প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

পোশাক খাতে গবেষণা: দেশে ৮১% কারখানায় নেই আরঅ্যান্ডডি

জাকারিয়া পলাশ: প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গবেষণাকাজে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশের মাত্র ১৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) বিভাগ রয়েছে। অন্যদিকে পাশের দেশ ভারতে ৫৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের রয়েছে নিজস্ব আরঅ্যান্ডডি। গবেষণায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হার আফ্রিকা অঞ্চলের সমান।

গত নভেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়াস টার্ন’ শীর্ষক কম্পিটিটিভনেস-বিষয়ক রিপোর্টে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্রমতে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মধ্যে কোম্পানি পর্যায়ে ভারতে গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশটির মোট কারখানার ৫৬ শতাংশেরই নিজস্ব আরঅ্যান্ডডি রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে গড়ে ২১ শতাংশ কারখানায় আরঅ্যান্ডডি খাতে বিনিয়োগ আছে। বাংলাদেশের ফ্যাক্টরিগুলোতে এ খাতের বিনিয়োগ রয়েছে গড় সংখ্যারও নিচে মাত্র ১৯ ভাগে। আফ্রিকা অঞ্চলেরও ১৯ শতাংশ কারখানায় আরঅ্যান্ডডি আছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ছাড়া অন্য দেশের এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে সামান্যই। পোশাক খাতের প্রতিযোগী পাকিস্তানে ছয় শতাংশ কারখানায় আরঅ্যান্ডডি আছে। নেপালে রয়েছে চার শতাংশ কারখানায়।
ওই রিপোর্টে বাংলাদেশকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা ও উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেজন্য প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গবেষণা হচ্ছে এর প্রধান উপায়।
এদিকে ২০২১ সালে তৈরি পোশাক খাত থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাই প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তার বলছেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের মনোযোগ দিতে হবে নতুনত্বে। বৈচিত্র্য খুঁজতে হবে পণ্যের গুণে ও মানে। সেজন্য গবেষণা হচ্ছে গুরুত্বপূর্র্ণ বিষয়।
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাদের দেশে কৃষি খাত ছাড়া আর কোনো খাতেই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো খাতসংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সম্প্রসারণে সরাসরি ভূমিকা রাখছে না। বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট খাতগুলোর গবেষণায় মূলত পণ্যের গুণগত মান ও ডিজাইনে নতুনত্ব সৃষ্টির বিষয়ে গবেষণা জরুরি। তৈরি পোশাক খাতে অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানে আরঅ্যান্ডডি আছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই দেখা যাচ্ছে নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন সেল নেই। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব পণ্যের মধ্যে নতুনত্ব আনতে গিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া দেখা যাচ্ছে, ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রোডাক্ট লাইন, কালারসহ বিভিন্ন বিষয়ের গবেষণার কাজ করে দিচ্ছে। এতে ডিজাইনে নিজস্বতা ও অভিনবত্ব তৈরি হচ্ছে না।’
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহ-সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু শেয়ার বিজকে জানান, ‘তৈরি পোশাক খাতের জন্য দুই ধরনের আরঅ্যান্ডডি প্রয়োজন। একটি হলো মান উন্নয়ন ও বৈচিত্র্য আনয়নের জন্য গবেষণা, অন্যটি হলো দক্ষতা উন্নয়ন। আমাদের দেশে পণ্যের মান উন্নয়ন ও বৈচিত্র্য সৃষ্টির কাজে আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০টি কারখানার নিজস্ব আরঅ্যান্ডডি আছে। এছাড়া ১৫০-২০০ কারখানায় দক্ষতা উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন দক্ষ লোক নিযুক্ত করে গবেষণা করছে।’ তবে সুনির্দিষ্টভাবে কতটি কারখানায় আরঅ্যান্ডডি আছে তা জানতে কোনো জরিপ করা হয়নি।
অবশ্য খাতসংশ্লিষ্ট কেউই গবেষণার গুরুত্বের বিষয়টি অস্বীকার করেননি। কিন্তু এর উন্নয়নে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বিজিএমইএ’র সিনিয়র সহ-সভাপতি ফারুক হাসান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘যখন কোনো বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন হয়, তখন আমরা এ বিষয়ে আউটসোর্সিং করি।’
স্টেপ আপ প্রকল্পের পরিচালক ও শিল্প প্রকৌশলী মো. অনিক ইসলাম মনে করেন, ‘এখন অনেক দক্ষ লোক পোশাকশিল্পে আসছেন। ফলে উন্নত মান ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ বাড়ছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে।’
বিশ্বব্যাংকের উল্লিখিত প্রতিবেদন অনুসারে, গবেষণা খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ কম হওয়ায় সফল ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকদের দক্ষতা ও অর্থায়নের মতো বিষয়ে অগ্রগতি কম হচ্ছে।
সাফল্যের ধারাবাহিকতা রাখতে হলে গবেষণা খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টিকে নীতিগতভাবে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয় বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে।
কারখানা পর্যায়ে আরঅ্যান্ডডি কম থাকলেও বস্ত্র খাতের শীর্ষ দুই সংগঠনের গবেষণা সেল আছে। বিজিএমইএ ভবনে আরডিটিআই নামে একটি সেল সার্বিক পোশাক খাতের ওপর গবেষণা করছে। সংগঠনটির সহ-সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘এখানে পোশাকশিল্পের বৈশ্বিক অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি রফতানিসংক্রান্ত তথ্যাবলি পর্যালোচনা করা হয়। এছাড়া আরডিটিআই থেকে অ্যাপারেল স্টোরিসহ বিভিন্ন ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হয়।’
বস্ত্র খাতের অপর সংগঠন বিকেএমইএ’র গবেষণা ও উন্নয়ন সেল (আরঅ্যান্ডডি) রয়েছে। সেখান থেকে জার্নালসহ কিছু নিয়মিত প্রকাশনা বের হয়। তবে দুই সংগঠনের গবেষণা কাজের মধ্যে সার্বিকভাবে কোনো সমন্বয় নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গবেষণার গুরুত্ব সম্পর্কে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) নির্বাহী পরিচালক আলী আহমদ মনে করেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষভাবে গবেষণা করতে পারে না। এজন্য নীতি নির্ধারণসংক্রান্ত বিষয়ে স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার।’

সর্বশেষ..