মত-বিশ্লেষণ

পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধিতে আমাদের শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ করণীয়

তৌহিদুর রহমান: শুরুটা করি একটা গল্প দিয়ে। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ। বাজারে গিয়ে অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি দ্রব্য কিনেছেন দুই কেজি। সেগুলো নিয়ে বাসায় ফিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি। সেখানে লিখেছেন, ‘আল্লাহ বাঁছাইছে!!! দুই কেজি পেঁয়াজ নিয়া সহি সালামতে বাসায় ফিরলাম!!!!’। কথা হলো, পেঁয়াজের মতো একটি অতি পরিচিত সহজলভ্য দ্রব্য নিয়েও তিনি কেন এমন কথা লিখলেন? এর জবাব হলো,  পেঁয়াজ নিয়ে সাম্প্রতিক অরাজকতা থেকেই এমনটি লিখেছেন তিনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় এ দ্রব্যটির দাম নিয়ে পরিস্থিতি আসলেই ওই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ফেসবুকে দেওয়া ওই স্ট্যাটাসে জোকসের বা মজার কথা মনে হলেও আসলে এর মাধ্যমে তার নিকট থেকে একরাশ ক্ষোভ আর হতাশা বেরিয়ে এসেছে।

কিছু দ্রব্য রয়েছে, যেগুলো ধনী-গরিব নির্বিশেষে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিদিন সামান্য হলেও প্রয়োজন হয়। তার মধ্যে পেঁয়াজ একটি। বলতে গেলে, প্রতিদিন দেশের প্রায় শতভাগ বাড়িতেই খাবার তৈরি করতে প্রয়োজন হয় পেঁয়াজের। মসলাজাতীয় এ দ্রব্যটি ছাড়া অনেকে খাবার তৈরি করার কথা চিন্তাও করেন না। পেঁয়াজের মূল্য বছরের প্রায় সময়ই সহনশীল পর্যায়ে থাকায় এটি নিয়ে কথা ওঠে কম। অবশ্য মাঝে মধ্যে ১০-২০ টাকা হঠাৎ বৃদ্ধি পেলে তা নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের মধ্যেই পরিস্থিতি সীমিত থাকে। তবে গত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে পেঁয়াজ নিয়ে যে ধরনের অবস্থা তৈরি হয়েছে, তা অতীতের যে কোনো সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। এতে বিত্তশালীরা কোনো সমস্যায় না পড়লেও নাভিঃশ্বাস ওঠার জোগাড় মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষের।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বাজারে পেঁয়াজের মূল্য নিয়ে এক ধরনের অরাজকতা চলছে বলা চলে। এক মাস আগেও যে পেঁয়াজের দাম ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, সেখানে দাম বাড়তে বাড়তে ২৮০ টাকা পর্যন্ত উঠে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ফলে এবার পেঁয়াজ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ধরনের হাহাকার উঠেছে, অতীতে তা কখনও দেখা যায়নি। মূলত চালের দাম বাড়লেই তাদের কষ্ট বেড়ে যেত বহুগুণ। অথচ এবার পাঁচ কেজি চালের দামে মিলছে পাঁচ কেজি চাল। পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা এই একটি উদাহরণই পরিষ্কার। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো, পেঁয়াজের দাম নিয়ে এই অরাজকতার মধ্যে চালের দামও কেজিতে বেড়ে গেছে পাঁচ থেকে ১০ টাকা। পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির আড়ালে তা ঢাকা পড়েছে।

পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করে এভাবে বৃদ্ধি বিস্ময়করই বটে। অথচ অতীতে দাম বৃদ্ধি পেলেও তা কখনও ১৫০ টাকা ছাড়ায়নি। কিন্তু এবারের অতিরিক্ত দামে দেশের উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও রীতিমতো বেগ পেতে হচ্ছে। এর মধ্যে সরকার ও ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল বিভিন্ন পর্যায় থেকে এ পরিস্থিতি নিয়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন কথা আসছে প্রায় প্রতিদিনই। সাধারণ মানুষের যেখানে নাভিঃশ্বাস ওঠার জোগাড়, সেখানে এমন আচরণ নিশ্চয়ই প্রত্যাশিত নয়। বরং দাম কীভাবে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যায় সেদিকেই তাদের বেশি নজর দেওয়া উচিত ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন, এমন অভিযোগ ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে। দায়িত্বশীলরা এভাবে ব্যর্থ হলে তার চেয়ে হতাশার আর কিছু থাকে না।

পেঁয়াজ এমন একটি মসলাজাতীয় দ্রব্য, যা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিদিন প্রয়োজন হয়। কিন্তু এভাবে বিদ্যুৎগতিতে দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে, অনেক আকস্মিকভাবে ভারত সরকারের একটি সিদ্ধান্তে প্রতিবেশী দেশটি থেকে পেঁয়াজ আসা বন্ধ হয়ে গেছে। তারপর থেকে পেঁয়াজের দাম নিয়ে অরাজকতার শুরু। অবশ্য ভারত থেকে পেঁয়াজ আসা বন্ধ হওয়ার পরও দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন ব্যবসায়ী এবং সরকারের দায়িত্বশীলরা। কিন্তু তার প্রতিফলন বাস্তবে দেখা যায়নি। বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে একটি বিষয় কিন্তু স্পষ্ট, আমাদের পেঁয়াজের বাজার ভারত থেকে আমদানির ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল যে, হঠাৎ এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে তা কারোর মাথায়ই আসেনি। ফলে ভারতের এক সিদ্ধান্তেই দেশের বাজার টালমাটাল হয়ে উঠেছে। অথচ ভারতের পাশাপাশি আমাদের বিকল্প বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলে এ অবস্থার মধ্যে পড়তে হতো না।

এক কথায় বললে, পেঁয়াজের বাজার একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের মধ্যে উদ্বেগ নেই তা কিন্তু নয়। জাতীয় সংসদে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাসিম প্রশ্ন তুলেছেন, ‘বাণিজ্যমন্ত্রী যখন বলেন ১০০ টাকার নিচে দাম নামবে না, তাহলে ব্যবসায়ীরা তো সুযোগ পেয়ে যান।’ কথাটি আসলে বাস্তব। পরিস্থিতি যে পর্যায়েই যাক না কেন, দায়িত্বশীলদের আগপাছ ভেবে মন্তব্য করতে হবে, পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। মোহাম্মদ নাসিম সংসদে যেসব কথা বলেছেন, এমন প্রশ্ন কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে জোরালোভাবে উঠতে শুরু হয়েছে। আর এ ধরনের বিষয় নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে সাধারণ মানুষের মধ্যে, তা সরকারের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতির কারণ হয়।

পেঁয়াজের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধিতে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকার ও বিরোধীদলের একাধিক সংসদ সদস্য। তারা দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ। দাম ২০০ টাকা হয়ে গেছে উল্লেখ করে তারা সতর্ক করে বলেছেন, দাম নিয়ে মানুষের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া হলে সেটা খারাপ হবে। তাদের এ উপলব্ধি যৌক্তিক। এই দাম দরিদ্র শ্রেণি দূরে থাক, মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও ক্রয়ক্ষমতার বাইরে বলা চলে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের চাহিদা খুব সীমিত। তারা তিন বেলা খাবারের সংস্থান নিশ্চিত হলে খুশি থাকেন। বাড়তি তেমন কোনো বিলাসিতা তাদের টানে না। কিন্তু এই স্বাভাবিক চাওয়াতেও যদি কখনও টান পড়ে, তাহলে তাদের ভোগান্তি আর হতাশার শেষ থাকে না। আবার তারা শত কষ্টের মধ্যে থাকলেও সামাজিক মর্যাদাসহ নানা ভয়ে তা মুখ ফুটে প্রকাশও করেন না। পেঁয়াজের মতো একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম ২০০ টাকা ছাড়াবে তা হয়তো কখনও কল্পনাও করেননি অনেকে। সরকারকে এ ব্যাপারটি অনুধাবন করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ সাধারণ মানুষ ভালো না থাকলে হাজার কোটি টাকা দিয়ে যে ধরনের কর্মকাণ্ডই চালান না কেন, তা ফলপ্রসূ হবে না।

এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্টে। পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা নিয়ে খোদ সংসদ সদস্যরাই প্রশ্ন তুলেছেন। গণমাধ্যমেও ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও জোরালো প্রশ্ন, পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ আছে কি না? প্রশ্নটি কিন্তু অযৌক্তিক নয়। অতীতে যখনই নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, তখনই কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর যোগসাজশের প্রমাণ মিলেছে। বিশেষত রমজান মাসে এ অবস্থা দেখা গেছে। এবারও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও রাজধানীর কয়েকটি স্থানে বেশ কিছু সিন্ডিকেটের কারসাজির ব্যাপারটি সামনে এসেছে। যখনই ভারত রফতানি বন্ধ করেছে, তার পরের দিন থেকেই তারা দাম বৃদ্ধি করতে শুরু করেছেন। একপর্যায়ে তা আকাশছোঁয়া পর্যায়ে চলে গেছে।

সিন্ডিকেটের ব্যাপারটি সরকারেরও অজানা নয়। সে কারণেই ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের আড়তগুলোয় ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে অভিযান চালানো হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে নানা পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। বিপরীতে সাধারণ মানুষকে পড়তে হয়েছে সীমাহীন ভোগান্তির মধ্যে। সময় এসেছে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে লাগাম টেনে ধরার। তারা যাতে কখনোই কারসাজি করে কিংবা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দ্রব্যের দাম বাড়াতে না পারে, সে জন্য দীর্ঘস্থায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি সরকারের সব গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়ী থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যেসব দ্রব্যে আমরা এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারিনি তার প্রায় পুরোটাই আমাদের আমদানি করতে হয়। প্রায়ই দেখা যায়, আমাদের আমদানি বাণিজ্য আবার একক কোন বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেখানে দাম বাড়লে কিংবা রফতানি বন্ধ হলে তার প্রভাব পড়ে আমাদের দেশের বাজারে। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় উদাহরণ পেঁয়াজ ও গরু। অবশ্য পেঁয়াজ আমদানি বৈধভাবে হলেও গরু আসত অবৈধ পন্থায়। তবে গরু আসা বন্ধ হওয়ায় দেশের বরং উপকারই হয়েছে। অসংখ্য খামার দেশে গড়ে উঠেছে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হয়েছে অনেকের। প্রয়োজনীয় সংখ্যক গরু এখন দেশে উৎপাদন করা হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের, যা ইতিবাচক খবরই বটে।

এখন পেঁয়াজের ব্যাপারেও আমাদের বিকল্প চিন্তাভাবনা করতে হবে। শুধু পেঁয়াজ নয়, এ ধরনের যত পণ্য আছে যেগুলো আমদানিনির্ভর কিংবা আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সেগুলোয় কীভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া যায়, সে বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের চাষাবাদের জমি সীমিত, এগুলো কাজে লাগিয়ে উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কোনো দ্রব্য যাতে একক বাজার থেকে আমদানিনির্ভর না হয়, নজর দিতে হবে সেদিকেও। মনে রাখতে হবে, এসব দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা কমার ওপর সাধারণ মানুষের ভাগ্য নির্ভর করে। সে কারণে সরকারকে এ ব্যাপারে বাড়তি নজরদারি করতে হবে। এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জনবলের কোনো ঘাটতি থাকলেও তাও দ্রুত পূরণ করতে হবে, বন্ধ করতে হবে অনিয়ম-দুর্নীতি। ভবিষ্যতে আর কোনো দ্রব্যের ক্ষেত্রে যাতে পেঁয়াজের মতো অরাজকতা তৈরি না হয়, প্রত্যাশা থাকবে সেটাই।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..