মত-বিশ্লেষণ

প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ও কয়েকটি প্রশ্ন

তৌহিদুর রহমান

আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশ। এ দেশের বড় নদী এবং উপকূলীয় এলাকার পানিতে পাওয়া দারুণ স্বাদের মাছটি ইতোমধ্যে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদফতর ইলিশের জিআই সনদ দিয়েছে। ফলে মাছটির ওপর আমাদের ঐতিহাসিক যে অধিকার তার স্থায়ী স্বীকৃতি মিলেছে, বহির্বিশ্বে দেশের সুনামও বাড়িয়েছে। আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো, বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৬০ শতাংশেরও বেশি মেলে বাংলাদেশের জলসীমায়। শিগগিরই এটি ৮০ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের। সব মিলিয়ে এখনই বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমাদের জলরাশি থেকে পাচ্ছি আমরা। ফলে এ জাতীয় সম্পদ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিঃসন্দেহে। তবে এখানে ইলিশ উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ে কথাগুলো যত সহজে বলা হয়েছে, বাস্তবতা ঠিক ততটা সহজ নয়।

ইলিশ উৎপাদন ব্যবস্থায় এখনও বড় ধরনের উদ্বেগ রয়ে গেছে। এর ব্যাখ্যা দিতে গেলে ইলিশ উৎপাদন ব্যবস্থার সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের বিবেচনা করতে হবে। দেশের বিভিন্ন নদী ও সাগরে পাওয়া জাতীয় মাছ ইলিশ স্বাদে, গন্ধে অনন্য। দেশের গণ্ডি  পেরিয়ে বিদেশেও এর সমাদর রয়েছে। সে কারণে ‘মাছে-ভাতে ভাঙালি’ পরিচয়ও সার্থকতা পেয়েছিল একসময়। দেশের ঘরে ঘরে দেখা মিলত মাছটির। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের নাগালের মধ্যে ছিল ইলিশ। তবে চলতি শতকের শুরুর দিকে এসে সে ধারায় ছেদ পড়ে। নদী ও সাগরে ইলিশের দেখা মিলছিল কালেভদ্রে। জেলেরা দীর্ঘসময় ধরে নদীতে জাল ফেললেও মাছ পাচ্ছিলেন না। হতাশ হয়ে অনেকে পেশা ছেড়েছেন। ইলিশও ‘সবার জন্য’ তকমা ছেড়ে হয়ে যায় ‘বড়লোকের মাছ’।

আশার কথা, আবারও ইলিশের সুদিন ফিরেছে। কয়েক বছর ধরে নদী ও সাগরে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। দামও এখন আর আকাশছোঁয়া নয়। মোটামুটি আয় করা মানুষের হাতের নাগালেই রয়েছে এ মাছের দাম। সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধ করার কারণে সুদিন ফিরেছে। গত কয়েক বছরে এর উৎপাদনও বেড়েছে অনেক। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাঁচ লাখ ১৮ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২১ হাজার টন বেশি। চলতি অর্থবছরে এ উৎপাদনের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে সব পক্ষ আশা করছে। সে হিসেবে সরকারের পদক্ষেপের সুফল মিলছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তবে প্রজনন মৌসুমের সময়সীমা, মাছ ধরা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং এ সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ইলিশের প্রজনন সময় ৯ থেকে ৩০ অক্টোবর ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ ধরা ও সব ধরনের ব্যবসা নিষিদ্ধ করে সরকার। কয়েকদিন আগে সে সময়সীমা শেষ হয়েছে। তবে এবার দেখা গেল, যেদিন নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ হয়, তার পরদিন সকাল থেকেই বাজারে শত শত মন ইলিশ। এর মধ্যে বড় অংশই ডিমওয়ালা। নিষিদ্ধ ঝাটকাও রয়েছে এ তালিকায়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তার সুফল কি পুরোপুরি মিলছে? বাজারে প্রচুর ডিমওয়ালা ও ঝাটকা ইলিশ মেলায় এ ধরনের প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।

মূলত মা ইলিশ যাতে নির্বিঘেœ ডিম ছাড়তে পারে সে জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আর একবারে একটি ইলিশ ১২ থেকে ১৫ লাখ ডিম ছাড়ে। সে হিসাবে ডিমওয়ালা প্রতিটি মা মাছের ডিম ছাড়া যদি নির্বিঘœ করা যায়, তবে কী পরিমাণ ইলিশ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হবে তা না বলে দিলেও চলে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও বাজারে ডিমসহ বিপুল পরিমাণ ইলিশ আসা উদ্বেগজনকই বটে। এর কারণ হতে পারে দুটি। প্রথমত, প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধের সিদ্ধান্ত যাথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি। দ্বিতীয়ত, প্রজনন মৌসুমের যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি সঠিক নাও হতে পারে। এগুলোর কোনো একটিও যদি পুরোপুরি সঠিক হয় তাহলে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তার সুফল পুরোপুরি মিলবে না বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়। যদিও এখন পর্যন্ত দুটি কারণই বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার একদিন পরেই গণমাধ্যমের খবর ছিল, ডিমওয়ালা ইলিশ মাছে সয়লাব বাজার। নিউজগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেক জেলেই স্বীকার করেছেন, তারা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও লুকিয়ে মাছ ধরেছেন। নদী থেকে ইলিশ ধরে তারা বিশেষভাবে সংরক্ষণ করেছেন। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরই তা বাজারে তুলেছেন। ফলে এখানে প্রশ্ন ওঠে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনের যে দায়িত্ব ছিল তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেননি তারা। আবার প্রশাসনের অনেক কর্তাব্যক্তি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অনৈতিকভাবে মাছ ধরা কিংবা ধরায় সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে। তারা যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন কিংবা অনিয়মের আশ্রয় নেন তাহলে এ উদ্যোগ কখনোই পুরোপুরি ফলপ্রসূ হবে না।

প্রসঙ্গক্রমে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। সেটি হলো, দেশে ইলিশ পাওয়া যায় এমন নদীর আয়তন বিশাল। এ বিশাল জলরাশিসমৃদ্ধ বিস্তৃত এলাকায় নজরদারি করার জন্য যে পরিমাণ জনবল প্রয়োজন, স্থানীয় প্রশাসনে তা নেই। এছাড়া সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নে যে পরিমাণ আর্থিক বরাদ্দ থাকার কথা তাও দেওয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়েছে। কথা হচ্ছে, ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে হলে বিশাল জলরাশিতে নজরদারি করা প্রয়োজন। সে জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক জনবল নিয়োজিত করা জরুরি। যদি সরকারি বিদ্যমান জনবল দিয়ে সেটি করা না যায়, তাহলে শুধু ওই সময়ের জন্য অস্থায়ীভাবে জনবল নিয়োগ করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরিমাণ আর্থিক বরাদ্দ রাখাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, জেলেদের ইলিশ মাছ ধরা থেকে বিরত রাখা। তবে তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে কখনোই মাছ ধরা থেকে বিরত রাখা যাবে না। কারণ এটিই তাদের পেশা, মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। প্রশ্ন উঠতেই পারে, মাছ ধরা বন্ধ রাখলে তাদের সংসার চলবে কীভাবে? অবশ্য নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের মধ্যে চাল বিতরণসহ কিছু সহায়তা দেওয়া হয়। তবে সেটি যে পর্যাপ্ত নয়, তা অতীতেও আলোচনায় এসেছে। এছাড়া ওই সামান্য সহায়তাও প্রকৃত জেলেদের নিকট অনেক সময় পৌঁছায় না বলে অভিযোগ উঠেছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হলে এই জায়গাটিতে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিদ্যমান সহায়তার পাশাপাশি তাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখতে হবে। এছাড়া নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এমনও হতে পারে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে তাদেরকেই নজরদারির জন্য সাময়িকভাবে নিয়োগ করা হলো। এতে ইলিশ ধরাও বন্ধ হবে, আবার তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি নিয়ে কথা উঠছে তা হলো, এর সময়সীমা নিয়ে। প্রতি বছর ইলিশের প্রজনন সময় ৯ থেকে ৩০ অক্টোবর ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ ধরা ও ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। তবে এরপরও ডিমওয়ালা ইলিশ বাজারে ওঠায় এটি সঠিক কি না, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। কেউ কেউ বলছেন, আরও ১০-১৫ দিন বৃদ্ধি করতে পারলে হয়তো সব ইলিশই ডিম ছাড়তে পারত। ফলে ইলিশের উৎপাদন বাড়ত আরও বেশি। কয়েক বছর ধরেই এটি বলা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নিষেধাজ্ঞার সময়ের সঠিকতা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, এটি স্পষ্ট। তবে এ প্রশ্নের সবচেয়ে ভালো সমাধান দিতে পারবেন বিশেষজ্ঞরাই।

আমাদের একটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। তা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। এতে প্রকৃতির অনেক কিছুতেই পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ইলিশের প্রজনন মৌসুমেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিয়ে সময়সীমার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিস্তৃত গবেষণা করে দেখতে হবে। প্রজনন মৌসুমের সীমা নিয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিয়ে সময়সীমার কার্যকারিতার বিষয়টি সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, ইলিশ উৎপাদনে কোনো খরচ নেই। শুধু পরিবেশ রক্ষা ও নিয়ম মানলেই চলে। এক্ষেত্রে আমরা যদি নিষেধাজ্ঞার সময়সীমাটা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারি, তাহলে ইলিশের উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধির আশা করাই যায়।

প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ফলে জেলে, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তাÑ সব পক্ষের লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তারপরও নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের মাছ ধরা হতাশাজনক। এতে তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করছে বৈকি। আবার নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দায় সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনও এড়াতে পারে না। এক্ষেত্রে সবার স্বার্থেই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। সে জন্য সবার প্রচেষ্টা থাকা প্রয়োজন। ইলিশ ধরা ও ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের পর্যাপ্ত সহায়তা করার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ নিষিদ্ধ সময়ে তাদের পর্যাপ্ত সহায়তা না করলে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়।

তবে শুধু জেলে, ব্যবসায়ী কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের ওপর দায় চাপালেই হবে না, আমরা যারা সাধারণ ক্রেতা তাদেরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এটা ঠিক যে, স্বাদে-গন্ধে অনন্য ইলিশ মাছ সবসময়ই খেতে চাইবে সবাই। তবে ২০-২৫ দিন এ মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকলেও কিন্তু তেমন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এজন্য নিষেধাজ্ঞার সময়ে সবাইকে যেমন মাছ কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে, তেমনি সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নেও সহযোগিতা করতে হবে। কোথাও অনিয়ম দেখলে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের। আর সবাই সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে আগের মতোই প্রতি বাড়ির রান্নাঘর থেকে আসবে ইলিশের সেই সুপরিচিত ঘ্রাণ।

গণমাধ্যমকর্মী

ঃড়ঁযরফফঁ.ৎধযসধহ১Ñমসধরষ.পড়স r

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..