প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে কঠোর হচ্ছে সরকার

প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা অনুশাসন

ইসমাইল আলী: প্রতি বছর শতাধিক নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। আবার কিছু প্রকল্প শেষ হয়। কিছু প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলতে থাকে। এতে উন্নয়নের প্রকল্পের তালিকা শুধু বড় হয়। বর্তমানে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় প্রকল্প রয়েছে এক হাজার তিনশ’র বেশি। এর মধ্যে কিছু প্রকল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিছু তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ। আবার কিছু প্রকল্প খুবই কম গুরুত্বপূর্ণ।

এরপরও প্রতি মাসে নতুন নতুন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পাঠানো হচ্ছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। এতদিন নতুন প্রকল্প অনুমোদন ছিল খুবই সহজ। ফলে অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রকল্পও অনুমোদন করেছে সরকার। তবে এবার নতুন প্রকল্প অনুমোদনের কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নির্মাণ-পরবর্তী অবস্থা পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এজন্য ১৫ দফা অনুশাসন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত চিঠি সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ‘নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন’ শীর্ষক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট নিদের্শনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি চিঠির অনুলিপি দেয়া হয়েছে দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়েও।

চিঠিতে প্রথম অনুশাসনে বলা হয়েছে, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও কাক্সিক্ষত সুফল প্রাপ্তি বিবেচনায় নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে যথাসময়ে চলমান প্রকল্পগুলোর সমাপ্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ছাড়া অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প যাচাই কমিটি কর্তৃক যথাযথভাবে প্রকল্প প্রস্তাব পরীক্ষা করতে হবে। সক্ষমতা বৃদ্ধি, সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণকর্মীকে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

দ্বিতীয় অনুশাসনে বলা হয়েছে, প্রকল্পওয়ারি বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে সমাপ্তপ্রায় প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, বিশেষ প্রকল্প, বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প, ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প, মেগা প্রকল্প, ফাস্ট ট্র্যাক ও মেগা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সহায়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদনশীলতা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার মতো অপরিহার্য প্রকল্পগুলোয় প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। চতুর্থত, প্রকল্প যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। সম্ভাব্যতা যাচাই কাজে ফার্ম নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে পরীক্ষা করতে হবে। সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে প্রদত্ত সুপারিশের বাইরে নতুন অঙ্গ অন্তর্ভুক্তি নিরুৎসাহিত করতে হবে। অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ডিজাইন যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।

পঞ্চম অনুশাসনে বলা হয়েছে, অর্থের প্রবাহ স্বাভাবিক থাকার পরও ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) অনুযায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। নির্মাণ শেষে ত্রুটিজনিত দায় প্রকল্পের মেয়াদ বা ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ডের বাইরেও প্রতিটি কাজের জন্য সংশ্লিষ্টদের বহন করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা বা ক্ষতিপূরণের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

নতুন প্রকল্প গ্রহণকালে অ্যালোকেশন অব বিজনেস যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই দ্বৈততা পরিহার করতে হবে। সমধর্মী কাজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলো আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির মাধ্যমে প্রকল্প প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের এমটিবিএফ (মধমেয়াদি বাজেট কাঠামো) সিলিংয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলো সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহণ করে প্রকল্পের নিবিড় তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করবে। প্রয়োজনে বিশেষায়িত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সময়ে সময়ে সরেজমিনে পরিদর্শনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) ছাড়াও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সভা যথানিয়মে আয়োজন করে কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয়, মেয়াদ ও সময় বৃদ্ধির প্রবণতা রোধে সচেষ্ট থাকতে হবে।

এদিকে প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ যথাসময়ে শেষ করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া প্রকল্প সমাপ্তির পর ব্যবহƒত যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম, কম্পিউটার ও গাড়ির ইনভেন্টরি করে অর্থ বিভাগ ও প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে হবে। আর প্রকল্প শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে গাড়ি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিবহন পুলে জমা দেয়া নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জলাধার, খাল সংরক্ষণ ও নদী চ্যানেল ইত্যাদি ঠিক রাখার বিষয়েও অনুশাসন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে, বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্বের অবস্থা যাচাই করার জন্য জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ভিডিও ধারণ করবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এসব ভিডিও যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত বিবেচিত হলেই কেবল প্রকল্প গ্রহণ করবে।

নতুন সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একনেক সভায় প্রদত্ত পূর্বের অনুশাসন অনুসরণ করতে হবে। খাল ও নদীর ওপর সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে নেভিগেশন চ্যানেল অক্ষুণœ রাখতে হবে। খাল, নদীর গভীরতা ও প্রশস্ততা বিবেচনায় নিয়ে ও প্রয়োজনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতামত নিতে হবে। সড়কের নির্দিষ্ট দূরত্বে জলাধার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানি জলাধারে নেমে যেতে পারে।

এর বাইরে প্রধানমন্ত্রী আরও কিছু অনুশাসন দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে, এক কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া যাবে না। দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যতীত প্রকল্প পরিচালককে বদলি নিরুৎসাহিত করতে হবে। এছাড়া প্রকল্প সংশোধনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত পরিপত্র যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।