মত-বিশ্লেষণ

পেঁয়াজের দামে ডাবল সেঞ্চুরি, প্রশাসনের নীরবতায় ভোক্তাদের দুর্ভোগ

এসএম নাজের হোসাইন: সম্প্রতি ভারতে পেঁয়াজের রফতানি বন্ধ করে দেওয়া ও মূল্য বাড়ানোর সংবাদে দেশে পেঁয়াজের মূল্য হঠাৎ করে দফায় দফায় বাড়লেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও জেলা প্রশাসন কোনো ধরনের উদ্যোগ না নিয়ে নীরব থাকায় জনমনে ক্ষোভ ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি পেঁয়াজ নিয়ে এক আলোচনায় খাবারে পেঁয়াজের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধিসহ নানা অজুহাতে ব্যবসায়ীরা বারবার তাৎক্ষণিকভাবে দাম বাড়ালেও বিদেশে দাম কমলে তার প্রতিফলন দেশে হয় নাÑতখন উল্টো সুর ‘বেশি দামে কেনা, লোকসান দিয়ে বিক্রি করব নাকি’ এসব কথা শুনে থাকি! যে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে এর আগে ওই খাতের ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে করণীয় বিষয়ে পরামর্শ সভা করে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করা, বাজার তদারকি জোরদার করে মজুতদারি ঠেকানো এবং টিসিবিকে দিয়ে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিয়ে অস্থিরতা দূরীকরণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ নেওয়ার উদাহরণ থাকলেও ইদানীং ব্যবসায়ীদের ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা দিবাস্বপ্নে বিভোর রয়েছেন। এ অবস্থায় ত্রাণকর্তা হিসেবে একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া জনগণের আর কোনো উপায় থাকছে না। এর আগেও ব্যবসায়ীরা বাজেটে শুল্ক আরোপসহ নানা অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়েছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে সরকার বেশ কিছু পণ্যের বিষয়ে শুল্কছাড় দিলেও বাজারে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে বাজারে সবরকম নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এ অবস্থায় জরুরিভাবে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জেলা-উপজেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদফতরসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধি, ক্যাব, গণমাধ্যম ও চেম্বার প্রতিনিধির সমন্বয়ে বাজার তদারকি জোরদার, জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জরুরি সভা করে সম্ভাব্য করণীয় নির্ধারণ, বিকল্প উৎস থেকে এসব পণ্য আমদানি নিশ্চিত করা এবং বিকল্প বাজার হিসেবে টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি জোরদার করার দাবি জানিয়েছে দেশের ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থসংরক্ষণকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ (ক্যাব) বিভিন্ন সামাজিক, পেশাজীবী, রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠন।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের অজুহাতে ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম প্রতি কেজি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। ভারতে রফতানি বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় বাজারে দাম বাড়ানো হয়েছে। অথচ ভারতে দাম কমলে ভোক্তারা তার সুফল পায় না। পাইকারি ব্যবসায়ীদের অজুহাতÑভারতে পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্যে বন্যা হওয়ায় পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। তবে খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, আমদানি কম হওয়ার সুযোগ নিয়ে হিলি বন্দরের পাইকাররা কারসাজি করে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ অবস্থায় যখনই কোনো পণ্যের সংকট তৈরি হয়, তখনই পাইকারি ব্যবসায়ীরা খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপান আর খুচরা ব্যবসায়ীরা পাইকারি ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপিয়ে জনগণের নাভিশ্বাস তৈরি করেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) স্থানীয় বাজার থেকে পেঁয়াজ কিনে রাজধানীর হাতে গোনা কয়েকটি এলাকায় কিছু বিক্রি করলেও নিজেরা আন্তর্জাতিক উৎস থেকে আমদানি করে কোনো পেঁয়াজ আনেনি। ফলে বঙ্গবুন্ধর হাতে গড়া টিসিবি জনগণের সংকটকালে সাধারণ মানুষের জন্য উদ্ধারকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন জেলায় স্থাপিত অফিস ও জনবল এবং বিশাল বহরের ডিলারগুলো বেকার বসে অলস সময় কাটাচ্ছে। ক্যাব দীর্ঘদিন ধরে টিসিবিকে কার্যকর করা এবং বর্তমান প্রশাসনিক অবকাঠামোকে পুনর্গঠন করে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য দাবি জানালেও সরকার সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, যার খেসারত সাধারণ জনগণকে দিতে হচ্ছে।

এদিকে সরকার টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানি না করে কিছু বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানির জন্য উদ্যোগ নেয়। ফলে ব্যবসায়ীরা ‘আজ, কাল’ করে কালক্ষেপণের কারণে সমস্যাটি আরও ঘনীভূত হয়েছে। বৃহৎ শিল্পগ্রুপের পেঁয়াজ এখনও দেশের বাজারে প্রবেশ করতে পারেনি। বিষয়টিকে আবারও ব্যবসায়ীদের হাতে পেঁয়াজের জন্য সরকারের আত্মসমর্পণ হিসেবে বলছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। কারণ সরকার যদি নিজে পেঁয়াজ আমদানি করত, তাহলে ব্যবসায়ীদের ওপর সরকারের এত নির্ভরশীলতা বাড়ত না, মানুষের দুর্ভোগ সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছাত না। বাজার ও ভোক্তা খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজারের ঊর্ধ্বগতির মূল কারণ আমদানিকারক ও বড় ব্যবসায়ী কর্তৃক পণ্যের হাত বদল। কারণ যখনই হাত বদল হয়, তখনই লাভের অঙ্ক বেড়ে যায়। বৃহৎ আমদানিকারক ও শিল্পগ্রুপ যখন আমদানি করবে, তারা নিজেরা সরাসরি এগুলো বিক্রি করবে না, বিভিন্ন জনকে পাইকারিতে বিক্রি করবে, আর তাদের মাধ্যমে হাত বদল করে আবারও পেঁয়াজের বাজার অস্থির হতে পারে।

এছাড়া একটি শুভঙ্করের ফাঁকি আছে পেঁয়াজের উৎপাদন ও ব্যবহার-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়ে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৬ লাখ টন, আর দেশে উৎপাদিত হয় ১৮ লাখ টন। বাদবাকি আট লাখ টন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু সিংহভাগ দেশে উৎপাদিত হলেও দেশীয় পেঁয়াজের দাম সব সময় বিদেশি পেঁয়াজের চেয়ে বেশি থাকে। দেশীয় পেঁয়াজ বাজারে সব সময় সহজলভ্যও নয়, সে কারণে দেশীয় পেঁয়াজের চাহিদা ও উৎপাদনের বিষয়ে পরিসংখ্যানটি কতটুকু সত্য, তা যাচাই করা দরকার। বাজার ও ভোক্তা খাতের অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভারতীয় গরু আমদানি করে কোরবানির গরুর বাজারে সংকট মোকাবিলার মতো দেশীয় গবাদি পশুর উৎপাদন বাড়িয়ে সংকট মোকাবিলায় পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়িয়ে এ সংকট নিরসনের পরামর্শ প্রদান করলেও কৃষক যখন ঘরের পেঁয়াজ ঘরে তুলবেন, তখন ভারতীয় এবং অন্য উৎস থেকে পেঁয়াজ আমদানি বাড়লে দেশের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই দেশীয় চাহিদা ও উৎপাদনের যে রকম প্রকৃত পরিসংখ্যান বের করতে হবে, একই সঙ্গে দেশের কৃষককে তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য উৎদপানকালে বিদেশি পেঁয়াজ আমদানিতে উচ্চহারে কর আরোপ করতে হবে। এছাড়া প্রকৃত কৃষকদের মাঝে প্রণোদনা হিসাবে স্বল্পসুদে ঋণ, ভর্তুকি প্রদান, কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য খাদ্যগুদাম ও হিমাগার নির্মাণ করা যেতে পারে।

পেঁয়াজ সংকট চলাকালে জেলা প্রশাসন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ভোক্তা অধিদফতরের সমন্বিত বাজার অভিযান চলাকালে যে বিষয়টি বেশি করে দেখা গেছে, তা হলো আমদানিকারক আমদানি করে আড়তদারদের হাতে পণ্য পৌঁছানোর সময় তাদের হাতে কোনো রশিদ দেন না। অনেকের মতে, যে ট্রাকে করে আমদানিকারক পেঁয়াজ আড়তদারদের কাছে পাঠান, তারা বিক্রি করে ওই ট্রাকে করে টাকা পাঠান। তারা জানেন না কে আমদানিকারক এবং কত টাকা আমদানি মূল্য। আবার অনেকে আমদানিকারকদের কাছে টাকা পাঠান, কিন্তু নাম-ঠিকানা জানেন না। বিষয়টি অনেকটাই অদৃশ্য ব্যবসার মতো। রশিদ, আমদানি মূল্য ও আমদানিকারকের নাম-ঠিকানা ছাড়া যদি কেউ পণ্য কেনাবেচা করে থাকেন, তাহলে এটা অদৃশ্য ব্যবসা ছাড়া কিছু হতে পারে না। তাই পেঁয়াজ আমদানিকারক, আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায় এ ধরনের অদৃশ্য ব্যবসাকে একটি কাঠামোর মধ্যে না আনা হলে কৃত্রিম সংকটের এই সিন্ডিকেট প্রথা ভাঙা সম্ভব হবে না। মজার কাহিনি হলো টেকনাফ

দিয়ে মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের আমদানি মূল্য ৪২ টাকা হলেও পাইকারিতে মূল্য ৯০ থেকে ১০০ টাকা। ব্যবসায়ীরা তাদের গোমর ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে পেপারলেস এ ধরনের কারসাজিতে লিপ্ত।

সাধারণ মানুষের জনদুর্ভোগ লাগবে কার্যকর ও বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও সমন্বিত বাজার তদারকি কার্যক্রমের একটি উদ্ভাবনী মডেল চলমান ছিল, যেখানে জেলা-উপজেলা প্রশাসন সফলভাবে নেতৃত্ব প্রদান করে। তা সত্ত্বেও বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের মতো অতি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে উদ্যোগ নিতে প্রশাসনের তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকায় দুর্ভোগ লাঘবের বিষয়গুলো গৌণ হয়ে যাচ্ছে। বাজার তদারকিতে বর্তমানে চলমান অভিযানটি অনেকটাই লোকদেখানো ও দায়সারা গোছের, কারণ বর্তমান বাজার তদারকিতে দেখা যাচ্ছে, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বাজারে পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছেন নাÑপ্রশাসনের নানা ধরনের কাজে জড়িত থাকায় বাজারে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে অভিযান পরিচালনা করার জন তার সময় থাকে না। ফলে অনেকটাই দায়সারাভাবে দায়িত্বপালন করে দু-একটি জরিমানা করেই কাজ শেষ করতে চান অনেকে। আবার মোবাইল কোর্ট আইন বা অন্যান্য আইনেও বলা আছে ফলোআপ করার কথা। অর্থাৎ আজকে যে অপরাধের জন্য একজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হচ্ছে, তাকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে, যাতে বোঝা যায় সে পরবর্তীকালে কী করছে। ব্যবসায়ীরা অনেক সময় মোবাইল কোর্টে জরিমানা দিতে আগ্রহী, কারণ সে বিশ্বাস করে যদি আজকে জরিমানা প্রদান করা হয়, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট তার দোকানে এক মাস আসবে না। ফলে সে আবারও আরও বেপরোয়া হয়ে অপরাধ সংগঠনে লিপ্ত হতে পারবে। ফলে সমন্বিত বাজার তদারকির মতো সরকারের অনেক উদ্ভাবনী উদ্যোগের সুফল তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ পাচ্ছে না। অন্যদিকে যে যেভাবে পারে লুটপাট করছে, জনগণের পকেট কাটছে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা এক্ষেত্রে নীরব দর্শক। প্রশাসনের নীরবতায় সর্বত্রই মনে হচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীদের লুটপাটের রাজত্ব বিরাজ করছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় ও

জেলা প্রশাসনের নানা সভার সিদ্ধান্তের কথা শোনা গেলেও কার্যকারিতা কতটুকু, তার নিরপেক্ষ তদন্ত অনুসন্ধান প্রয়োজন।

ভাইস প্রেসিডেন্ট

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

cabbd.nazerÑgmail.com

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..