প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের জাল-জালিয়াতি ফাঁস

পলাশ শরিফ: আইনি জটিলতার কারণে বেসরকারি জীবন বিমা কোম্পানি প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এজিএমের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন আদালত। এর সুযোগ নিয়ে ২০১২ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর আর্থিক তথ্য প্রকাশ করেনি কোম্পানিটি। এ কারণে কোম্পানিটির দায়িত্বশীলদের জাল-জালিয়াতির তথ্যও লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে।
ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য গোপন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি ছাড়া সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ও আর্থিক লেনদেন এবং হাতে থাকা নগদ অর্থের বিপরীতে কোনো তথ্য-প্রমাণ না রাখাসহ কয়েকভাবে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। আদালতের নির্দেশে প্রকাশিত তিন বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটির ভয়াবহ জালিয়াতি ও আইন লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্যালাক্সি ক্যাপিটাল ও আলফা ক্যাপিটাল লিমিটেডের ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিক প্রগ্রেসিভ লাইফ। ২০০৯ সালে প্রায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় আলফা ক্যাপিটালের শেয়ার কিনেছিল কোম্পানিটি। পরের বছর অপর সাবসিডিয়ারি কোম্পানির গ্যালাক্সি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিল প্রায় তিন কোটি টাকা। বিমা আইনে সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের জন্য বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিলুপ্ত বীমা অধিদফতর ও পরে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি না নিয়েই সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে বিতর্কের মুখে পড়েছে প্রগ্রেসিভ লাইফ। বিনিয়োগের পর অনুমতি চাইলেও তাতে সাড়া দেয়নি আইডিআরএ।
এদিকে ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন সময় ওই দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্যালাক্সি ক্যাপিটাল ও আলফা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টকে ঋণ দিয়েছে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স। বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন না নিয়ে শুধু পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তেই ওই ঋণ দেওয়া হচ্ছে। নিরীক্ষক সংস্থার আপত্তির জবাবে এ-সংক্রান্ত কোম্পানির রেজুলেশন ছাড়া কোম্পানিটির দায়িত্বশীলরা আর কোনো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে গ্যালাক্সি ক্যাপিটালের কাছে দুই কোটি ২৭ লাখ টাকা ও আলফা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের কাছে প্রায় ১৪ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। বিমা আইন অমান্য করে দেওয়া ওই ঋণ আদায় নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষকরা।
যাচাই-বাছাই না করে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকায় চট্টগ্রামে ফ্ল্যাট কিনে তার দখল নিয়ে আইনি জটিলতায় পড়েছে প্রগ্রেসিভ লাইফ। সে সঙ্গে হাতে রাখা নগদ অর্থের বিপরীতে কোনো তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেনি কোম্পানিটি।
এদিকে ২০১২ সালের পর থেকে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। ওই বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এক হাজার ১০৬টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কথা জানিয়েছে প্রগ্রেসিভ লাইফ। এর বিপরীতে যাচাই-বাছাইকালে বিভিন্ন ব্যাংকে কোম্পানিটির এক হাজার ২৩টি অ্যাকাউন্টের তথ্য পেয়েছে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান হুদা ভাসী অ্যান্ড কোং। অর্থাৎ, ৮৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য গোপন করা হয়েছে। ওইসব অ্যাকাউন্টের বিপরীতে কোনো তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেনি প্রগ্রেসিভ লাইফ। যদিও ওই অ্যাকাউন্টগুলো অবৈধ লেনদেনে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দীপেন কুমার সাহা রায় শেয়ার বিজকে বলেন, ‘নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে কিছু অসংগতির তথ্য উঠে এসেছে। সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। জালয়াতি হলে যে কোনো সময় মামলা করা হবেÑএমন সিদ্ধান্ত নিয়ে পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অপ্রদর্শিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করা হয়েছে। সে সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরামর্শ মেনে সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগ তুলে নেওয়া হয়েছে। অতীতের জালিয়াতির অভিযোগ ঘুচিয়ে আমরা পরিচ্ছন্নভাবে কাজ করতে চাই। সে অনুযায়ী কাজ করছি; ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে সেই হালনাগাদ তথ্যগুলো পাবেন।’
নিরীক্ষকের আপত্তির পর প্রগ্রেসিভ লাইফের জাল-জালিয়াতি সামনে এসেছে। এ নিয়ে বেশ জল্পনা-কল্পনাও থেমে নেই। একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, পরিচালনা পর্ষদের ইন্ধনে গত কয়েক বছরে কোম্পানিটিতে বড় আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। বিমা প্রিমিয়াম আয় ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাড়িয়ে দেখানোসহ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানিটির সাবেক পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তারা অর্থ সরিয়ে নিয়েছেন। আর সেই জালিয়াতির জন্য গোপন রাখা ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। এসব নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পরিচালনা পর্ষদেও বড় পরিবর্তন এসেছে। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি মামলাও হয়েছিল। অন্যদিকে জাল-জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পর বাধ্য হয়ে বিমা কোম্পানিটির সাবেক পরিচালক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা চিন্তা করছে কোম্পানিটি। সে সঙ্গে নিরীক্ষকের আপত্তিও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়া ও অপ্রদর্শিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করাসহ বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে কোম্পানিটি। কিন্তু তাতেও বিতর্কিত কোম্পানির প্রতি আস্থা ফিরছে না। বরং গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা বাড়ছে। আর এমন জালিয়াতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামনে হলেও রহস্যজনক কারণে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিশোধিত মূলধন ১২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আর মোট শেয়ারের ৫৭ দশমিক ৬২ শতাংশই উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে রয়েছে। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে ১৮ দশমিক ২৯ শেয়ার রয়েছে। আইনি জটিলতায় এজিএম না হওয়ায় ২০১৪ সালের পর থেকে কোম্পানির আয়-ব্যয়, জীবন বিমা তহবিল ও লভ্যাংশসহ কোনো তথ্যই পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। তবে মামলায় অগ্রগতির আগাম তথ্যে চলতি বছরের শুরু থেকে কোম্পানিটির শেয়ারদর তুলনামূলক হারে বাড়ছে। গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে প্রগ্রেসিভ লাইফের প্রতিটি শেয়ার ৯৫ টাকা ২০ পয়সা লেনদেন হয়।

 

সর্বশেষ..