পোর্টফলিও কাঠামোতে পরিবর্তন শুরু বিনিয়োগকারীদের

ডিএসইর সাপ্তাহিক চিত্র

শেখ আবু তালেব: পুঁজিবাজারের বেশিরভাগ খাত এখন বিনিয়োগ ঝুঁকির কাছে চলে গেছে। এমন সময় প্রধান সূচকও সাত হাজার অতিক্রম করেছে। তাই পুঁজির নিরাপত্তায় সতর্ক হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। আবার সামনে ডিসেম্বর ক্লোজিংয়ের কোম্পানিগুলো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করবে। এজন্য কাছে থাকা মুনাফার শেয়ার বিক্রি শুরু করেছেন অনেকে। পরিকল্পনা করছেন নতুন শেয়ারে বিনিয়োগের।

ফলে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফলিওতে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে। এতে বিনিয়োগের কাঠামোয় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাপ্তাহিক তথ্য ও বাজার বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এমন চিত্র। গত ১৪ অক্টোবর সপ্তাহের শেষে দিনে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে চলে যাওয়ায় ডিএসইর সার্বিক লেনদেন কমেছে ২৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাতভিত্তিক মূল্য-আয় অনুপাতে (পিই রেশিও) মাত্র কয়েকটি বিনিয়োগ ঝুঁকির নিচে অর্থাৎ ২০ পয়েন্টের নিচে রয়েছে। বেশিরভাগ খাত বিনিয়োগ ঝুঁকির কাছে চলে গিয়েছে। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহ শেষে ব্যাংক খাতের পিই রেশিও দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক ৯। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পিই রেশিও ৩২ দশমিক পাঁচ, বস্ত্র খাতের ২৭ দশমিক সাত, ওষুধ ও রসায়ন খাতের ২১ দশমিক এক, প্রকৌশল খাতের ১৯ দশমিক তিন, বিবিধ খাতের ২৫ দশমিক তিন, খাদ্য খাতের ২৪ দশমিক পাঁচ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ১৩ দশমিক সাত, চামড়া খাতের ৩৮ হয়েছে। একই সঙ্গে সিমেন্ট খাতের ১৯ দশমিক চার, আর্থিক খাতের ৩২ দশমিক পাঁচ, পেপার খাতের ২৯ দশমিক ছয়, টেলিযোগাযোগ খাতের ১৯ দশমিক পাঁচ, সেবা ও আবাসন খাতের ২১ দশমিক এক, সিরামিক খাতের ৩৫ দশমিক তিন এবং পাট খাতের পিই রেশিও হয়েছে ৭৮৬ দশমিক সাত।

অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির পিই রেশিও ১৫-এর নিচে থাকলে, তাকে বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে গণনা করা হয়। পিই রেশিও ১৫-এর বেশি হলে তাতে ক্রমান্বয়ে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যায়, ঝুঁকি বাড়তে থাকে। পিই রেশিও ২০-এর বেশি হলে শেয়ারটি ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে বলে ধরা হয়। এজন্য পিই রেশিও ৪০-এ পৌঁছালে ওই কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণ দেয়া নিষিদ্ধ করে দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।

বর্তমানে ডিএসইর গড় পিই রেশিও হয়েছে ১৯ দশমিক ৫২। একই সময় ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স সাত হাজার অতিক্রম করেছে। গত সপ্তাহের প্রধম কার্যদিবসে প্রধান সূচক সাত হাজার ৩৪২ থেকে সাত হাজার ৩৬৭ পয়েন্টে গিয়ে ঠেকে। ফলে ওই দিন বাজার মূলধন বাড়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেননি বিনিয়োগকারীরা।

তারা মনে করছেন বাজার ঝুঁকির দিকে চলে যাচ্ছে। তাই বিনিয়োগ নিয়ে তারা সতর্ক অবস্থানে চলে যাওয়া শুরু করেন। কমিয়ে দেন লেনদেন। এরপরের দিন থেকে অব্যাহতভাবে কমতে শুরু করে সূচক, লেনদেন ও বাজার মূলধন।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিসেম্বর ক্লোজিংয়ের কোম্পানিগুলো ডিভিডেন্ড ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চলছে তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির কাজ। কভিড মহামারিতেও অনেকে ভালো মুনাফা করেছেন। এখনই অনেকে সেই সব কোম্পানির শেয়ারে মনোনিবেশ শুরু করেছেন।

একদিকে ডিএসইর পিই রেশিও ঝুঁকিতে চলে যাওয়া অন্যদিকে ডিসেম্বর ক্লোজিংয়ের হাতছানি। এ সুযোগ কাজে লাগাতে শুরু করেছেন অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা। তাই মুনাফায় থাকা শেয়ার বিক্রয় করে নতুন কোম্পানিতে বিনিয়োগ শুরু করেছেন তারা। এজন্য বেছে নিচ্ছেন মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোকে। এতে পুঁজিবাজারে বিক্রয় চাপ বেড়েছে। সার্বিক চাপে কমেছে লেনদেন, পতন হয়েছে সব সূচকের।

ডিএসইর তথ্য বলছে, গত সপ্তাহে মোট ৩৮২টি সিকিউরিটিজ লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে দর বাড়ে মাত্র ১২৪টির, কমে যায় ২৩১টির, অপরিবর্তিত ছিল ২৩টির ও লেনদেন হয়নি চারটির।

প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমে ৯৯ দশমিক ৭০, ডিএস৩০ কমে ৪৮ দশমিক ২৫ ও শরিয়াহ্ সূচক কমে ২৮ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন কমে যায় চার হাজার কোটি টাকা।

এর প্রতিফলন দেখা যায় সিকিউরিটিজ প্রতিষ্ঠান ইবিএলের সাপ্তাহিক গবেষণায়। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে চলে গিয়েছেন। বাজার সংশোধন হওয়ায় তারা অপেক্ষা করছেন নতুন করে মৌলভিত্তির কোম্পানিতে বিনিয়োগ। অনেকেই যা শুরু করেছেন। এতে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফলিওতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে।

তথ্য বলছে, এ পতনের সময়ও ট্যানারি, কাগজ ও মুদ্রণ, খাদ্য, সাধারণ ও জীবন বিমা এবং মিউচুয়াল ফান্ড খাতে আগের সপ্তাহের চেয়ে বেশি মুনাফা তুলেন বিনিয়োগকারীরা। একই সময় লোকসান দেখা গেছে, পাট, আইটি, বস্ত্র, প্রকৌশল, সিমেন্ট, টেলিকম, জ্বালানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সিরামিক খাতে। বিনিয়োগকারীরা মূলত এ কয়টি খাতে বেশি সক্রিয় ছিলেন।

এ সময় ডিএসইর মোট লেনদেনে শীর্ষে ওঠে ওষুধ খাতের কোম্পানি। মোট লেনদেনের ১৫ দশমিক ছয় শতাংশ অবদান রাখে খাতটি। এরপর থাকা বস্ত্র খাত ১২ দশমিক এক, জ্বালানি ১০ দশমিক তিন, ব্যাংক ১০ দশমিক এক, প্রকৌশল আট দশমিক সাত, সিমেন্ট সাত দশমিক চার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত পাঁচ দশমিক চার শতাংশ অবদান রাখে। একক কোম্পানি হিসেবে লেনদেনে ডিএসইতে শীর্ষে উঠে আসে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ।

এদিকে একক কোম্পানি হিসেবে শেয়ারের দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় ওঠে সদ্য তালিকাভুক্ত এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক। গত সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ারদর সর্বোচ্চ বাড়ে ২৯ দশমিক ৫১ শতাংশ। এরপর রয়েছে শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ও ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং।

অন্যদিকে আলোচিত সময়ে শেয়ারের দর হারানোর শীর্ষ তালিকায় ছিল ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স, ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ও এনভয় টেক্সটাইলস।


সর্বশেষ..