মত-বিশ্লেষণ

পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম: পড়াশোনা শেষ করেই তো কর্মজীবন শুরু করলাম, তাহলে আবার পড়াশোনা কেন? পড়াশোনা তো করবে ছাত্ররা, যারা এখনও স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে জড়িত। কর্মজীবী অথবা পেশাজীবীদের পড়াশোনা করার প্রয়োজন কি আদৌ আছে? আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে আমরা প্রায়ই কিছু সহকর্মীকে দৈনন্দিন কাজকর্ম শেষ করে সন্ধ্যার সময় সান্ধ্যকালীন পড়াশোনা করতে বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে দেখি। আবার কাউকে দেখি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দূরশিক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন পেশাগত সনদ ও স্বীকৃতি গ্রহণ করতে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এসব শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ আদৌ কি প্রয়োজনীয়, নাকি সময় নষ্ট এ প্রশ্নের অবতারণা শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবাই করছেন সুদীর্ঘ কাল থেকে। এক অদ্ভুত বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয় পেশাগত জীবনে পড়াশোনার সমালোচনা শুনতে গিয়ে।
যেমন ধরুন, আপনার বিভাগীয় প্রধান, যিনি অভিজ্ঞতায় অনেক সমৃদ্ধ, পেশাগত দক্ষতা দিয়ে আজকের এই অবস্থানে। সব সময় সহকর্মীদের জেনে-বুঝে তিনি কাজ করতে বলেন। তাহলে জেনে-বুঝে কথাটার মানে কী এবং তিনি এই শব্দগুচ্ছ দিয়ে কী বোঝাতে চাইলেন? পেশাজীবীভেদে এই জেনে-বুঝে কথাটির ভিন্ন ভিন্ন অর্থ দাঁড়ায়। কেউ বলছেন জেনে-বুঝে কথাটির অর্থ হলো মন দিয়ে কাজ করা, অন্যদিকে কেউ কেউ এই শব্দগুলোর অর্থকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে নিজেদের প্রথমে জানা, পরে বোঝা এবং তারপর জানা ও বোঝার বাস্তবায়নের মতো কঠিন কাজটি করে যাচ্ছেন। এই জানা-বোঝা আন্দোলনকে সমগ্র বিশ্বব্যাপী বলা হচ্ছে সিপিডি প্রোগ্রাম, যার অর্থ হলো Continuous Professional Development (CPD)। এই শিক্ষা আন্দোলন পেশাজীবীদের ক্রমাগতভাবে পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে যাওয়া বৈশ্বিক অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেল্যু মেক্সিমাইজেশনে সহায়তা করে যাচ্ছে।
প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা কী এবং কেন? তাও আবার প্রতিষ্ঠানের অর্থে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ। বিশ্বব্যাপী যে উপাদানগুলো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সবচেয়ে সমাদৃত, তা হলো Factors of Production তথা উৎপাদন উপকরণ। আর এই উপকরণগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মানবসম্পদ। মূলধন, যন্ত্রপাতি ও ভূমির পাশাপাশি উদ্যোক্তা তথা মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া কোনো উদ্যোগই সফল হতে পারে না। এই উপাদানগুলোর অসামঞ্জস্য দেখা দিলে কোনো উদ্যোগের সফলতা চিন্তাই করা যায় না। কিন্তু এই উপাদানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ মানবসম্পদই সামগ্রিকভাবে অবহেলিত থেকে যায়।
প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি সার্বিক উন্নয়ন মানবসম্পদকে প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বস্ত করে তোলে। শুধু তা-ই নয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি এ সত্য সবাই মুখে অনুধাবন করছি, কিন্তু হৃদয়ঙ্গম করছি না। কিন্তু অদক্ষ মানবসম্পদ দ্বারা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হওয়ার পরই আমরা বুঝতে পারি মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। পেশাগত জীবনে পড়ালেখার প্রভাব ও ব্যাপকতা অল্প সময়ে বলে শেষ করা যাবে না। শুধু দৈনন্দিন কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেই বিষয়টি বুঝতে পাঠকের কোনো সমস্যা হবে না। ধরুন একজন শিক্ষানবিশ অথবা অপ্রশিক্ষিত কর্মকর্তা একটি কাজ যেভাবে সম্পন্ন করবে, একজন প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি দক্ষতা নিয়ে তা করতে পারে। অপ্রশিক্ষিত মানুষকে অন্য সহকর্মী বা লাইন ম্যানেজারের করুণার ওপর নির্ভর করতে হয়, আর প্রশিক্ষিত সহকর্মী নিজের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে যে কোনো সমস্যা সমাধানের পথ পেয়ে যায় অতি সহজে।
শিক্ষার কোনো তৎক্ষণাৎ মূল্য পাওয়া বা দেখা যায় না বলে অর্থপিশাচ কিছু মানুষের কাছে শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের কোনো মূল্য নেই। এই সম্প্রদায়ের মানুষগুলো মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রেখে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জন করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। উন্নত বিশ্বে পেশাগত শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বার্ষিক বাজেটের একটা বড় অংশ বরাদ্দ রাখা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি কোম্পানিকে জনশক্তির শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের জন্য বার্ষিক বাজেটের চার থেকে পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হয়। বিগত বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেটগুলোর প্রশিক্ষণ বাজেট প্রায় প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। ২০১৭ সালে এই বাজেটের পরিমাণ প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ভারতের মতো দেশের করপোরেট প্রশিক্ষণ ব্যয় বার্ষিক বাজেটের প্রায় তিন শতাংশ, যা দিন দিন বাড়ছে।
এবার আসা যাক বাংলাদেশের জনশক্তি ও তাদের পেশাগত জীবনে শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে। একজন সমাজকর্মী, পেশাজীবী ও প্রশিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় একটি কথা প্রায়ই শুনতে হয় বাংলাদেশের করপোরেট সংস্কৃতিতে প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেই। যদিও বা সামান্য কিছু থাকে, তাও এসব প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত করা হচ্ছে এমন সব কর্মীকে, যাদের আসলে এ ধরনের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনই নেই। প্রতিষ্ঠানের খরচে বিদেশে ভ্রমণের একটা উপলক্ষ হলো প্রশিক্ষণ। একজন পেশাজীবী ব্যাংকার হিসেবে দীর্ঘ ২০ বছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে বাংলাদেশের লার্নিং ও ডেভেলপমেন্ট সংস্কৃতি নিয়ে দু-একটা উদাহরণ দিলেই পুরো বিষয়টি পাঠকের কাছে পরিষ্কার হবে।
ব্যাংকিং পেশায় বর্তমানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয়ভাবে বাংলাদেশে বিআইবিএম এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেLondon Institute of Banking and Finance (UK), Institute of International Banking Law and Practice – IIBLP (USA)  ও ভারতের ঘওইগ ব্যাংকও ব্যাংকিং পেশায় নিয়োজিত মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যুগোপযোগী ও শিল্পনির্ভর সিলেবাসের মাধ্যমে বেশ কিছু অতিপ্রয়োজনীয় কোর্স চালু করেছে। এসব শিক্ষাব্যবস্থা শুধু দূরশিক্ষণ মাধ্যমে পরিচালিত হয় না, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এসব কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
এসব শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু কোর্স হলো ÑCertificate for Documentary Credit Specialist (CDCS), Certificate for Specialist in Demand ‡uarantees, Certificate in Trade Finance (CITF) Ges Certified Anti-Money Laundering Specialist (CAMS)|। স্থানীয় পেশাগত শিক্ষা কার্যক্রমগুলোর মধ্যে ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স কর্তৃক পরিচালিত ব্যাংকিং ডিপ্লোমা, বিআইবিএম কর্তৃক পরিচালিত ঈঊঞঝ এবং ঈঊজগ-সহ ব্যাংক ও ব্যাংকিং পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অন্যতম। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো এসব যুগোপযোগী দক্ষতাবর্ধক কার্যক্রমগুলোর সঙ্গে শিল্পের খুব সামান্যসংখ্যক পেশাজীবী সংশ্লিষ্ট হচ্ছেন। অথচ বহির্বিশ্বে এসব কার্যক্রম অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ পেশাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে। আমাদের দেশের হাতে গোনা কয়েকটি ব্যাংক ও করপোরেট ছাড়া আর কারও মানবসম্পদ উন্নয়নে এসব শিক্ষা কর্মসূচিতে আগ্রহ নেই। নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে যারা নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মানসে এসব ডিগ্রি অর্জন করেছেন, তারা আজ বহুপক্ষীয় চাপে পড়ে ক্রমাগত নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন করে বলেছেন, , ÔAn investment in knowledge always pays the best interest অ্যাসোসিয়েশন অব টেলেন্ট ডেভেলপমেন্টের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কোনো প্রশিক্ষিত জনশক্তির উৎপাদনশীলতা কোনো অপ্রশিক্ষিত জনশক্তির চেয়ে ২১৮ শতাংশ বেশি এবং প্রশিক্ষণমুখী প্রতিষ্ঠানের আয়ের পরিমাণ প্রশিক্ষণবিমুখ প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি। পেশাগত শিক্ষাগ্রহণ অনেক কষ্টকর ও ব্যয়বহুল। প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়া এ কার্যক্রম খুব বেশি দূর এগিয়ে যাবে বলে মনে হয় না। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বুঝতে সময় নিচ্ছে এসব প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা। দেশের উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদের বিকল্প নেই। আর দক্ষতা উন্নয়ন করতে হলে বৈশ্বিক পরিবর্তন এবং এই পরিবর্তনভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। এ সত্য অনুধাবনে যত বিলম্ব হবে, ততই এ দেশের মানবসম্পদ পিছিয়ে থাকবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক ও উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমকে যুগোপযোগী ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। শুধু শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বহুলাংশে বিফল হয়। তাই বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে এখনই।

ব্যাংক কর্মকর্তা

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..