সম্পাদকীয়

প্রতারণার শঙ্কা দূর করুন

গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘নামমাত্র প্রকৃত মুনাফা: ১৩৬ কোম্পানির শেয়ারে ঠকছেন বিনিয়োগকারী’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। প্রতিবেদনটি বিভিন্ন কোম্পানির প্রকৃত মুনাফার চিত্র তুলে ধরার ধারাবাহিক আয়োজনের প্রথম পর্ব। বৃহৎ বহুজাতিক বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে প্রদত্ত প্রকৃত মুনাফা হার (ইল্ড), মূল্যস্ফীতি তো বটেইÑএমনকি ব্যাংক সুদহারের চেয়েও কম বলে মন্তব্য করা হয়েছে এতে। অথচ এ নিয়ে তর্কের সুযোগ কমই যে, মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক সুদহারের চেয়ে বেশিই হওয়া উচিত ইল্ড। আমাদের প্রতিনিধিদ্বয় কিন্তু জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে ব্যাংকগুলোর গড় সুদ হার ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ আর মূল্যস্ফীতি মোটামুটি সাড়ে পাঁচ শতাংশ। তার মানে, ব্যাংকে ১০০ টাকা জমা রাখলে বছর শেষে তার প্রকৃত মূল্য কমে যাবে ১৭ পয়সা। এ অবস্থায় পুঁজিবাজারে প্রকৃত মুনাফার হার তথা ইল্ড সাড়ে পাঁচ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত বলে সিংহভাগ বিশেষজ্ঞের মত। অথচ শেয়ারবাজারে শক্তিশালী ব্যাংকিং খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের প্রদত্ত ইল্ড ওই ন্যূনতম মাত্রার চেয়েও কম। এ তালিকায় নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও একেবারে নগণ্য নয়। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, ব্যাপক হারে লভ্যাংশ দেওয়ার রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও সব বহুজাতিক কোম্পানির ইল্ড সাড়ে পাঁচ শতাংশের নিচে। দৃষ্টান্ত হিসেবে এক ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকোর হিসাব তুলে ধরাই যথেষ্ট। ২০১৫ সমাপ্ত বছরে কোম্পানিটি ৫৫০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছিল বিনিয়োগকারীদের। এদিকে গত এক বছরে এদের শেয়ার বেচাকেনা হয়েছে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮২ টাকা ৮০ পয়সা দরে। ফলে বলার অপেক্ষা রাখে না, কোম্পানিটির শেয়ারের প্রকৃত মুনাফা হার হচ্ছে ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যা অনাকর্ষণীয় বটে।

এখন কথা হলো, প্রধানত দুটি কারণে আমরা কোম্পানি প্রদত্ত মুনাফার এমন বিপরীত চিত্র নিয়ে শঙ্কিত। প্রথমত. বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে দুই ধরনের গেইন করতে পারেনÑক্যাপিটাল গেইন ও ডিভিডেন্ড গেইন। এখন ব্যাংকে আমানতের সুদের হার যেহেতু আগের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে কমেছে, সেহেতু অনেক বিনিয়োগকারীই শেয়ারবাজারে ছুটছেন। স্বভাবতই বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওই বিপুল লভ্যাংশ দেখে আকৃষ্ট হচ্ছেন অনেকে। দ্বিতীয়ত. ২০১০-১১ সালে বিপর্যয়কারী বেয়ার মার্কেট সূচনার পর থেকে বিনিয়োগ নিরাপত্তার প্রত্যাশায় বহু বিনিয়োগকারী দ্বারস্থ হয়েছিলেন উল্লিখিত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর। তার কারণটা অবোধগম্য নয়। ওই কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর আকর্ষণীয় হারে ডিভিডেন্ড দিয়ে আসছে; অভ্যন্তরীণ আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী ও তারা করপোরেট সুশাসন বজায় রাখে কম-বেশি। ফলে

আগামী দিনেও কোম্পানিগুলো ভালো সুফল দিতে সক্ষম হবে, বিনিয়োগকারীদের কাছে এটাই ছিল কাক্সিক্ষত। কিন্তু নিম্ন প্রকৃত মুনাফার হারে তাদের সে আশা কতটা পূরণ হবে, তা নিয়ে দুর্ভাবনা থেকেই যায়।

এ অবস্থায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) সক্রিয়তা দেখাতে হবে দ্রুত। তাদের খতিয়ে দেখতে হবে, কোনো কারণে বিভ্রান্ত হয়ে বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কি না এবং এর পেছনে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কোনো রকম দায় আছে কি না। থাকলে তাদের বিরুদ্ধে শক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে ঘটনাটি যদি তেমন নাও ঘটে থাকে, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করা দরকার কীভাবে ওই প্রতারণার সুযোগ রোধ করা যায়। বিনিয়োগকারীদেরও সতর্ক করতে হবে তারা সবকিছু ভেবেই বহুজাতিক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছেন কি না। আমাদের পুঁজিবাজারে আলোর রেশ লাগতে শুরু করেছে বলে মনে করেন অনেকে। এখন একে কোনোক্রমেই প্রতারকদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..