প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

প্রকাশিত সংবাদ বিষয়ে বিকাশের বক্তব্য

দৈনিক শেয়ার বিজে গতকাল ‘অস্বচ্ছ হিসাবের আড়ালে বিকাশে অর্থ লোপাট?’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে বক্তব্য পাঠিয়েছে বিকাশ কর্তৃপক্ষ। গতকাল বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশন্স শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম এক ইমেইল বার্তায় প্রতিবেদনটির বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখা করেন।

বিকাশের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়, ‘দৈনিক সংবাদপত্র শেয়ার বিজে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে মনগড়া মন্তব্য প্রকাশ করে বিকাশের মতো রেগুলেটেড এবং স্বীকৃত অডিট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশকারী স্বচ্ছ একটি কোম্পানির সুনাম ক্ষুণœ করা হয়েছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কারণ ছাড়াই বেড়েছে মোবাইল নেটওয়ার্ক চার্জ।’ এ বিষয়ে বিকাশের বক্তব্য, ‘২০১৮ সালের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসÑএমএফএসের জন্য সেশন বেজড ইউএসএসডি প্রচলন করে। এই মডেলে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরগুলো বিকাশের কাছ থেকে গ্রাহকের প্রতিটি ইউএসএসডি সেশনের জন্য ৯০ সেকেন্ড হিসেবে চার্জ নেয়। ফলে সরকারি এই নির্দেশনা এবং পাশাপাশি গ্রাহক লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার মোবাইল অপারেটরদের সার্ভিস বাবদ ব্যয় বেড়ে যায়।’

‘নতুন ঘোষণা অনুযায়ী এখন বিকাশ-রেভিনিউ পাচ্ছে, এমন সেবার জন্য চার্জ দেয়ার পাশাপাশি ব্যালেন্স চেক করার মতো নন-রেভিনিউ জেনারেটিং সেবার জন্যও মোবাইল অপারেটরদের চার্জ পরিশোধ করছে। বিকাশের ব্যাখা না প্রকাশ করে প্রতিবেদনে অসম্পূর্ণ তথ্য প্রচার করা হয়েছে।’

বিকাশের ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সুবিধা বাড়ানোর কারণে খরচ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে বিকাশ নতুন সেবা সংযোজন করে এবং বিদ্যমান সেবাগুলোর পরিধি বাড়ায়। ক্রমবর্ধমান গ্রাহকের জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সেবা নিশ্চিত করতে বিকাশ ২০১৯ সালে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিবিদদের দিয়ে বিকাশ গ্রাহক অ্যাপের নতুন সংস্করণ এবং বিকাশ এজেন্ট অ্যাপ চালু করে, যা তৈরিতে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে বাংলাদেশের যোগ্য প্রযুক্তি প্রকৌশলীদের নিয়োগ দেয়া হয়। ক্রমবর্ধমান গ্রাহকদের গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করতে কাস্টমার কেয়ারের সংখ্যা এবং সেবার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। একইসঙ্গে বিকাশ বাংলাদেশ ব্যাংকের রেগুলেটেড প্রতিষ্ঠান হওয়ায় মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন রোধকল্পের প্রতিপালন নিশ্চিত করতেও এই খাতে বড় সংখ্যক কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কর্মচারীদের বেতন-সুবিধাদি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মানে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় করা হয়। আবার কাস্টমার কেয়ার এবং অন্যান্য কর্মচারীর প্রয়োজনে এই সময়ে নতুন অফিস-স্পেসও সংযুক্ত হয়েছে, যা পরিচালন ব্যয়ে প্রতিফলিত। ফলে এ খাতের খরচ যৌক্তিকভাবেই বেড়েছে।’

‘প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ও উদ্ভাবনী, যেমন রেমিট্যান্স, অ্যাডমানি, ট্রান্সফার মানি, পে বিল প্রভৃতির মতো যে সেবাগুলো বিকাশ প্রচলন করে, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেশে প্রথমবারের মতো প্রচলন করা হয়। ফলে গ্রাহককে এ সম্পর্কে অবহিত করা এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে জানাতে, এর নিরাপত্তা সম্পর্কে জানাতে বিকাশকে কমিউনিকেশন খাতে ব্যয় বাড়াতে হয়েছে। প্রযুক্তি খাতে গ্রাহকের অভ্যস্ততা তৈরিতে যা একটি স্বীকৃত এবং প্রচলিত প্রক্রিয়া। ফলে এখানেও বিকাশের প্রতি উত্থাপিত অভিযোগ সঠিক নয়।’

আরও বলা হয়, ‘প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে পাঠানো প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ পাঠানো পাঁচটি প্রশ্নের প্রতিটির ব্যাখাসহ উত্তর দেয়া হয়েছে। প্রকাশের সময় প্রতিবেদনে তা প্রকাশিত হয়নি। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে অস্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন-সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়েছেন বিকাশ কর্তৃপক্ষ। বাস্তবতা হচ্ছে বিকাশের এই প্রশ্নের উত্তর ছিল:

‘বিকাশ ব্র্যাক ব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানি ইন মোশন, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অন্তর্গত ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এবং অ্যান্ট গ্রুপের যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত বোর্ডের তত্ত্বাবধানে যথাযথ অডিট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষিত হয়েই তা ব্র্যাক ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়।’

‘বিকাশের আর্থিক বিবরণী আইএফআরএস অনুসারে একটি সত্য এবং ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গি দেয় এবং বস্তুগত বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত। বিশ্বের বৃহত্তম চারটি অডিট ফার্মের একটি ‘কেপিএমজি’-এর সদস্য ‘রহমান রহমান হক’ আমাদের অ্যাকাউন্টস বুক অডিট করে। তাছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক অধীন রেগুলেটেড প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও বিকাশে নিয়মিত অডিট হয়ে থাকে। প্রতিবেদনে বিকাশের উত্তর প্রকাশ করা হয়নি, বরং ঢালাওভাবে বিকাশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে, যা অত্যন্ত অনাকাক্সিক্ষত।’

প্রতিবেদকের বক্তব্য

প্রতিবেদনটি ব্র্যাক ব্যাংকের ২০১৯ সালের নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিকাশ লিমিটেডের আর্থিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। এখানে প্রতিবেদকের নিজস্ব কোনো মন্তব্য ছিল না। প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে সংবাদটি প্রকাশের আগে বিকাশের বক্তব্য জানতে চেয়ে একাধিক ইমেইল আদান-প্রদান হয়। ওইসব ইমেইল বার্তায় উল্লিখিত বক্তব্যর আংশিক জানিয়েছিল বিকাশ কর্তৃপক্ষ। তখন বিভিন্ন খাতে বিকাশের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে হলেও কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য বিকাশ কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করেনি। তালিকাভুক্ত কোম্পানি ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকাশের খাতভিত্তিক ব্যয় জনসম্মুখে প্রকাশ হওয়া উচিত। খাতভিত্তিক ব্যয় বিষয়েই শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে বিকাশ কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কোনো টাকার অঙ্ক অথবা কোন খাতে কত টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, সে বিষয়ে শতাংশীয় হিসাবও জানানো হয়নি। এমনকি তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।

প্রথমবার পাঠানো ছয়টি প্রশ্নের একটি ছিল এক বছরের ব্যবধানে কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে ৪০ শতাংশের ওপর। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এত বেশি ব্যয় বৃদ্ধির কারণ কী? কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর দেয়নি বিকাশ। পরের বার কর্মচারীর সংখ্যা জানতে চাওয়া হলে বিকাশ জানায়, কর্মচারীর সংখ্যা ৭৭৬ থেকে ৯৯৯ জনে উন্নীত হয়েছে। এ হিসাবে জনবল বেড়েছে ২৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। কিন্তু বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পায় ৪০ শতাংশের বেশি। এটির ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হলেও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি বিকাশ।

মোবাইল নেটওয়ার্ক চার্জ ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে প্রায় ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা ফি বৃদ্ধি পাওয়ার কথা বললেও কী পরিমাণ বা কত শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছেÑসে বিষয়ে বিকাশ কিছুই বলেনি। শুধু জানিয়েছে সেবা ফি বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিকাশ ব্যয়ের খাতে ২০১৯ সালে কোম্পানির সাপ্লায়ার বা সরবরাহকারীদের আগাম বাবদ ১৪১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা দেওয়ার কথা জানায়, ২০১৮ সালে যা ছিল মাত্র ৩০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল, পরিচালন লোকসান হওয়ার বছরে অতিরিক্ত ১১০ কোটি ৯০ লাখ টাকা আগাম দেয়ার কারণ কী এবং কাদের এ পরিমাণ অর্থ কী উদ্দেশ্যে দেয়া হয়েছে? কিন্তু বিকাশ এ প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দেয়নি।

বিকাশ ২০১৯ সালে পরিচালন লোকসান দেখিয়েছে ১৪৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। আবার সেই বছরেই তারা আগাম খাতে অতিরিক্ত ১১০ কোটি টাকা দিয়েছে সরবরাহকারীদের। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেয়নি বিকাশ।

এছাড়া আরেকটি প্রশ্ন ছিলÑবিকাশের ২০১৯ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অস্বচ্ছ বলে মনে করেন কি না? অস্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন দিয়ে বিকাশ থেকে কোনো গোষ্ঠী কি অর্থ লোপাট করেছে? এমন প্রশ্নটিও এড়িয়ে গিয়েছে বিকাশ।

বিকাশ কর্তৃপক্ষের কাছে দুই দফায় মোট ১১টি প্রশ্ন পাঠানো হয়। এর মধ্যে প্রথমবার পাঠানো ছয়টি প্রশ্নের সম্মিলিতভাবে গতানুগতিক উত্তর দেয়া হয়। অথচ প্রশ্ন করা হয়েছিল অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করে তথ্যভিত্তিক ও পৃথক আকারে। দ্বিতীয়বার পাঁচটি প্রশ্নের মধ্যে একটির উত্তর দেয়নি বিকাশ। আরেকটি উত্তর দেয়া হয় আংশিক।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..