পাঠকের চিঠি

পোশাক কারখানা মালিকরা কেন হতাশ হবেন!

পাঠকের লেখা

রপ্তানিকারকদের বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় অবদান রাখায় তৈরি পোশাকশিল্প মালিকরা বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু এরপরও চলতি বছর ৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। গতকালই এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকায়।

সংগঠনটি বলছে, নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন, ক্রয়াদেশ সংকট, কারখানার ত্রুটি সংশোধনÑসর্বোপরি আর্থিক অসচ্ছলতায় কারখানাগুলো বন্ধ হচ্ছে।  নিরপেক্ষ কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান পোশাক কারখানা বন্ধের কারণ খতিয়ে দেখতে পারে। হয়তো এমন মালিকও আছেন যারা অন্য ব্যবসায় ঝুঁকেছেন। যারা বন্ধ করে দিয়েছেন তারা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করেছেন কি না, সেটিও আলোচনার বিষয় হতে পারে। তবে আর্থিক অসচ্ছলতার কথা বলে যারা কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন তারা শ্রমিকদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।   

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তুবা গ্রুপের পোশাক কারখানা তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। এতে নিহত হন ১১২ জন শ্রমিক। আহত হন দুই শতাধিক। নিহত, আহত ও নিখোঁজ পোশাকশ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। কিন্তু কোনো ক্ষতিপূরণই একটি জীবনের সমতুল্য নয়। প্রিয়জন হারানোর বেদনা আজীবন বইতে হবে নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনদের। স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও এ দুর্ঘটনা আহতদেরও অনেক দুর্ভোগ বইতে হয়েছে। অনেকে পঙ্গু হয়ে জীবনযাপন করছেন। 

জীবনের আরেক নাম সংগ্রাম। বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পোশাক শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ পেলেও সেটি যথেষ্ট ছিল না। বাসাভাড়া, খাওয়া ও চিকিৎসায় শেষ হয়ে গেছে সব। চাকরি তো নেই। এ অবস্থায় না খেয়ে মারা যাওয়া ছাড়া গতি ছিল না পঙ্গু শ্রমিকদের।  কিন্তু ভেঙে পড়েননি তাজরীনের আহত শ্রমিকরা।

তাজরীন ফ্যাশনসের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি আহত অনেক শ্রমিক। শারীরিকভাবে অক্ষমতার কারণে অনেক কারখানায় ঘুরে চাকরি পাননি তারা। কিন্তু সেটি তাদের স্বাবলম্বী করার প্রেরণা জুগিয়েছে। দৃঢ়প্রত্যয়ী আহত ১০ শ্রমিক কারখানা গড়ে তুলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

নরসিংহপুর বুড়িপাড়া মসজিদসংলগ্ন সরকারবাড়ী সুপার মার্কেটে ছোট কক্ষ ভাড়া নিয়ে কারখানা শুরু করেনÑসবিতা রানী, জরিনা, নাছিমা, বিলকিস, রওশন আরা, আঞ্জুয়ারা, রেহেনা, জাহিদা, আনোয়ারা ও আকাশ মৃধা।

স্থানীয় একটি সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে দুটি পুরোনো প্লেন মেশিন, একটি ওভারলক মেশিন ও বেশ কিছু কাপড় কেনেন। নিজেদের আরও দুটি সেলাইমেশিনও আনা হয় কারখানায়। এরই মধ্যে বেশ কিছু কাজের অর্ডারও পান তারা।

চাকরি না পেয়ে যখন সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিতরা হতাশ হয়ে পড়ে, তখন এই ১০ শ্রমিকের প্রচেষ্টা অনুরণীয় হয়ে থাকবে। এতে অনুপ্রাণিত হতে পারে বেকার তরুণ-তরুণীরা।

পুড়ে যাওয়া মানে মরে যাওয়া নয়, এটিই যেন প্রমাণ করলেন তাজরীন ফ্যাশনসের আহত এই ১০ শ্রমিক। শুধু কি তা-ই, তারা কাজে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তাজরীনের অন্য আহত শ্রমিকদের।

তাজরীনের কর্মরত শ্রমিকরা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শহরে এসেছিলেন কাজ করে স্বাবলম্বী হতে, কারও করুণা নিয়ে বাঁচতে নয়। অগ্নিকাণ্ডে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে তাদের সবকিছু। সরকারি-বেসরকারিভাবে যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, সেটির বড় অংশ ব্যয় হয়ে গেছে চিকিৎসায়।

তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ডে গুরুতর আঘাত পান সবিতা রানী। সাভার সুপার ক্লিনিকে প্রথমে এবং পরে সিআরপিতে দুই মাস চিকিৎসার পরও তার কোমর, মাথা ও মেরুদণ্ডে ব্যথা রয়েছে। কিন্তু তিন মেয়ের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে আর্থিক অনটন ও শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তিনি।

সবিতার মতো একজন নিরীহ কমশিক্ষিত নারী যদি জীবনযুদ্ধে হারিয়ে না যান, তবে আমাদের পোশাক কারখানা মালিকরা কেন হতাশ হবেন! কেন গুটিয়ে ফেলবেন ব্যবসা। সরকার তো তাদের সুবিধা দিয়েই চলেছে।

মরিয়ম বেগম

মিরপুর, ঢাকা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..