প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

প্রতারণা করে সম্পত্তি দখল গড়েছেন বিলাসবহুল ভবন

মহাজোটের প্রভাব খাটিয়ে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে জমি দখল করে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলেন সাবেক সংসদ সদস্য এমএ আউয়াল। সেই জমিতে প্লট বানিয়ে পুলিশ-সেনাবাহিনীসহ সরকারি পদস্থ কর্র্মকর্তাদের কাছে বিক্রি করেছেন। জমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব-মামলার কারণে প্লট কিনলেও মালিকানা ও দখল বুঝে পাচ্ছেন না সাধারণ ক্রেতারা। সে সঙ্গে একই প্লট একাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। সংসদ সদস্য থেকে এমএ আউয়ালের ভূমিদস্যু ও প্রতারক আবাসন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠা নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিকের আজ শেষ পর্ব

জুনায়েদ আহম্মেদ, লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এমএ আউয়ালের বিরুদ্ধে অভিনব কায়দায় প্রতারণা করে অনেক সম্পত্তি দখল ও তথ্য গোপনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে। প্রভাব আর প্রতারণার মাধ্যমে তার নিজ এলাকায় মানুষকে জিম্মি করে গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল বাসভবন।
লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদ থেকে বরাদ্দ দিয়ে তার বাড়ি প্রবেশের প্রায় এক কিলোমিটার অদূরে নিজ নামে তোরণ নির্মাণ করেন, যা কার্যত কারও কোনো উপকারে কখনোই আসেনি। বহুল সমালোচিত হাভেলি প্রপার্টি ডেভেলপমেন্টের পরিচালক ও মেসার্স ইয়ুথ এন্টারপ্রাইজের মালিক তিনি। তার আরেকটি কোম্পানির নাম হাভেলি এনার্জি ও টেকনোলজি প্রাইভেট লিমিটেড।
লায়ন এমএ আউয়াল লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে সিআইবি’র রিপোর্ট অনুযায়ী ঋণখেলাপির কারণে একাদশ সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-১ রামগঞ্জ আসনের সাবেক এমপি লায়ন এম আউয়ালের (জাকের পার্টি) মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মহাজোটের শরিকদল হিসেবে তরিকত ফেডারেশনের তৎকালীন মহাসচিব লায়ন এমএ আউয়ালকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম দুর্নীতি, লুটপাটসহ নানা অভিযোগে বিতর্কিত হয়ে উঠেন এমপি এমএ আউয়াল। পরে তাকে দলের মহাসচিব পদ থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়। সংসদ সদস্য থাকাকালে হতদরিদ্রদের মাঝে ঘর নির্মাণ এবং ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রকল্পে এমএ আউয়ালের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং থাকার যোগ্য হবেন না। আইনে নিষেধ থাকলেও সরকারের সঙ্গে সংসদ সদস্য হিসেবে থাকাকালে সরকারের কাছে ব্যবসা করার প্রস্তাব দেন লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ উপজেলা) আসনের সংসদ সদস্য এমএ আউয়াল। তিনি স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সৌর বিদ্যুতের আওতায় আনার জন্য প্রস্তাব দেন। এক্ষেত্রে তার কোম্পানি হাভেলি এনার্জি ও টেকনোলজি প্রাইভেট লিমিটেড এ কাজ হাতিয়ে নেয়।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে হলফনামায় তিনি রাজধানীর পল্লবীতে ৬৬ শতক জমি, যার মূল্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা ও নিজ গ্রামে ৬০ লাখ টাকা মূল্যের এক তলাবিশিষ্ট ভবন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া হাভেলি প্রপার্টি ডেভেলপমেন্টের পরিচালক ও মেসার্স ইয়ুথ এন্টারপ্রাইজের প্রোপাইটর উল্লেখ করলেও হাভেলি এনার্জি ও টেকনোলজি প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালনার কথা গোপন রাখেন।
এমএ আউয়ালের নিজ গ্রাম রামগঞ্জের ইছাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ নারায়ণপুর এলাকা ঘুরে জানা যায়, ছোট ভাই আবদুস সালাম ইছাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং চাচা আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় পাঠচক্র সদস্য। এমএ আউয়াল ঢাকা মিরপুরে সপরিবারে থাকেন। তার নিজ গ্রামের বিলাসবহুল কোটি টাকা মূল্যের দ্বিতলা বিশিষ্ট বাড়িতে শুধু জিল্লুর রহমান নামে এক ইমাম থাকেন। তবে এমএ আউয়ালের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের নন্দনপুর, সাতারপাড়া, আউগানখিল, গাজীপুর, কমরতলা, কমরদিয়া, পশ্চিম ভাদুর, পশ্চিম আঙ্গারপাড়া, বিঘা, কাজিরখিল, আশার কোটা, শিবপুর, নয়নপুর, নারায়ণপুর, শ্রীরামপুর, চণ্ডীপুর, কাশিমনগর, কালিকাপুর, পশ্চিম শোশালিয়া, আলীপুর, পশ্চিম করপাড়া, পূর্ব করপাড়া, রতনপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সারা দেশে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও এমএ আউয়াল সংসদ সদস্য হওয়ার পর রামগঞ্জে লুটপাটের ছোঁয়া লেগেছে। এমপি হওয়ার পর রাস্তাঘাট, বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানসহ জনকল্যাণমূলক কাজের দিকে তিনি নজর দেননি। বরং জেলা পরিষদ থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে নারায়ণপুর গ্রামে তার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে একটি তোরণ নির্মাণ করেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেখানে সৌজন্যে তার নাম ব্যবহার করেন।
নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৬ এপ্রিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য এমএ আউয়ালকে তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিবের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ইছাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুস সালাম জানান, এমএ আউয়াল ঢাকায় সপরিবারে থাকেন। এর চেয়ে বেশি কিছু তিনি বলতে রাজি হননি।

 

সর্বশেষ..