মত-বিশ্লেষণ

পেঁয়াজের ঝাঁজ মেটাতে চাই দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা

কাজী সালমা সুলতানা: তেল নিয়ে তেলেসমাতির কথা অনেক শোনা হয়েছে। পেঁয়াজ নিয়ে তেলেসমাতি? না, এটা তো প্রচলিত কথা হিসেবেও মানায় না। কিন্তু তারপরও অল্প সময়ের ব্যবধানেই দুবার এই তেলেসমাতি কাণ্ড দেখতে হলো ভোক্তাদের। সেদিন এক সাংবাদিক ফেসবুকে পেঁয়াজ নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, বাজারে গিয়ে দোকানদারকে পেঁয়াজের দাম জিজ্ঞেস করেছেন। উচ্চমূল্য দেখে সাংবাদিক দোকানদারকে বললেন, আগামীকাল প্রতি কেজি ৩৫ টাকা দিয়ে কিনব। দোকানদার জানতে চাইলেন কোথা থেকে। সাংবাদিক জানালেন, এই বাজার থেকে। ২৫ হাজার টন আমদানি করা পেঁয়াজ খালাস হচ্ছে। জবাবে দোকানদার বললেন, ২৫ লাখ টন আমদানি হলেও লাভ নেই। আমরা দাম না কমালে কমবে না। সাংবাদিক কোনো হিসাব মেলাতে পারলেন না।

আসলে পেঁয়াজের সমস্যাটা কোথায়? দেশে উৎপাদন কম? আন্তর্জাতিক উৎপাদন কম? আন্তর্জাতিক সরবরাহ কম? নাকি ব্যবসায়ীদের কারসাজি? আর দোকানদারই বা এমন কথা বলবেন কেন? প্রতিদিন আমার অফিস থেকে বের হতে রাত ৯টা বেজে যায়। কারওয়ানবাজার বাণিজ্যিক এলাকায় অফিস। ঢাকার প্রধান কাঁচাবাজার এখানেই। অফিস থেকে বের হয়ে ঢাকার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। পেঁয়াজ নিয়ে এই তেলেসমাতি কাণ্ডের পর থেকে একজন ভোক্তা হিসেবে বা সংবাদকর্মী হিসেবে একটু নজর থাকে মানুষের হাতের ব্যাগের প্রতি। একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, বাজারে আসা ক্রেতাদের মধ্যে অধিকাংশের হাতেই পেঁয়াজের ব্যাগ। দু-একজনকে জিজ্ঞেস করেও জেনেছি, তাদের হাতের ব্যাগে পেঁয়াজ। কোনো ব্যাগের ওজনই ১০ কেজির নিচে মনে হয় না। ভারত থেকে পেঁয়াজ আসা বন্ধ হওয়ার খবর শুনেই দৈনিক বা সাপ্তাহিক চাহিদার অতিরিক্ত পেঁয়াজ কিনে স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা ক্রেতাদের। যদি দাম আরও বেড়ে যায়! ভারত তো রপ্তানি বন্ধ করেছে হঠাৎ করেই, কিন্তু বাজারের পেঁয়াজ তো আমদানি হয়েছে স্বাভাবিক সময়ে। তাহলে ৩০-৩৫ টাকার পেঁয়াজ কেন ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হবে? সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়, এটা অর্থনীতির সাধারণ সূত্র। কিন্তু সেই দাম বৃদ্ধির হার কত? আর চাহিদা হঠাৎ করে বৃদ্ধিই বা হলো কীভাবেÑআরও দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় ভোক্তাদের অধিক কেনার কারণে? এতসব প্রশ্নে উত্তর জানা নেই, তবে বাজার ব্যবস্থাপনায় যে প্রচণ্ড দুর্বলতা রয়েছে, এতে কোনো ভুল নেই।

আমদানিনির্ভর যেকোনো পণ্য আমদানিতে সামান্য সমস্যা দেখা দিলেই আমাদের দেশে পণ্যের মূল্য লাফাতে লাফাতে বেড়ে যায়। এ সময়ে ভোক্তারাও অবিবেচকের মতো পণ্য কিনে চাহিদা বাড়িয়ে ফেলেন। করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুতে হঠাৎ করে গণহারে মাস্ক, স্যানিটাইজার ও অন্যান্য জীবাণুনাশক কেনার হিড়িক পড়ে গেল। সেইসঙ্গে লকডাউনের কথা শুনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও কেনা অব্যাহত থাকল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো ঘর থেকে মাসের পর মাস বের হওয়া যাবে না এবং এসব পণ্যও আর পাওয়া যাবে না। ফল হিসেবে দাঁড়াল, ৫০ টাকার মাস্ক ৩০০ টাকা। স্যানিটাইজার ও অ্যান্টিসেপটিক লোশন বাজারে নেই। ১০ টাকার প্লাস্টিকের স্প্রে ৫০ টাকা। সবকিছুর মূল্য চড়া। স্বাভাবিক অবস্থায়ই যেখানে বাজার ব্যবস্থাপনা নেই, তখন করোনা-আতঙ্কে মানুষকে আটকায় কে? মাঝে মাঝেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আর মানুষ হুমড়ি খেয়ে চড়া দামে পণ্য কেনে। লাভবান হয় মুনাফাখোর মজুতদার আর দোকানদার। আর যন্ত্রণা সইতে হয় মধ্যবিত্ত, নি¤œমধ্যবিত্ত আর নি¤œআয়ের মানুষদের। সরবরাহ পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতায় অতিরিক্ত মজুত করার বাতিকগ্রস্ত মানুষেরাও বাজারের এই পরিস্থিতির জন্য কম দায়ী নয়।

আমাদের চাহিদার অধিকাংশই পূরণ হয় দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ থেকে। যেটুকু আমদানি করতে হয়, তার আবার অধিকাংশ আসে ভারত থেকে। বন্ধু রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও কোনো ঘোষণা ছাড়াই ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এর আগেও ভারত  এমন কাণ্ড করেছে। মজার বিষয় হলো, ঠিক সেদিনই বাংলাদেশ ১২ টন ইলিশ ভারতে পাঠিয়েছে। এ নিয়ে দুষ্টজনেরা বলছে, ইলিশ রান্নার জন্যই ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে। চমৎকার বাণিজ্য সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা দুটি বন্ধু রাষ্ট্রের মধ্যে পূর্বঘোষণা ছাড়া পণ্য রপ্তানি বন্ধ করা আন্তঃরাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারে পড়ে কি না,  কে জানে। তবে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে এমন কাণ্ড কোনোভাইে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে মজার বিষয় হলো হঠাৎ রপ্তানি কেন বন্ধ হলো, সে বিষয়ে ভারত সরকারের কোনো বক্তব্য না থাকলেও আমাদের নীতিনির্ধারকরা ভারতের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, এ বছর সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করা হবে। ভারতেও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে থাকলে পূর্বঘোষণা ছাড়াই তাদের পেঁয়াজ পাঠানো বন্ধ করা ঠিক কি না, এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী কিছু বলেননি।

আকস্মিকভাবে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়া ভোক্তাদের ওপর পড়েছে বাড়তি চাপ। আর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সামজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তার কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলোÑআজিজুর রহমান লিখেছেন, ‘পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার বিকল্প নেই।’ বাপ্পাদিত্য বসু লিখেছেন, ‘পেঁয়াজ ছাড়াই ই?লি?শের স্বাদ বে?শি।’ এম কবিরুল ইসলাম আকাশ লিখেছেন, ‘অমুকে পেঁয়াজ দিল না, তমুকে পেঁয়াজ দিল না, রসুন দিল না বলে চিল্লাফাল্লা না করে আমাদের ভূমি থাকার পরও আমরা নিজেরা কেন উৎপাদন করতে পারি না, সেটার জবাব দিন! অফ দ্য টপিক! কৃষিপ্রধান দেশে কেন কৃষিজাত পণ্য আমদানি করতে হয়?’ হাসান তারেক চৌধুরী লিখেছেন, ‘পেঁয়াজ সংকট! ভারতীয় পেঁয়াজ আসা বন্ধ। নিজেদের উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।’ সাবিনা ইয়াসমিন মাধবী লিখেছেন, ‘পেঁয়াজ ছাড়া দুই মাস তরকারি রান্না করেছি। যদি আমার দেশে পেঁয়াজের সংকট দেখা দেয়, আবারও পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করব। কিনে কেউ বস্তায় মজুদ করবেন না প্লিজ।’ হারুন খান লিখেছেন, ‘তিন মাসের পেঁয়াজ মজুত থাকার পরও যারা সিন্ডিকেট করে জনগণের পকেট কেটেছে, তাদের বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা নিন।’ সাংবাদিক নজরুল কবির লিখেছেন, ‘একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি… ইলিশ গেল, আর পেঁয়াজ আসা বন্ধ হলো!’ আলী আকবর টাবি লিখেছেন, ‘বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে ভারতে পেঁয়াজ উৎপাদন কম হওয়ায় ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে হৈচৈয়ের কিছু নেই। বরং সংকটাপন্ন মুহূর্তে কীভাবে দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়, ভারতের কাছ থেকে সে শিক্ষা আমরা নিতে পারি।’ ফজলে রাব্বী চৌধূরী লিখেছেন, ‘পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও লবণ নিয়ে লেখার ইচ্ছাই ছিল না আমার। তবুও লিখলাম। ভারত ইলিশ নিয়ে পেঁয়াজ বন্ধ করায় অনেকেই আঘাত পেয়েছেন। আমিও পেয়েছি। তার চেয়েও বড় আঘাত পেয়েছি, আমাদের সোনার দেশের কিছু কুলাঙ্গার মুনাফাখোরের কাণ্ড দেখে, যারা পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার কথা শুনেই পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি করেছে দুই-তিনগুণ। আর তা দেখে আমাদেরও শুরু হয়েছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পেঁয়াজ কেনার ধুম। মজুতকৃত পেঁয়াজ তো আগের দামেই কেনা, তাহলে সেই মজুতকৃত পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির কারণ কী? কারণ আমরা সুযোগসন্ধানী। সুযোগ পেলেই হয়ে যাই ভয়ংকর। অন্যের সন্তানের চুরির বিচার না করে নিজের সন্তানের ডাকাতির বিচার করা উচিত সর্বাগ্রে। তাহলেই দেশ ও জাতির উপকার হবে। আসুন, দেশীয় মুনাফাখোর, কালোবাজারকারী ও অসৎ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই সবাই।’

গত বছর এই সময়ে আমরা ভারতে ইলিশ রপ্তানি করি। এই সময়েই ভারত আমাদের দেশে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বসে। সেসময় বেসরকারি আমদানিকারকদের পাশাপাশি নিজেরাও পেঁয়াজ আমদানি করে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে সরকার। কিন্তু তারপরও পেঁয়াজের দাম ৩০ টাকা থেকে ৩০০ টাকায় উঠে যাওয়া বন্ধ করা যায়নি। পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে যে সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তাদের তেমন কোনো শাস্তি হয়নি। এ বছর বন্যাজনিত কারণে দেশের কৃষিযোগ্য অনেক জমিতেই চাষাবাদ বন্ধ হয়েছে। সেইসঙ্গে মহামারি করোনার কারণে দেশের মানুষের আয় কমেছে, কিন্তু খাবারের ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অজুহাতের শেষ নেই। এরই মধ্যে পাঁচ দিন ট্রাকে লোড হয়ে আটকে থাকার পর ১১টি ট্রাকে ২৪৬ টন পেঁয়াজ রপ্তানি করে ভারত। এসব পেঁয়াজের অধিকাংশই পচে গেছে। ট্রাকে বোঝাই থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত গরমে নষ্ট হয়ে গেছে প্রায় ৫০ লাখ টাকার পেঁয়াজ। এই পচা  পেঁয়াজ নিয়ে শুরু হয়েছে আরেক বিড়ম্বনা।

দেশের কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৮ লাখ টন। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের একটি অংশ সংরক্ষণকালে নষ্ট হয়। ফলে আট লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়, যার বেশির ভাগই আসে ভারত থেকে। গত বছর পেঁয়াজ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সুরক্ষা দিলে আমাদের কৃষকেরাই দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারেন। যদিও দেশে উৎপাদনযোগ্য জমির পরিমাণ কমে আসছে, তা সত্ত্বেও পেঁয়াজ আবাদে জমির পরিমাণও বেড়েছে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর। এতে পেঁয়াজের উৎপাদন আগের চেয়ে বাড়ছে।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় প্রবেশ করেছে। বিশ্বে গড় উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ১৮ টন। বাংলাদেশে ফলছে গড়ে ১১ টন করে। চার বছরে হেক্টরপ্রতি ফলন আগের চেয়ে তিন টন বেড়েছে। এভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে কয়েক বছরের মধ্যে দেশ পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বলে আশা করা যায়। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমাদের পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বীজ উন্নয়নের জন্য গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে দেশে গত মৌসুমে প্রায় সাড়ে ২৫ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। এ উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার টন বেশি। পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়িয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যয্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যেও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধ করা সম্ভব। সেদিকেও বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। তাহলে পেঁয়াজ নিয়ে তেলেসমাতি বন্ধ হবে, বন্ধ হবে মুনাফাখোর ও আদমানিকারকদের দৌরাত্ম্য।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..