দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

প্রতিটি মহামারিতে মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে

সাধন সরকার: মহামারির ইতিহাস সবসময় বেদনাদায়ক। মহামারি এসেছে যুগে যুগে। প্রতিটি মহামারি মানবজাতিকে কোনো না কোনো শিক্ষা দিয়ে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা যে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না! করোনা মহামারির বৈশ্বিকসংকটেও উন্নত দেশগুলোর মধ্যে একে অন্যকে বাণিজ্যযুদ্ধে পেছনে ফেলার চেষ্টা থেমে নেই! করোনাভাইরাস দুনিয়ায় কেন আগমন ঘটল তার আত্মজিজ্ঞাসা ও কারণ বিশ্লেষণ করা জরুরি। মানবজাতি কি কোনো মহামারি থেকে শিক্ষা নিয়েছে? আধুনিক বিশ্বে ১৬৬৫ সালে ‘বুবোনিক প্লেগ’ ছড়িয়ে পড়ে লন্ডনে। ধারণা করা হয়েছিল প্রাণী থেকে ছড়িয়ে ছিল এই রোগ। তারপর ১৮১৭ সালে রাশিয়া থেকে পানিবাহিত রোগ কলেরা ছড়িয়ে পড়ে। সারা পৃথিবীতে কলেরায় তখন কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। ১৮৫৫ সালে চীন থেকে ছড়িয়ে পড়ে মহামারি প্লেগ রোগ। এই মহামারি শেষ না হতেই ১৮৮৯ সালে শুরু হয় রাশিয়ান ফ্লু। ভয়াবহ এই ফ্লু ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের দেশগুলোয়। মারা যায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ। ১৯১৮ সালে দেখা দেয় শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ মহামারি। নাম স্প্যানিশ ফ্লু। সারাবিশ্বে মারা যায় প্রায় ৫ কোটি মানুষ। ১৯৫৭ সালে চীন থেকে ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ান ফ্লু। এতে মারা যায় এক লাখেরও বেশি মানুষ। এরপর এইডস, ইবোলা, নিপাহ, মার্স, সোয়াইন ফ্লু, সার্সসহ সাম্প্রতিককালের ভাইরাসের আবির্ভাব তো আছেই। ইতিহাস বলে, পৃথিবীতে আসা মহামারি ভাইরাসের প্রায় ৭০ ভাগই কোনো না কোনোভাবে প্রাণী থেকে ছড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ছোঁয়াচে রোগগুলোর ৬০ ভাগের বেশি এসেছে বিভিন্ন প্রাণী থেকে। প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতাই যুগে যুগে প্রাণঘাতী ভাইরাস তৈরির উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি কেন এত অত্যাচার? যাচাই-বাছাই না করে প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়ন কিসের জন্য? অমূল্য সম্পদ মাটির প্রতি কেন যথেচ্ছাচার? প্রকৃতিবিনাশী কর্মকাণ্ড করে কেন জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তনকে বরণ করে নেওয়া হচ্ছে? প্রশ্ন হতেই পারে, জীবাণু অস্ত্রের প্রতিযোগিতা মানবজাতির জন্য কি হুমকিস্বরূপ নয়? দূষণে কেন প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি? পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজন বনের আয়তন কেন কমে যাচ্ছে? বাছবিচারহীনভাবে কেন বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে? এসব কারণে প্রকৃতি মানবজাতির সঙ্গে অভিমান করেছে। আর এসব কারণেই হয়তো বা বর্তমান সময়ে মহামারির মতো বৈশ্বিক সংকটের শুরু! পৃথিবীতে যত মহামারি ও রোগব্যাধির আবির্ভাব ঘটে তা প্রকৃতি বিরুদ্ধতারই ফল। ভারসাম্য জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশে রোগের বিস্তার কম হয়। জীববৈচিত্র্যই কোনো না কোনোভাবে বাস্তুতান্ত্রিক সেবা দেওয়ার মাধ্যমে পৃথিবীতে মানবজাতিকে টিকিয়ে রেখেছে। ১৯৯২ সালের ধরিত্রী সম্মেলনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে! প্রকৃতি লোভী ও যুদ্ধবাজ মানুষদের পছন্দ করে না। বন্যপ্রাণী হত্যা ও এর ওপর অত্যাচারের ফলে প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বনভূমি ধ্বংসের ফলে পৃথিবী থেকে অনেক বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেক বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার পথে। এই পৃথিবী শুধু মানুষের নয়, সব সৃষ্টির মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে জীবনযাপন টেকসই হয় না। করোনাকালের এই বৈশ্বিক সংকট থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। করোনায় পশুপাখিও আক্রান্তের খবর মিলেছে। বাঘ, বিড়ালও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। করোনার মধ্যে ফসলবিনাশী পোকা পঙ্গপালের আক্রমণ কম আতঙ্কের বিষয় নয়!

সার্বিক বিচারে করোনাকালে দুই ধরনের পরিবর্তন ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। একটি হলো অর্থনৈতিক পরিবর্তন, অপরটি হলো প্রাকৃতিক পরিবর্তন। বিশ্বব্যাপী অধিকাংশ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কলকারখানা বন্ধ থাকার ফলে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও প্রকৃতি যেন ঠিক ততটাই ইতিবাচক! করোনাকালে চারপাশের স্থবিরতায় প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন আপন মনে লীলা করছে পৃথিবীর সঙ্গে! মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ নিয়ে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে নেই কোনো রেষারেষি! ভিন্নভাবে চিন্তা করলে করোনা যেন প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে! অপরূপ সাজে সেজেছে প্রকৃতি! সৈকতের পাড়ে ডলফিনগুলো পেয়েছে অবাধ স্বাধীনতা! পৃথিবীর বড় বড় শহরগুলোর আকাশে নেই চিরচেনা কোনো দূষণ। শহরের আকাশজুড়ে যেন নীল রঙের ছড়াছড়ি! গোটা পৃথিবীর পরিবেশ যেন বদলে গেছে। শহরে বায়ুদূষণ নেই, নেই শব্দদূষণও। প্রভাতে পাখির কলরব অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। গাছপালাগুলো যেন নতুন সাজে সেজেছে। প্রকৃতিজুড়ে যেন সবুজ রং খেলা করছে। গাড়ির কালো ধোঁয়া নেই, বাতাসে নেই ভারী সিসা। পেট্রোল পোড়া গন্ধ নেই। পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনও যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বিভিন্ন নদী-খালে এখন বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ। বড় বড় দুর্যোগ থেকে বাঁচিয়েছে সুন্দরবন। রক্ষাকবচ হিসেবে সুন্দরবন সবসময় আমাদের সহায় হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর কত অত্যাচার! সুন্দরবন যেমন আমাদের রক্ষা করছে, তেমনি সুন্দরবনকেও রক্ষা করতে হবে আমাদের। করোনাকালে পর্যটকশূন্য সুন্দরবনে জেগে উঠেছে প্রাণ-প্রকৃতি। করোনাকালে স্থবির হয়ে পড়া পৃথিবীর মানুষগুলো যখন ঘরে বসে নিজেদের সুরক্ষা করছে ঠিক তখনই প্রকৃতি যেন নিজের মতো করে তার রূপ পরিগ্রহ করছে। বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের দূষণ নেই। নেই শিল্প-কারখানাগুলোর তরল দূষণও। ওজোন স্তরের ক্ষয়ের সম্ভাবনাও এখন ক্ষীণ! জীবাশ্ম জ্বালানির দহন ছাড়া পৃথিবী কেমন হতে পারে তার একটা চিত্র পৃথিবীতে এখন দেখা যাচ্ছে। এ যেন এক জীবাশ্ম জ্বালানিহীন নতুন পৃথিবীর ছবি। করোনাকালে হঠাৎই পৃথিবীর নদ-নদী, খাল-দ্বীপসহ সার্বিক প্রকৃতি-পরিবেশের পুরো চিত্রে যেন ইতিবাচক বদল ঘটেছে। পৃথিবীর বড় বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যেমন চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ভারত, জার্মানি পৃথিবীর মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে বলা যায়, করোনার কারণে গত চল্লিশ বছরে এখনকার মতো চীনে এত কম কার্বন নিঃসরণ হয়নি। বায়ু দূষণমুক্ত চীন শহর দেখেছে এ প্রজšে§র তরুণরা! দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের হার একেবারেই কম। কিন্তু তাই বলে জলবায়ুগত দুর্যোগ উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোই জলবায়ুগত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। উন্নত দেশের কার্বন নিঃসরণের বলি হচ্ছে পুরো বিশ্ব!

করোনা মহামারির কারণে এক বছরের জন্য পিছিয়ে গেল ‘জলবায়ু সম্মেলন’ (কপ-২৬)। ২০২০ সালের জলবায়ু সম্মেলন হবে ২০২১ সালে। এটা দুঃসংবাদ বটে। কেননা প্যারিস চুক্তির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল এ সম্মেলনে। বর্তমান পৃথিবীর প্রধান সমস্যা নিয়ে হেলাফেলা করার কোনো সুযোগ নেই। প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং পরিবেশের ক্ষতিসাধন না করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা গেলে তা উন্নত ও উন্নয়নশীল যে কোনো দেশের জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি বয়ে আনে। সবুজ প্রবৃদ্ধি বা অর্থনীতির মূল কথা হলোÑমানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত হবে, অভাব দূর হবে কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি হবে না। সমগ্র পৃথিবীতেই জলবায়ুগত দুর্যোগের প্রভাব আজ দৃশ্যমান! যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের মূল হোতা পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো! করোনাভাইরাস চীনের উহানের ল্যাব থেকে ছড়িয়েছে নাকি প্রকৃতি-পরিবেশের বিপর্যয়ের ফল সেটা নিয়ে তর্ক থাকলেও এ ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই যে, প্রকৃতি-পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে পৃথিবী নামক এই ছোট্ট গ্রহে মানুষের বসবাস আজ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন! প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে নয়, সহাবস্থান করে এগিয়ে যেতে না পারলে কোনে৬া উন্নয়নই টেকসই হবে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আমাদের সে শিক্ষায় দিয়ে যাচ্ছে! করোনাকালে পৃথিবীর প্রকৃতি-পরিবেশের যে অভাবনীয় ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তা অর্থের বিচারে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। ধারণা করা হচ্ছে, সবকিছু স্বাভাবিক হলে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যাপক চাপ পড়বে প্রকৃতি-পরিবেশের ওপর! তবে এটা আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে যে, প্রকৃতিকে আমরা যেমনটা দিব অনুরূপভাবে প্রকৃতিও আমাদের তেমনটাই ফেরত দেবে। ১৯৮৬ সালে ইউক্রেনের চেনরোবিলের পারমাণবিক দুর্ঘটনার কথা সবার জানা। ভয়াবহ এই তেজস্ক্রিয় দূষণে সমগ্র ইউক্রেন যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল! এখনও পর্যন্ত চেনরোবিলে বসবাসের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবুও সেখানে প্রকৃতি নিজেই তার শূন্যস্থান পূরণ করেছে। চেনরোবিলে এখন বন্যপ্রাণী অবাধ বিচরণসহ প্রাণ-প্রকৃতির সুন্দর মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। আর তা সম্ভবপর হয়েছে প্রকৃতিকে নিজের হাতে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে। সুুতরাং প্রকৃতি অনেক সময় নিজের ক্ষতি নিজেই পূরণ করতে সক্ষম হয়! তবে শুধু প্রকৃতি ভালো রাখলেই হবে না, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে মানুষের জীবন-জীবিকাও সচল রাখতে হবে। প্রকৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মানুষ। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সার্বিক অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখা যেমন দরকার, তেমনি প্রকৃতিও রক্ষা করা দরকার। পৃথিবীকে বাসযোগ্য করতে হলে এবং ভবিষ্যৎ প্রজšে§র কথা ভেবে বর্তমান বাস্তবতায় পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলায় সবুজ অর্থনীতির অঙ্গীকার সবচেয়ে বেশি জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবছর এর ব্যবহার বাড়ানোর প্রতি জোর দিতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেই এগিয়ে যেতে হবে, তা না হলে হয়তো করোনার মতো ভয়াবহ আবার কোনো দুর্যোগ এসে অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিয়ে প্রকৃতিকে জাগিয়ে তুলে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান করার শিক্ষা দিয়ে যাবে।

কলাম লেখক

সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

ই-মেইল: [email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..