প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

প্রকল্প ব্যয় নির্বাহে আর্থিক অসংগতি

মেঘনার ভাঙন থেকে চাঁদপুরের হরিণা ফেরিঘাট এবং চরভৈরবি এলাকার কাটাখাল বাজার রক্ষা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ দিকে। প্রকল্পের কাজে অনিয়ম আর গোঁজামিলের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। শেয়ার বিজের অনুসন্ধানে এ-সংক্রান্ত নানা তথ্য উঠে এসেছে। এ নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক আয়োজনের আজ ছাপা হচ্ছে শেষ পর্ব

মনির উদ্দিন বেলায়েত সুমন: ‘মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে চাঁদপুর জেলার হরিণা ফেরিঘাট এবং চরভৈরবি এলাকার কাটাখাল বাজার রক্ষা প্রকল্পে’ আর্থিক ব্যয় নির্বাহে নানা অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। নদীতীর রক্ষা প্রকল্পে দায়সারা কাজ করে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও নদীতে খননকাজ বন্ধ রেখে রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাবশালী বালিদস্যুদের সহায়তা করাসহ নামসর্বস্ব কতিপয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রকল্পে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে কাজ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।

সূত্রমতে, ২০১৭ সালের অক্টোবরে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় একনেক। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। প্রকল্পে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বছরভিত্তিক সংস্থান, বরাদ্দ, অবমুক্তি ও আর্থিক ব্যয়বিবরণী তথ্যানুযায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে এডিপি বরাদ্দের পাঁচ কোটি টাকা অবমুক্ত করা হয় এবং প্রকল্পে আর্থিক ব্যয় দেখানো হয় ৩১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে ২৫ কোটি টাকা অবমুক্ত করা হয় এবং আর্থিক ব্যয় দেখানো হয় ২৪ কোটি ৯৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে ১৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা অবমুক্ত করা হয় এবং ব্যয় দেখানো হয় ১৮ কোটি ২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে এডিপি বরাদ্দ দেয়া হয় ৩৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা এবং প্রকল্পে আর্থিক ব্যয় দেখানো হয় ৩৫ কোটি ১৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পে এডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ৬০ কোটি টাকা। প্রকল্পের অনুকূলে অবমুক্ত করা হয় ৪৫ কোটি টাকা এবং প্রকল্পের আর্থিক ব্যয় দেখানো হয় ৪৪ কোটি ৫৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।

প্রকল্প চালুর পর অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী, যাতায়াত ভাতা ৬ লাখ, পেট্রোল ও লুব্রিকেন্ট ১০ লাখ, মুদ্রণ ও প্রচার ৬ লাখ, স্টেশনারি সিল স্ট্যাম্প ৩ লাখ, হাইড্রোলজি ও মরফোলজি জরিপ ভাতা ২৫ লাখ, পিএসসি, পিআইসি এবং টিইসি সম্মানি ভাতা ৩ লাখ, মধ্যবর্তী মূল্যায়ন ১০ লাখ, জরিপ ও অনুসন্ধান ১০ লাখ, বিদ্যমান যানবাহন মেরামত ১০ লাখ, অফিস বিল্ডিং বাংলো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ৩০ লাখ, নদী জরিপ করার যন্¿ ২০ লাখ এবং নদী ড্রেজিং (৭ কি.মি) ৯৮ কোটি টাকা নির্ধারিত হয়।

পরে সংশোধিত ডিপিপিতে নতুন করে ভ্রমণ ব্যয় সংযোজন করা হয়। ভ্রমণ ব্যয় দেখানো হয় ৬ লাখ টাকা। অনুন্নয়ন বাজেট থেকে সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তাদের ভ্রমণ ভাতা বরাদ্দ প্রদান সত্ত্বেও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ভ্রমণ ভাতা অনিয়মিতভাবে ব্যয়ের খাত রাখা হয়।

পেট্রোল ও লুব্রিকেন্টে ১০ লাখ টাকার পরিবর্তে ১১ লাখ টাকা করা হয়েছে। যদিও কভিডকালীন প্রকল্পের তেমন কোনো কাজ হয়নি বলে স্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী।

অন্যদিকে পিএসসি, পিআইসি এবং টিইসি সম্মানি ভাতা ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ করা হয়েছে। অফিস বিল্ডিং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৩০ লাখের পরিবর্তে করা ৪০ লাখ করা হয়েছে। ফলে বাপাউবো অফিস বিল্ডিং মেরামতেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

সূত্র মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রকল্পে অবমুক্ত করা হয় ৩১ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং প্রকল্পে আর্থিক ব্যয় করা হয় ৩১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রকল্পে অবমুক্ত করা হয় ২৪ কোটি ৯৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং প্রকল্পের আর্থিক ব্যয় দেখানো অবমুক্তকৃত টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রকল্পে অবমুক্ত করা হয় ১৮ কোটি দুই লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং আর্থিক ব্যয় দেখানো হয় অবমুক্তকৃত টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে অবমুক্ত করা হয় ৫০ কোটি টাকা এবং ব্যয় দেখানো হয় ৫০ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে অবমুক্ত করা হয় ৫০ কোটি টাকা এবং ব্যয় দেখানো হয় ৫০ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রকল্পের অনুমোদিত অঙ্গ ও অংগভিত্তিক ব্যয় বিভাজন অনুযায়ী প্রকল্পে হাইড্রোলজিকাল ও মরফোলজিক্যাল স্ট্যাডির জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও হয়নি হাইড্রোলজিকাল ও মরফোলজিক্যাল স্ট্যাডি। পাঁচ দরজাবিশিষ্ট প্রগতির জিপগাড়ি ক্রয় খাতে প্রথমত ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংশোধিত ডিপিপিতে জিপ ক্রয় খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে কোটি টাকা। ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি ও প্রাইস কন্টিনজেন্সি খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে কোটি টাকা। টোটাল স্টেশন (ব্যাথিমেট্রিক সার্ভে অব রিভার মরফোলজি) যন্ত্রাংশ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। কেনা হয়নি যন্ত্রাংশ, যা প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহে চরম আর্থিক অসঙ্গতি।

এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য প্রকল্প পরিচালক ও বাপাউবো চাঁদপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেনের অফিসে গেলে তিনি তথ্য দিয়ে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করে নির্বাহী প্রকৌশলী রেফাত জামিলের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলেন।

বাপাউবো চাঁদপুর সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী রেফাত জামিল অভিযোগ অস্বীকার করে শেয়ার বিজকে বলেন, সংশোধিত ডিপিপি, বরাদ্দ অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহ করা হয়েছে। প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়নি। প্রকল্পের কাজ এ বছর শেষ করা যাবে না। ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছি। প্রকল্পে প্রস্তাবিত খননকৃত এলাকা থেকে বালিদস্যুরা কোটি কোটি টাকার বালি উত্তোলনের সময় আপনাদের ভূমিকা কী ছিল? এমন প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি নির্বাহী প্রকৌশলী।