশোধন হচ্ছে, তাও সঠিকভাবে হচ্ছে না। পরিবেশ অধিদফতর এ পর্যন্ত দুই দফায় পরীক্ষা করে সিইটিপির পানিও দূষিত বলে রিপোর্ট দিয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে সিইটিপির ৮০ শতাংশ কাজ শেষে দুটি মডিউল পুরোদমে চালু করা হয়েছে। তবে ডাম্পিং ইয়ার্ডসহ কিছু কাজ এখনও চলছে। সেগুলো শেষ হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিইটিপির অনেক যন্ত্রাংশ এখনও বন্দরে আটকা পড়ে আছে। কবে নাগাদ এসব যন্ত্রাংশ পৌঁছবে, তা কেউ বলতে পারছেন না। যন্ত্রাংশগুলো সংযোজিত না হওয়া পর্যন্ত সিইটিপি পুরোপুরি চালু করা যাচ্ছে না। তাই কারখানার পানি নদীতে ফেলতে হচ্ছে। যা সম্পূর্ণ বিষমুক্ত নয়।

সিইটিপি এলাকা ঘুরে ও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিইটিপিগুলো সাময়িকভাবে চালু। এখনও সেখানে কাজ করছে নির্মাণকারী চীনের কোম্পানির জিনসু লিংঝি এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন কোম্পানি। কিন্তু তাদের কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টদের অখুশির কারণে নির্মাণকাজ সম্পর্কে তারা কাউকে কোনো তথ্য দেয় না। এমনকি সেখানে ঢুকতেও দেওয়া হয় না কাউকে। কাজও সেভাবে এগোচ্ছে না তাদের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে।

মুঠোফোনে জানতে চাইলে সাভার চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মাঈনুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শিল্প এলাকায় স্থাপিত দেড়শ কারখানার বর্জ্য শোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন একমাত্র শোধনাগার হিসেবেই সেটি তৈরি হচ্ছে। শোধনাগারের বাকি কাজ শেষ হলে সবকিছু ঠিকঠাক চলবে। নদীতে কিছু পানি সেটা এমন কিছু নয়। সেটাও ঠিক হয়ে যাবে।’

এদিকে স্থানীয় কিছু মানুষ অভিযোগ করেন, ট্যানারি থেকে সিইটিপিতে আসা প্রধান বর্জ্যের লাইন এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে রাতের বেলায় সিইটিপি বন্ধ করে সরাসরি বর্জ্য ও রাসায়নিক মিশ্রিত বিষাক্ত পানি ধলেশ্বরী নদীতে ছাড়া হয়। যা দিনের বেলায় আবার বন্ধ থাকে।

নদীর পার্শ্বে সিইটিপি থেকে বেরিয়ে আসা ড্রেন ও বড় পাইপগুলো নদীর বেশ কয়েক ফুট ভেতরে গিয়ে মিলেছে। সেখান থেকে যে পানি বের হচ্ছে সেসব পানি দেখে সঠিকভাবে পরিশোধিত বলে মনে হয় না।

এলাকার ইউনুছ আলী নামের এক জেলে বলেন, ‘রাতে আরও কালো পানি ছাড়ে। দিনেও এমন গরম পানি আসে। ময়লা পানিও আসে। এতে এ নদী দূষিত হচ্ছে। মাছ মরে যায়। এ এলাকার আশেপাশে আগের মতো মাছ মেলে না।’

পরিবেশবাদীরা বলছেন, সাভারের হেমায়েতপুরের পরিকল্পিত ওই চামড়া শিল্পনগরী নিয়ে অনেক বছর ধরে আলোচনা হয়েছে। এরপরও সেখানে দূষণ হওয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর গাফিলতিকে দায়ী করছেন পরিবেশবাদীরা। নিয়ম না মেনে সিইটিপি চালু করায় ট্যানারিগুলোর বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে বলে। প্রথম দফার পরীক্ষার পর সিইটিপি নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা চীনা ওই কোম্পানিকে শিল্প মন্ত্রণালয় ৫০ লাখ টাকা জরিমানাও করে। কিন্তু জরিমানার পরও পানি দূষণের মাত্রা আরও বেড়েছে বলে পরিবেশ অধিদফতরের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

পরিবেশ অধিদফতরের দ্বিতীয় দফায় পরীক্ষায় পানিতে মানব ও প্রাণিদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক উপাদান ক্রোমিয়ামের পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে আড়াইগুণ বেশি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পানির তাপমাত্রা থেকে শুরু করে দ্রবীভূত অক্সিজেন, ক্ষার, বিদ্যুৎ পরিবহন, ক্রোমিয়ামের পরিমাণ, লবণের পরিমাণ, রাসায়নিক উপাদান, জৈব রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে অক্সিজেন ছাড়া বাকি সাতটি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। আর অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।