দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

পোশাক শিল্পের সুনাম রক্ষায় আরএসসিকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে

আবদুল মকিম চৌধুরী: অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা (জিএসপি) যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সবচেয়ে পুরোনো ও বড় বাণিজ্যসুবিধা। এর মাধ্যমে  নিন্ম আয় ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর  বিভিন্ন পণ্য বিনা শুল্কে দেশটির বাজারে ঢোকার অনুমতি পেয়ে থাকে। উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশ এই বিশেষ মর্যাদা হারাবে। তখন অন্য দেশগুলো এ সুবিধা পাবে। উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশের জিএসপি সীমিত হয়ে পড়বে। সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত আমাদের পোশাক শিল্প।

আমাদের পোশাক শিল্পের উত্থানের পেছনে শ্রমিকদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও প্রাণ উৎসর্গ করার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ নিয়ে তৈরি হয়েছে নাটক। ধসে পড়া কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে পোশাক কর্মী তারাভান। গার্মেন্টস দুর্ঘটনার চিত্র নিয়ে তৈরি নাটক ‘ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি’। ২০০৫ সালের এপ্রিলে সাভারের বাইপাইলে ধসে পড়ে স্পেকট্রাম সোয়েটার অ্যান্ড নিটিং ফ্যাক্টরি। সে সময় রাতের পালায় কাজ করা অনেক কর্মী মারা যান। এ ঘটনা অবলম্বনে সংগঠন ‘প্রাচ্যনাট’ তৈরি করে ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি। ভারতের ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার (এনএসডি) আয়োজনে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ২১তম ভারত রঙ্গ মহোৎসবে অংশ নেয় প্রাচ্যনাট।

ভারত রঙ্গ মহোৎসবে ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি মঞ্চায়িত হয়। শুধু মঞ্চায়ন নয়, নাটক নিয়ে আলোচনাও হয় সেখানে। নির্দেশক আজাদ আবুল কালাম ও তারাভান চরিত্রের অভিনয়শিল্পী পারভীন সুলতানা অংশ নেন দর্শকদের প্রশ্নোত্তর পর্বে। উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনেও একটি  প্রদর্শনী হয়। নাটকটি নিয়ে আজাদ আবুল কালামের ভাষ্য: ‘আপাত-আধুনিক এই স্থাপন দখল করা পাবলিক খাল-ডোবা রাতারাতি ভরাট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, মেশিন বসল, রপ্তানিমুখী পোশাক তৈরি শুরু করে দিল। নির্মাণত্রুটির কারণে গভীর রাতে ইমারতটি এক দিকে হেলে হেলে অবশেষে এক ধ্বংসস্তূপ। ব্যাপক তথ্যের যুগে রেডিও, টিভি, সংবাদপত্র প্রভৃতিতে শুধু লাগাতার ধ্বংস, মৃত্যু আর আহাজারির ছবি, তথ্যের বন্যা। তথ্য-ঝড়ের ভেতর ছিল কিছু সযতনে রাখা ‘স্বপ্নমুষ্টি’। কেউ ছুটিতে বাড়ি যাবে, কেউ মাস গেলে মা হবে, হবে বাবা, কেউ সকাল হলেই হলুদবরণ কন্যা সেজে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে। এত সব মানুষের ‘স্বপ্নমুষ্টি’ কেমন আদরে সঞ্চয় করেছিল হৃদয়ের গহিন মণিকোঠায়। এই নয়তলা কংক্রিট ধসে পড়া আদতে লোভী, কুৎসিত কিছু অর্থান্বেষী সারমেয়র বিপরীতে কিছু মানুষের স্বপ্নের অন্তিম যাত্রার প্রতীক হয়। অপূর্ণ সেই স্বপ্ন ধরার চেষ্টা ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি কি রচনা কি নির্মাণে।’

আজাদ আবুল কালাম বলেন, সেখানে প্রতিটি প্রদর্শনীর পরে ‘ডাইরেক্টরস মিট’ আয়োজন হয়। দর্শক, সাংবাদিক, নাট্যকর্মী, এনএসডির শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা আসেন এতে। তারা প্রশ্ন করেন নাটক নিয়ে। দেরাদুনে বাংলাভাষী অনেক লোক ওখানে থাকে। ওখানে একজন রুশ নির্দেশকের সঙ্গে দেখা হয়। নাটকটি দেখে খুব আবেগাপ্লুত হন তিনি। আমাদের বলছিলেন, তিনি কী মেসেজ দেবেন দেশে গিয়ে। কারণ, তারা তো ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা কাপড় পরেন।’

প্রাচ্যনাট ও আজাদ আবুল কালাম সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে দেশকে অনেক এগিয়ে নিচ্ছেন! কিন্তু ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি’র মাধ্যমে দেশের পোশাক শিল্পের একটা নেতিবাচক ব্র্যান্ডিং হয়ে গেল। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পোশাকের ভক্ত রুশ নির্দেশক জানলেন, বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকরা নিগৃহীত, নিষ্পেষিত।

তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ড-রানা প্লাজা ধস আমাদের পোশাক শিল্পে কেমন প্রভাব ফেলেছে, কমবেশি সবাই জানেন। অনেক তদবির, চেষ্টা পরিশ্রমে পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে সেখানে প্রাচ্যনাট কি না ১৫ বছর আগের স্পেকট্রাম ট্র্যাজেডি নিয়ে নাটক করেছে।  

কিছু ঘটনা ভুলে যেতে হয়। ১ জুলাই ২০১৬ রাজধানীর হলি আর্টিজান বেকারির মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নিয়ে নাটক তৈরির আয়োজন চলছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘জনসাধারণের অবগতির জন্য বিজ্ঞপ্তি’ ছাপিয়েছে একটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। হলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ডে নিহত অবিন্তা কবিরের মা রুবা আহমেদের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তিটি ছাপা হয়। তাতে বলা হয়, …অবিন্তার মর্মান্তিক মৃত্যুর পর কয়েকজন নির্দেশক/প্রযোজক মিসেস রুবা আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করে হলি আর্টিজানের কাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে তীব্র আপত্তি জানান তিনি। অবিন্তা কবির ছিলেন তাদের একমাত্র সন্তান এবং তার বেদনাদায়ক মৃত্যু তার পরিবারের সদস্যদের জীবনকে নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তারা প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন। সবার কাছে যা কেবল একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড, তা অবিন্তার মা এবং তার পরিবারের জন্য এক চরম দুর্ভাগ্য এবং নির্মম সত্য; যা তারা প্রতিনিয়ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে বয়ে চলেছেন। হলি আর্টিজানকে কেন্দ্র করে কোনোরূপ মিডিয়া নির্মাণের মাধ্যমে সেসব ঘটনা জনগণের মাঝে প্রচার করলে, তা কেবল সেই দুর্ঘটনার করুণ এবং কষ্টদায়ক স্মৃতিগুলোকেই জাগিয়ে তুলবে, যা অবিন্তার মা এবং তার পরিবার প্রতিনিয়ত ভুলে থাকার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। অতএব সব সম্মানিত প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা, কলাকুশলী, মিডিয়া সংস্থা, মিডিয়া বিতরণকারী সংস্থা, লেখক, স্ক্রিপ্ট লেখকগণকে হলি আর্টিজান ঘটনাকে তুলে ধরে বা এমন কোনো চরিত্রকে বর্ণনা করে যার সঙ্গে অবিন্তা কবিরের প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ সাদৃশ্য রয়েছে, সেই রূপ কোনো প্রকার পূর্ণ বা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, টেলিফিল্ম, নাট, উপন্যাস, গল্প ইত্যাদির রচনা, প্রযোজনা, পরিচালনা, বিতরণ, বিপণন, উপস্থাপন, প্রকাশনা, অভিনয় প্রভৃতি থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও কেউ যদি এমন কোনো কাজে লিপ্ত হন, তা হলে সব লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। 

স্পেকট্রাম ট্র্যাজেডির নিয়ে কোনো রূপ চলচ্চিত্র, নাটক তৈরিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু এ নিয়ে তৈরি কোনো চলচ্চিত্র-নাটক আমাদের পোশাক শিল্পকে বিপর্যস্ত করতে পারে। স্পেকট্রাম দুর্ঘটনার পর সেখানে ছুটে গিয়েছেন বিজিএমইএর তৎকালীন সভাপতি আনিসুল হক। কারখানা মালিকের পক্ষ নিয়ে সেখানে তিনি এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যা সত্য নয়। যেমন ভবন ধসের কিছুক্ষণ আগেও মালিকক এখানে ছিলেন, তিনি মারা যেতে পারতেন। শ্রমিকদের বেতনের কয়েক লাখ টাকা ছিল, সে টাকা পরে পাওয়া যায়নি। বিজিএমইএ সভাপতির এমন বক্তব্যের সমালোচনাও করেছি। কিন্তু ওই কাহিনি নিয়ে নাটক, আবার সেই নাটক ব্যবসায়িক প্রতিযোগী দেশে প্রদর্শন, মেড  ইন বাংলাদেশ নিয়ে প্রশ্ন প্রভৃতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

দেশের রপ্তানি আয়ের চার-পঞ্চমাংশই তৈরি পোশাক থেকে। তাই ব্যবসায়ীদের বিভিন্নভাবে ছাড়, প্রণোদনা দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, এফবিসিসিআইর সভাপতি, মেয়র-এমপি পদে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন পোশাক মালিকরা। অনেকেই বলেন, যে কোনো পরিস্থিতিতে সরকারের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করে নেয় পোশাক মালিকরা। এখন কভিড মোকাবিলায়ও সুবিধা পেয়েছেন তারা।

কভিড অন্য সব খাতের মতো পোশাক খাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সময়মতো কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হবে। নতুবা উৎপাদন ব্যাহত হবে। উদ্যোক্তাদের নিজ খরচে উড়োজাহাজে পণ্য পাঠানো কিংবা বিকল্প উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে। তখন কারখানাগুলোর বাড়তি ব্যয় সংস্থানের জন্য আপৎকালীন তহবিলের দরকার হবে। আবার কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হলে নানা জটিলতা রোধে ব্যাক টু ব্যাংক এলসির নীতিমালায় সংশোধন আনতে হবে। এ ছাড়া বিকল্প উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন হলে বাণিজ্যিক ব্যাংক যাতে উদ্যোক্তাদের সহায়তা অব্যাহত রাখে, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ঋণ নিশ্চয়তা স্কিম দরকার।  শুধু নগদ প্রণোদনা নয়, লজিস্টিক ট্রান্সপোর্ট ও শিপমেন্ট সব দিকেই পোশাক খাতকে সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়, এমন কাজকেও নিরুৎসাহিত করা উচিত। ‘ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি’ পোশাক শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু ঘটনা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বিজিএমইএ সভাপতি  প্রতিদিনই বলছেন,  সময়মতো  শ্রমিকের মজুরি দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। হাত পেতে হলেও শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করতে হবে। সরকার পোশাক কারখানা মালিকদের পাশে দাঁড়াবে কি না, আমরা জানি না। ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য   ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ তহবিলের অর্থ দিয়ে কেবল শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাবে।’ এ খবরে সুযোগসন্ধানী মালিকরা একেবারে ‘কপর্দকহীন’ হওয়ার ভাব করলেন। শ্রমিকদের একটি মাস বেতন দেওয়া অর্থ তাদের কাছে নেই,  যেন ‘দুর্ভিক্ষের আগেই ভিক্ষুক’। গার্মেন্ট মালিক সিন্ডিকেটকে করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর বলে মন্তব্য করেছেন সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমান। ছাচাছোলা ভাষায় বলেছেন, পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনায় মালিকরা ভেবেছিলেন, তাদের সদকায়ে জারিয়ার মতো সরকার দিয়েছে। তাই টাকা পেয়ে শ্রমিকের বেতন দেওয়ার চিন্তা করেন। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৮ এপ্রিল ২০২০)।

পোশাকমালিকদের কাছে শ্রমিকদের জীবনের মূল্য তেমন একটা নেই বলেই শ্রমিদের দাবি। শ্রমিকদের এ দাবি যে নিছক দাবি নয়, সেটি বিভিন্ন সময় জীবন দিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা। এ ক্ষেত্রে সম্ভবত বড় উদাহরণ হলো, তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ড ও রানা প্লাজা ধস।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার প্রথম মাসেই কর্মচারীদের বেতন দিতে গলদঘর্ম হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, এত দিন ভাবতাম তারাই ধনী যাদের অনেক বেশি ব্যাংক ব্যালান্স, ইন্ডাস্ট্রি, ব্যবসা-বাণিজ্য, অনেক বড় চাকরি। কিন্তু করোনার এই দুঃসময়ে দেখি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, বড় চাকরি থাকলেই ধনী হয় না। যারা বছর বছর কোটি কোটি টাকা আয় করার পরও সংকটের সময় নিজেদের কর্মচারীদের বেতন দিতে অন্যের কাছে সাহায্য চান, তারা কিসের ধনী? এত দিনের আয় থেকে যদি নিজের কর্মচারীদের

২-৩ মাসের বেতন দিতে না পারেন, তাহলে কিসের ধনী তারা?…।

পূর্বঘোষণা ছাড়াই কয়েক মাসের বেতন বকেয়া রেখে কারখানা বন্ধ করার প্রতিবাদে বিজিএমইএ ভবনের সামনে প্রায় দিনই বিক্ষোভ করতেন  পোশাকশ্রমিকরা। আজ এ কারখানা তো কাল ওই কারখানা। আশুলিয়া-কাঁচপুর থেকে শ্রমিকরা আসতেন।  মাঝেমধ্যে নিরস্ত্র নিরীহ শ্রমিকদের ওপর হামলাও চলত। ওই বিক্ষোভ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এখন নেই। বিজিএমইএ ভবন হয়েছে উত্তরায়। উড়াল সেতুর কারণে যানজট স্থান বদল করলেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ স্থান বদল করেনি। ব্যস্ত ভিআইপি রোডে তো শ্রমিকদের দাঁড়াতেই পারে না।

সাদা চোখে পোশাক শিল্পের অনেক সীমাবদ্ধতা-অনিয়ম ধরা পড়ে। গবেষণা হলে এ খাত নিয়ে শুদ্ধ হবে, সমৃদ্ধও হবে।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে প্রাণ হারায় সহস্রাধিক শ্রমিক। মালিকদের লোভের ভার সইতে পারেনি ভবনটি। ফাটল ধরা ভবনে কয়েক হাজার কর্মীকে ডেকে আনা হয় কাজে যোগ দিতে। আর জীর্ণ ভবনটি ধসে পড়ে নিরীহ শ্রমজীবীদের ওপর। অবশ্য ওই দিন দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বিবিসিকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছিলেন, ‘দুর্ঘটনার আগে কিছু মৌলবাদী ও বিএনপির ভাড়াটে লোক ভবনটির গেট ও বিভিন্ন পিলার ধরে নাড়াচাড়া করেছিল। ভবনটিকে ধসে পড়ার পেছনে এটিকেও একটি কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।’ 

রানা প্লাজা ধসের পর আমাদের পোশাক কারখানা পরিদর্শন ও মানোন্নয়নে ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও আমেরিকান ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্স  গঠিত হয়। আর যেসব কারখানা বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত না তাদের পরিদর্শন ও মানোন্নয়নের জন্য গঠিত হয় সংস্কার সমন্বয় সেল (আরসিসি)। আরসিসিতে সরকার, আইএলও, ক্রেতা মালিকদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এজন্য সরকার কিছু জনবলও নিয়োগ দেয়। এরপরেই শুরু হয় দেশের পোশাক কারখানাগুলোতে পরিদর্শন ও মানোন্নয়নের কার্যক্রম। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স অনেকগুলো কারখানা পরিদর্শন করে। কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিতে মালিকদের কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়। অন্যদিকে ক্রেতারা পণ্যের দাম কমিয়ে দিতে থাকে। বিভিন্ন কারণে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের বিরুদ্ধে ফুঁসতে থাকেন মালিকরা। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। নানামুখী চাপে ৭ বছর পর বিলুপ্তি ঘটেছে দেশের তৈরি পোশাক কারখানার নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে কাজ করা ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ডের। এর বিকল্প হিসেবে ১ জুন যাত্রা শুরু করেছে ক্রেতা, উদ্যোক্তা ও শ্রমিক শ্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত নতুন জোট আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি)।

অ্যালায়েন্স ২০১৮ সালের ডিসেম্বর কার্যক্রম গুটিয়ে চলে যায়। নতুন এই জোটে থাকছে না আমেরিকান ক্রেতা জোট অ্যালায়েন্স ও সরকারের কোনো  প্রতিনিধি। তাই আরএসসির গঠন ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।  অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের কার্যক্রমে কর্মপরিবেশ, ভবন ও অগ্নি নিরাপত্তা বিষয়ে সব মহলের আস্থা তৈরি হয়েছে। সরকার ও ক্রেতাদের প্রতিনিধিত্ববিহীন আরএসসি কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখবে, সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। তবে পোশাক মালিকদের দায়িত্বশীলতার বিকল্প নেই। কত প্রণোদনা দেবে রাষ্ট্র। সরকারি প্রণোদনা, সুযোগ-সুবিধা পেয়ে পোশাক খাত ক্রমেই সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। সরকার যতই সুবিধা বাড়িয়ে দেয়, পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সেটিকে ‘অপ্রতুল’ আখ্যা দিয়ে আরও সুবিধা চায়। এমন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সরে আসতে হবে। অন্য খাতগুলোকেও প্রণোদনা দিতে হবে। কোনো একক পণ্যে নির্ভরতা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। পোশাক খাতকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব এ খাতের ব্যবসায়ীদেরই। তারা পিছিয়ে থাকতে চাইলে কেউ শিল্পটিকে এগিয়ে নিতে পারবে না। আরএসসি যাতে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্বপালন করে, সে জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..