প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পোলট্রি শিল্পের উন্নয়ন: নারী ও আমাদের উদ্যোগ

মনোজিৎ মজুমদার: রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার মহাসড়কের অদূরে রহিমা বেগমের ছোট পোলট্রির খামার। অল্প বয়সে বিয়ে হয় রহিমার। রহিমার স্বামী ভ্যানচালক। স্বামী, শাশুড়ি ও তিন সন্তান নিয়ে রহিমার পরিবার। স্বামীর একার উপার্জনে সংসার চলে না। রহিমা ভাবেন, কী করা যায়। এক নিকটাত্মীয়ের সহযোগিতায় ব্যাংক থেকে পঁচিশ হাজার টাকা ঋণ নেয় ২০১২ সালে। ঋণের টাকায় ১০০ মুরগির বাচ্চা নিয়ে বাড়ির পাশে ছোট একটি খামার গড়ে তোলেন রহিমা। ছোট খামারটি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। বর্তমানে তার খামারে দেড় হাজার মুরগি রয়েছে।

কভিড মহামারিতে প্রায় এক লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে রহিমার। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে কভিডকালে সরকারি প্রণোদনা পেয়েছেন রহিমা। প্রণোদনায় খামারটি এখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। রহিমাদের মতো ক্ষুদ্র খামারিদের কিছু সমস্যা থেকেই যায়। সমস্যা হলো বাজারজাতকরণ। যে ডিলার মুরগির খাদ্য ও বাচ্চা সরবরাহ করেন, তার কাছেই মুরগি বিক্রি করতে হয়। ফলে অনেক সময় ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয় রহিমাদের মতো ক্ষুদ্র খামারিরা।

কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকার পরও দেশের নারীরা পোলট্রি খাতে বিরাট অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলর (বিপিআইসিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের পোলট্রি খাতে ৬০ লাখের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। এর মধ্যে ৪০ শতাংশই নারী।

প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞগণের মতে, পোলট্রি খাতে নারীর অবদানের স্বীকৃতি জাতীয় পর্যায়ে থাকা উচিত। কিন্তু পোলট্রি নীতি, প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন নীতিমালায় সুনির্দিষ্টভাবে নারীদের অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এর ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৭টির সঙ্গে পোলট্রি শিল্পের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ শিল্পের গুরুত্ব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষির উপখাত হিসেবে পোলট্রি খাতের অবদান ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বাংলাদেশের সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮ অনুযায়ী মানুষের প্রাণিজ আমিষ চাহিদার ৪৫ শতাংশ এখন পোলট্রি খাতনির্ভর এবং বিনিয়োগ রয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ খাতে আত্মকর্মসংস্থান তথা উৎপাদন আয় বাড়ানোর অপূর্ব সুযোগ রয়েছে। দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৫ লাখ জনশক্তি শ্রমবাজারে যোগ হচ্ছে। আবার শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে এক শতাংশ হারে কমছে আবাদি জমি। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা তথা পুষ্টি নিরাপত্তায় এক অনবদ্য ভূমিকা রাখতে পারে এই পোলট্রি শিল্প।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ২ হাজার ৫৭ কোটি ৬৪ লাখ পিস ডিম উৎপাদিত হয়েছে, যা ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৭৩৬ কোটি পিস। এক বছরের ব্যবধানে ৩০০ কোটির বেশি ডিম উৎপাদিত হয়েছে। কভিডকালেও দেশে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে। বাংলাদেশে মাথাপিছু ডিম প্রাপ্যতার সংখ্যাও বাড়ছে প্রতি বছর। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জনপ্রতি বছরে ডিমের প্রাপ্যতা ছিল ৯২ দশমিক ৭৫টি। ২০২০-২১ অর্থবছরে এটি দাঁড়িয়েছে ১২১ দশমিক ১৮টি।

পোলট্রি খাতের এই উন্নয়নে নারীদের অবদান অনেক। বর্তমানে দেশের ৭০ হাজারের ওপরে পোলট্রি খামার রয়েছে। ২০১৯ সালে ‘পার্টিসিপেশন অব উইমেন ইন কমার্শিয়াল পোলট্রি ফার্মস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা যায়, ৪৭ শতাংশ খামারের আকারই ছোট। এসব খামারে রয়েছে এক হাজারের কম মুরগি। আর ৪৫ শতাংশ মাঝারি। এসব খামারে ১ হাজার থেকে ৩ হাজারের ওপরে মুরগি পালন করা হয়। বাকিগুলো বড়। আর ছোট ও মাঝারি খামারিদের মধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন রয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ খামারির।

পোলট্রি খাতের মাধ্যমে বহু নারীর অর্থনৈতিক বিকাশ সাধিত হয়েছে। পোলট্রি শিল্প তাদের স্বাবলম্বী করছে। সরকারি ব্যাংকে এখন ঋণ পেতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। সরকারি পর্যায়ে ক্ষুদ্রঋণ পেতে এসব ছোট আকারের নারী খামারিরা প্রাধান্য পাচ্ছেন। কভিডকালেও অনেক নারী খামারি সরকারের প্রণোদনা সুবিধা পেয়েছেন।

স্বাস্থ্যবান জাতি ও উন্নত দেশ গড়তে হলে ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদন বাড়াতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার খুবই আন্তরিক। সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে বার্ডফ্লুর মতো সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। দেশে বর্তমানে ছোট-বড় ৭০ হাজারের বেশি পোলট্রি খামার গ্রামীণ ও নগর অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। বিপিআইসিসির সূত্র মতে, দেশের পোলট্রি খামারগুলোতে ২০১৬ সালে যেখানে প্রতি সপ্তাহে লেয়ার, ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির বাচ্চা উৎপাদন ছিল ৯০ লাখ, বর্তমানে তা বেড়ে দেড় কোটিতে উন্নীত হয়েছে। মুরগির বাচ্চা উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে বিগত কয়েক বছর ধরে ১৮ থেকে ২২ শতাংশ হারে ডিম ও মুরগির উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে লেয়ার ও ব্রয়লার উৎপাদন করছে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন খামারিরা এবং সোনালি বাচ্চা উৎপাদন করছে সরকারি মালিকানাধীন পোলট্রি খামারগুলো। সারাদেশের পোলট্রি খামারগুলোতে ২০১৬ সালে যেখানে দৈনিক ১ হাজার ৫১০ টন মুরগির মাংস উৎপাদন হতো, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার টনে। ২০৩০ সাল নাগাদ মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন ৩ হাজার ৩০০ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন অনুযায়ী মানব দেহের শক্তির ৬০ শতাংশ আসে শস্য জাতীয় পণ্য থেকে, ১৫ শতাংশ আসে আমিষ জাতীয় খাদ্য থেকে। প্রাণিজ আমিষ হচ্ছে মাছ, মাংস ও ডিম। বর্তমানে বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ১ জন মানুষ ৭ গ্রাম ডিম এবং ১৪ গ্রাম মুরগির মাংস খেয়ে থাকে। এই সংখ্যাটি হওয়ার কথা কমপক্ষে ১৫ গ্রাম। একটি প্রবাদ আছে ‘সুস্থ খাবার সুস্থ জাতি’। এর জন্য প্রয়োজন পোলট্রি উৎপাদনে জীবাণুমুক্ত ব্যবস্থাপনা। এক সময় এই শিল্পটি ছিল আমদানিনির্ভর, কিন্তু বর্তমানে ক্রমাগত চাহিদার কারণে এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত পোলট্রি খাদ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশই আধুনিক ফিড মিলগুলোতে উৎপন্ন হচ্ছে এবং এই খাদ্যে ব্যবহƒত ভুট্টার প্রায় ৪০ শতাংশ দেশীয় খামারে উৎপাদিত হচ্ছে। দেশের আধুনিক হ্যাচারিগুলোতে যান্ত্রিক উপায়ে প্রতি সপ্তাহে ১ কোটি ১০ লাখ ডিম ফোটানো হয় এবং এই শিল্পের বর্জ্য থেকে তৈরি হয় বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার।

সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক (২০২০-২০২৪) পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। তাছাড়া টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-২০৩০ বাস্তবায়নে জনপ্রতি দুধ, মাংস ও ডিম যথাক্রমে ২৭০ মি.লি, ১৫০ গ্রাম এবং বছরে ১৬৫টি ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়ন এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশে গড়ার লক্ষ্যে বছরে জনপ্রতি দুধ, মাংস ও ডিম যথাক্রমে ৩০০ মিলি, ১৬০ গ্রাম এবং ২০৮টি ধরা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ডিম উৎপাদনের একটি প্রাক্কলন করেছে। সে হিসাব অনুযায়ী ২০৩১ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ডিমের বার্ষিক উৎপাদন হবে প্রায় ৩ হাজার ২৯৩ কোটি ৪০ লাখ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ ৪ হাজার ৬৪৮ কোটি ৮০ লাখ কোটি।

বাংলাদেশে সর্বাধুনিক পদ্ধতিতে মুরগির মাংস প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। পুষ্টির মান বজায় রেখে অনায়াসেই পোলট্রি বাজার রপ্তানিমুখী করা যায়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বেও বিভিন্ন দেশে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি রয়েছে, যাদের কাছে মুরগির মাংস ও ডিম খুব প্রিয়। এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতে বিনিয়োগ হবে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং কর্মসংস্থান এক কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা যায়।

পোলট্রি খাতের উন্নয়নে সরকারের আরও কিছু উদ্যোগ নেয়া দরকার। মুরগির খামার স্থাপন, খাদ্য, টিকা, ওষুধপত্র ক্রয়  প্রভৃতিতে ঋণ দিতে করতে হবে স্বল্প সুদে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি পোলট্রি ফার্মের ৬৫ শতাংশ খরচ হয় মুরগির খাবার ক্রয়ে, যার মূল উপাদান ভুট্টা। ভুট্টার উৎপাদন বাড়াতে পারলে অনায়াসেই ডিম ও মাংসের দাম কমে আসবে। সরকার পোলট্রিকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন প্রতিটি খামারের নিবন্ধন জরুরি। এই দিকগুলো বিবেচনায় রেখে পোলট্রি শিল্পকে সংগঠিত করা গেলে দেশ পোলট্রি শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। পুষ্টির জোগান নিশ্চিত হবে। দেশ পাবে সুস্থ, সবল, স্বাস্থ্যবান এক জাতি। এ বিষয়ে সচেতনতার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন নারী উদ্যোক্তাদের আগ্রহ এবং এগিয়ে আসা।

পিআইডি নিবন্ধ