প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পেশা হিসেবে ব্যবসাই মোক্ষ

অনাথ শিশুর মতো যার জীবনখানি নিস্তরঙ্গে নিথর হতে পারতো নিযুত জীবনের নিঠুর নিয়তিপাশে তিনি জুগিয়েছেন হৃৎস্পন্দনের খোরাক। দেশের জন্য লড়েছেন। শূন্য জমিনে গড়েছেন ব্যবসায় কাঠামো। জীবনের সব অর্জন লিখে দিয়েছেন মানুষের নামে। তিনিই দেশের সবচেয়ে সফল ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’-এর জনক রণদা প্রসাদ সাহা। নারীশিক্ষা ও চিকিৎসায় নারী-পুরুষ কিংবা ধনী-গরিবের ভেদ ভেঙেছেন। তার জীবনেই রয়েছে সসীমকে ডিঙিয়ে অসীমে শক্তি সঞ্চারের কথামালা। এ জীবন ও কেতন যেন রোমাঞ্চিত হৃদয়েরই উদ্দীপ্ত প্রেরণা।  পর্ব-৩৭

মিজানুর রহমান শেলী: ১৯৩২ সালে তিনি রেলের টিকিট কালেক্টরের চাকরিতে ইস্তফা দিলেন। এ অবস্থায় সংসারের ব্যয় নির্বাহের জন্য তাকে বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। এই আর্থিক টানাপড়েন আর গণদারিদ্র্যের বাজারে নতুন কোনো চাকরি বা পেশা খুঁজে বের করা সহজ কোনো ব্যাপার নয়। তাছাড়া চাকরিতে ইস্তফা দেওয়ার পরেই ছোট মেয়ে জয়ার জন্ম হলো। ফলে সংসারের ব্যয়ভার বেড়ে যায়।

পেশা হিসেবে সেকালের বাংলায় কৃষি, বাণিজ্য অথবা চাকরি। কৃষিকাজে তার বাপ-দাদারা অভ্যস্ত ছিলেন না। রণদা এলাকা ছেড়ে কলকাতা পাড়ি জমানোর পেছনে গ্রামীণ অর্থনীতি বা তার জীবন-জীবিকায় অনাগ্রহ ফুটে ওঠে। তাছাড়া মির্জাপুরের সেকালের অর্থনৈতিক কাঠামো বিচার করলে কৃষক, মৎসজীবী, ব্যবসায়ী এবং নাপিত আর কাঠমিস্ত্রির মতো পেশাজীবী সম্প্রদায় কেবল চোখে পড়ে। এর মধ্যে রণদার পিত্রালয় সাহাপাড়ায় কোনো চাষি সম্প্রদায় সেকালে ছিল না। এখনও নেই। মৎসজীবী সম্প্রদায় সাহাপাড়ার পশ্চিমে আন্ধারায় মহল্লাটিতে বাস করে। এখানে কাঠমিস্ত্রি সম্প্রদায়েরও বাস ছিল। আর সাহাপাড়া, আন্ধরা এই দুটো পল্লী বাদ দিলে আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়েই ছিল কৃষক সম্প্রদায়ের বাস। কৃষিকাজের প্রতি রণদার মনোভাব তেমন বোঝা যায়নি কখনও। কার্যত তিনি নিচু কাজ বা উঁচু কাজ এবং ধর্ম-বর্ণ প্রথার আড়ষ্টতা অতিক্রান্ত মানুষ। তবুও দীর্ঘদিনের চর্চিত সমাজের বাহ্যিক আভরণ ভাঙতে বোকার মতো সংগ্রামে মেতে ওঠেননি কখনও। তাই বলা যায়, আশেপাশের নিম্ন বর্ণের পেশাজীবী হিন্দুদের পেশা তিনি গ্রহণ করতে আড়ষ্ট বোধ করবেন অথবা কৌশলগত কারণে সে পেশায় যাবেন না সেটাই স্বাভাবিক। তবে ওইসব পেশায় ভালো ভবিষ্যৎ ছিল না, সেটা নিশ্চিত। যাহোক, সাহাপাড়াবাসীরা বিশেষত ব্যবসায়ী ও চাকুরে। রণদা প্রসাদ সাহার পিতৃপুরুষ ছিলেন ব্যবসায়ী। তবে সাহাপাড়ায় রণদার জ্ঞাতিগোষ্ঠী এবং পিতৃপুরুষের কখনও কখনও চাকরি-বাকরি করার অভ্যাস রণদাকে চাকরির প্রতি অনীহা তৈরি করেনি। পিতৃপুরুষের মূল পেশা ব্যবসাতেই তিনি বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন।

রণদা সেনাবাহিনী থেকে ফেরার পর বিয়ে করলেন এবং জীবন-জীবীকার খোঁজে রেলের চাকরি বেছে নিয়েছিলেন। এর পেছনে কারণ ছিল দুটি। এক. ব্যবসা করার মতো যথেষ্ট পুঁজি আর সামাজিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি না থাকা। দুই. ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে যোগ্যতানুসারে রণদার রেলের চাকরি প্রাপ্তি। কিন্তু এ চাকরি যখন তিনি ছেড়ে দিলেন, তখন তার পক্ষে ভালো কোনো চাকরি তখন পাওয়া মুশকিল। কেননা অর্থনৈতিক মন্দার এই কালে সব পুঁজিপতি ব্যবসায়ীরাই শ্রমিক ছাঁটাই এবং মজুরি কমানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাঝে মধ্যেই শ্রমিকদের পক্ষ থেকে আন্দোলন-সংগ্রামে কলকাতা উত্তাল হয়ে ওঠে। ধর্মঘট আর লক-আউটে কলকাতা স্থবির হয়ে ওঠে। আর্থিক কর্মচাঞ্চল্য স্থবির হয়ে পড়ে। তাছাড়া চাকরিজীবনের মিথ্যা মামলার অপমান আর অনিশ্চয়তা তাকে নতুন চাকরির প্রতি অনীহা ডেকে এনেছিল তা বলাই চলে।

বাপ-দাদার ব্যবসা জীবনই তার কাছে মোক্ষ হয়ে উঠে। কিন্তু ব্যবসা করতে হলে তো পুঁজি লাগবে! রণদার কাছে তখন কিছু টাকাকড়ি জমেছিল। মামলার ক্ষতি পূরণের টাকা। তাছাড়া মামলা চালানোর জন্য স্ত্রী কীরণবালা গয়না বিক্রির টাকাও অবশিষ্ট কিছু ছিল। এ টাকা দিয়েই তিনি তার পরবর্তী ব্যবসায় জীবনের অভিযাত্রা শুরু করবেন বলে মনস্থ করলেন। এ ব্যাপারে তিনি কারও সঙ্গে আলাপ করেছিলেন কি না, তা জানা যায়নি। তবে রণদা প্রসাদ ব্যবসায়ের চিন্তার কথা প্রিয়তমা স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করলেন। স্ত্রী কোনো সংকোচ বা দ্বিধা না দেখিয়ে স্বামীকে সমর্থন ও সাহস জাগালেন। এমনকি তার গয়না বিক্রির টাকা ব্যবসায় ব্যবহারের অনুমতি দিলেন।

সময়টা উত্তাল। এমনকি আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ঘন ঘন রূপান্তর পরিক্রমা অব্যাহতভাবেই চলছে। এতই টালমাটাল যে, শিল্প বিকাশ হচ্ছে কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধা তখন বেশ সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে প্রান্তিকদের জন্য আরও বেশি কঠিন পরিস্থিতি। রণদার মতো বাধ্য হয়ে ব্যবসায় নামা নতুন ও স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ীর অবশ্য সার্বিক এই আর্থিক কাঠামো নিয়ে ভাববার কোনো প্রয়োজন অথবা সুযোগ ছিল না। ক্ষুদ্র ব্যবসায় পরিসরে নিজের ব্যবসাটুকু চলার মতো সামান্য সুযোগ থাকলেই এই বীরযোদ্ধা নেমে পড়তে পারেন।

কিন্তু এই আর্থিক মন্দার যুগে কী ব্যবসায় পা বাড়াবেন রণদা? কলকাতায় তখন কয়লার ব্যবসা বেশ জমজমাট। আধুনিক অর্থনৈতিক জীবনে কয়লা একটি অপরিহার্য পণ্য। কয়লার ইতিহাস প্রাচীনকাল থেকেই প্রসিদ্ধ। তবে বিস্তৃত পরিসরে উৎপাদন ও ব্যবহারের ইতিহাস নিকট অতীত। ছোট নাগপুরের ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট এসজি হিটলি হলেন বিশাল পরিসরে কয়লা খনি উৎখননের অভিযাত্রিক। ১৭৭৪ সালে হিটলি ও জন সামার তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছ থেকে কয়লা উৎখননের অনুমতি পান। তাদের প্রথম উৎখনন ক্ষেত্র ছিল পাচেটা ও বীরভুম অঞ্চল। পরে মি. রেডফার্নে এই অভিযাত্রায় যোগ দেন। বাংলার গভর্নর তাদের বাংলা থেকে কয়লা উৎখনন ও বাংলায় বিক্রির ব্যাপারে বিশেষ ক্ষমতা দেন। এমনকি সার্বিক দায়দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় তাদের স্বায়ত্তশাসন সংরক্ষিত হয়। এই যৌথ কারবার ছয়টি খনি উৎখনন করে ৯০ টন কয়লা উত্তোলন করে ১৭৭৭ সালের মধ্যে। কিন্তু আকস্মিকভাবে এই যৌথ কারবার থমকে যায় এবং অগ্রগতির পুরোটাই ঠিক পেছনে ফিরে আসে যখন মি. হিটলিকে বদলি করে দেওয়া হয়।

১৮১৪ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস সম্ভাব্য কয়লা খনি উৎখননের পরামর্শ দেয় ইংল্যান্ডকে। তার ভিত্তিতে জোন্স নামের এক অবসরপ্রাপ্ত মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারকে ভারত পাঠানো হয়। মি. জোন্স ভারতে কয়লা খনির অমিয় সম্ভাবনা খুঁজে পান। তারপর তিনি রানিগঞ্জে একটি খনি উৎখনন করেন। এই বাবদে তিনি ৪০ হাজার রুপি বরাদ্দ পান। কিন্তু কিছুকাল পরেই তার মৃত্যু হয়। ফলে কলকাতার এক  কোম্পানি এর দায়িত্ব নেয়। ১৮৩১ সাল নাগাদ এ কোম্পানি বার্ষিক ১৫ হাজার টন কয়লা উত্তোলনে সক্ষম হয়। এ সফলতার পরেই রানিগঞ্জে আরও উৎখনন চালানো হয়। ১৮৪৩ সালে কিছু সমন্বয়ের মাধ্যমে বেঙ্গল কোল কোম্পানি গঠন করা হয়।

যাহোক, প্রথম দিকে কয়লা উত্তোলনে ধীরগতি ছিল। কেননা তখন কয়লার চাহিদা ছিল সামান্য। তাছাড়া কয়লা পরিবহনে ছিল আরেক সংকট। দামোদর নদী দিয়েই কয়লা পরিবহন করা হতো। কিন্তু সারা বছর নদীটিতে নৌযান চলাচলের জন্য যথেষ্ট পানি থাকত না। পরে ১৮৩১ থেকে কোম্পানি কয়লা রফতানি শুরু করে সিঙ্গাপুর, মাদ্রাজ, সিলন ও পেনাঙে। এই কয়লা ওইসব অঞ্চলে বাষ্পচালিত জাহাজে ব্যবহার হতো। ১৮৩৯ সালে কয়লা উত্তোলন হলো ৩৬ হাজার টন এবং ১৮৪৬ সালে ৯১ হাজার টন।

পরবর্তী অর্ধশতকে কয়লা উত্তোলনে এক নবদিগন্তের সূচনা হলো। এ সময় শিল্প-কারখানা বিকাশে কয়লার চাহিদা বেড়ে যায়। উপরন্তু কলকাতা ও রানিগঞ্জের মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপন হলো ১৮৫৪ সালে। ফলে নিয়মিত কয়লা পরিবহনে আর কোনো সংকটই থাকল না। ১৮৬০ সালে রানিগঞ্জে ৫০টি কয়লাখনি একনাগাড়ে উৎখনন চললো। আর সমগ্র ভারতে উৎখননরত কয়লা খনির সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়াল ৫৫৫ থেকে এক হাজার ৯০৫টিতে। ভারতে কয়লা উৎপাদন হয়েছিল ১৮৩১ সালে ১৫ টন। ১৮৩৯ সালে ৩৬ টন, ১৮৪৬ সালে ৯১ টন, ১৮৬৮ সালে ৫০০ টন, ১৮৮০ সালে ১০০০ টন, ১৯০০ সালে ৬০০০ টন, ১৯১২ সালে ১২ হাজার টন।

এ তালিকায় স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, ভারতে কয়লার উৎপাদন দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এমনকি উনিশ শতকের শেষার্ধে বর্ধিষ্ণুতার গতি ত্বরান্বিত হয়েছিল। কার্যত শিল্প-কারখানার বিকাশই তার মূল কারণ। বিশ শতকের শুরুতে তাই কয়লা খনি-উৎখনন, উত্তোলন ও বিক্রিকেন্দ্রিক ছোট-বড় ব্যবসায় বেশ গতি পায়। এ সময় বাসা-বাড়িতেও কয়লার ব্যবহার বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

রণদা প্রসাদ সাহা স্বভাবতই যে কোনো নতুন ব্যবসায়ীর মতোই নির্দিষ্ট একটি সুবিধাজনক ব্যবসা বেছে নেওয়ার চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিলেন। কলকাতাতেই যেহেতু তিনি ব্যবসা করবেনÑসিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি তাহলে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তার ছেলেবেলায় তিনি যখন কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় কুলি-মজুর আর টোকাই আর পত্রিকা বিক্রির পেশায় নিত্য ছুটে বেড়াতেন, তখন থেকেই তার কাছে কয়লার ব্যবসা বেশ পরিচিত। এ আলোচনা আগের অধ্যায়েও করা হয়েছে তিনি হুগলি নদী বন্দর এবং রেলস্টেশন থেকে কয়লা কুড়িয়ে এনে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করে বেশ টাকা আয় রোজগার করতেন। সেটা ছিল তার বিনা পুঁজির ব্যবসা। কিন্তু এবার এই যৌবন দীপ্ত বয়সের সাযুজ্যে তিনি আর বিনা পুঁজি নয়, বরং ছোটখাটো পুঁজি নিয়েই কয়লার ব্যবসায় নামতে চান।

 

গবেষক, শেয়ার বিজ

mshelleyjuÑgmail.com