মত-বিশ্লেষণ

প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি রাষ্ট্র এখন অত্যন্ত মানবিক

শান্তনু শেখর রায়: গাজীপুর শহরের বাড়ইবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী শারীরিক প্রতিবন্ধী তৃষা ভৌমিক। ভাদুন বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে এ বছর পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে সে। তৃষার দুটি হাত নেই। সে ডান পা দিয়ে লেখে। পোশাক কারখানার শ্রমিক তপন চন্দ্র ভৌমিকের মেয়ে তৃষা। তৃষার মা জানান, তৃষা দুই হাতবিহীন অবস্থায় জন্ম নেয়। প্রতিবেশী শিশুদের দেখে তৃষা পড়াশোনায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে পা দিয়েই লেখা শুরু করে। তারপর তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। তৃষার পায়ের লেখা খুবই ভালো। ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে তৃষা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায় বহুদূর। প্রতি শুক্রবার গাজীপুর শিল্পকলা একাডেমিতে ছবি আঁকাও শিখছে মেধাবী তৃষা। প্রতিবন্ধী ভাতা ও উপবৃত্তির টাকা দিয়েই তৃষার পড়াশোনার খরচ চলে।

বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় শতভাগ। তবে প্রতিবন্ধী শিশুদের মধ্যে মাত্র ১১ শতাংশ একাডেমিক লেখাপড়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। স্পষ্টই বোঝা যায়, শিক্ষায় প্রতিবন্ধী শিশুরা বেশ পিছিয়ে। তবে প্রতিবন্ধী ভাতা, উপবৃত্তি ও প্রতিবন্ধী শিশুদের উপযোগী স্কুল তৈরি প্রবৃতি সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে প্রতিবন্ধী শিশুরা শিক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে এবং দিন দিন তাদের লেখাপড়ার হার বাড়ছে।

এমনই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কক্সবাজার জেলার অরুণোদয় স্কুল। পাহাড়ের কোলঘেঁষে অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে স্কুলটি, যা প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আট হাজার ৫০০ বর্গফুটের সুবিশাল ভবন, উম্মুক্ত খেলার মাঠ, বাগানসহ প্রায় ৭০ একর জমির ওপরে গড়ে উঠেছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০১৮ সালে স্থাপিত হওয়ার দিন থেকেই পূর্ণ উদ্যমে ক্লাস শুরু হয়। স্কুলে শিশুদের কলরবে যেন মুখরিত পুরো এলাকা। কক্ষের পুরো ফ্লোরেই কার্পেট বিছানো, যার পুরোটাই বিভিন্ন রঙে ও বিভিন্ন আকৃতিতে ডিজাইন করা। একেকটি কামরা দু’ভাগ করা হয়েছে কাচের গ্লাসের পার্টিশন দিয়ে। শিশুরা ফ্লোরে বসে যেখানে খেলে, সেপাশে শিশুদের প্রিয় ‘মিনা কার্টুন’ থেকে শুরু করে শিশুসুলভ নানা চিত্র আঁকা রয়েছে। ফ্লোরে আছে বিভিন্ন রকমের খেলার সামগ্রী। অটিস্টিক শিশুরা ইচ্ছামতো খেলে। কেউ রংতুলি দিয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করে, আবার কখনও-বা কাক্সিক্ষত ফল না পেয়ে উত্তেজিত হয়ে ওগুলো ছুড়ে ফেলে এদিক-ওদিক।

পুরো বিষয়টি কাচের দেয়ালের ওপার থেকে প্রত্যক্ষ করেন একজন শিশু মনোবিজ্ঞানী। মাঝখানের কাচের দেয়ালটির একটি বৈশিষ্ট্য হলো, শিশুদের দিক থেকে কারও দৃষ্টি কাচের দেয়ালের অন্যপাশে যায় না, কিন্তু কাচের বিপরীত দিক থেকে শ্রেণিকক্ষে শিশুরা কী আচরণ করছে, তা দেখা যায়। শিশুদের আচরণের ভিত্তিতেই তিনি একেকটি শিশুর চিকিৎসা ও পাঠক্রম তৈরিতে সহযোগিতা করে থাকেন। শিশুদের শ্রেণিকক্ষেই তাদের যথাযথ শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হয়ে থাকে। এখানে শিশুদের সঙ্গে তাদের মায়েরাও অংশ নিয়ে থাকেন। শিক্ষকরা জানান, প্রথমত এ ধরনের শিশুরা মাকে ছাড়া থাকতে চায় না। দ্বিতীয়ত, পরিবারে অটিস্টিক শিশুদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করলে শিশুদের অবস্থার উন্নতি হয়, সে বিষয়েও অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হয়।

এ ধরনের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা খুব অল্পতেই রেগে যায়, কখনও কখনও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তাদের মেজাজও থাকে খিটমিটে। অনেক মা তার শিশুকে শাসন করেন, গায়ে হাতও তোলেন। এখানে শিক্ষকরা শিশুদের রাগ প্রশমনে কী ধরনের আচরণ করা দরকার তা বুঝিয়ে দেন। এসব শিশু ও তাদের অভিভাবকদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক। তিনি জানান, তাদের অনুসন্ধানে প্রায় ২৬ হাজার প্রতিবন্ধী আছে কক্সবাজার জেলায়। তাদের ভেতর থেকে ১৭৫ প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুকে এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শুধু শিশুদের নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সব অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধীদের এ কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। জেলা প্রশাসন, সুইস রেডক্রস, ব্র্যাক ও কারিতাস এই অরুণোদয় স্কুলকে সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘প্রয়াস’ নামে একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান অরুণোদয় স্কুলের মনোবিজ্ঞানীদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ও এ স্কুলকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা প্রদান করছে।

প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি রাষ্ট্র এখন অত্যন্ত মানবিক। এ বছর বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র অভিভাবকহীন অটিস্টিক শিশুদের দায়িত্ব নেবে। বাবা-মায়ের অবর্তমানে রাষ্ট্র তাদের লালনপালন করবে। অটিজমসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী শিশুর বেঁচে থাকা এবং তাদের মেধা ও যোগ্যতা প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ফাউন্ডেশন ও ট্রাস্ট গঠনের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমনভাবে এগুলো চালু করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সেগুলো বন্ধ করতে না পারে।

সরকারের সমাজসেবা মন্ত্রণালয়, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন প্রতিবন্ধীদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দেশে কর্মরত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এনজিও প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করছে। প্রতিবন্ধীদের অধিকার সংরক্ষণে সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ‘প্রতিবন্ধী অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ পাস করা হয়েছে। ‘নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩’ নামে আরেকটি আইন করা হয়েছে।

প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি ও তাদের জন্য অবকাঠামোগত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিবন্ধী শিশুরা যাতে সাধারণ শিশুদের সঙ্গে মিশতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিবিড় শিক্ষা গ্রহণের জন্য প্রত্যেক প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং চালু করা হয়েছে অটিজম কর্নার। প্রতিবন্ধিতা-সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে। নীতিমালার আওতায় দেশের ৫০টি বিদ্যালয়ে প্রায় ১০ হাজার প্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রী পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া অটিস্টিকসহ প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার জন্য প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে বিশেষায়িত প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করবে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে। স্কুল প্রতিষ্ঠায় এরই মধ্যে সার্ভে করে ম্যাপিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিশেষ বা একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম, অটিস্টিক শিশুদের বিনা মূল্যে বিভিন্ন সেবা প্রদান, অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ইনস্টিটিউট অব নিউরো ডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম প্রতিষ্ঠা, প্রতিবন্ধীদের বিনা মূল্যে ফিজিওথেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসা প্রদানের জন্য ৬৪ জেলায় ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবাকেন্দ্র স্থাপন, ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে ঘরে বসে প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন সেবা গ্রহণে সরকারের পদক্ষেপসহ সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা রাখা প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারের বড় উপহার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যাবিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান সায়মা ওয়াজেদ হোসেনের উদ্যোগে দেশে অটিজমসহ প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অটিস্টিক শিশুরা বিষেশায়িত স্কুলে লেখাপড়া করার সুযোগ পাবে। বিশেষায়িত স্কুলে লেখাপড়ার পর দেশের মাধ্যমিক স্কুলে একীভূত শিক্ষার আওতায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারবে তারা।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়ের নিরলস প্রয়াসে দেশে প্রতিবন্ধীদের প্রতি মানুষের ধারণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। তিনি মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, প্রতিবন্ধিতা কোনো অভিশাপ নয়, উপযুক্ত শিক্ষা ও সুযোগ পেলে তারাও সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অবদান রাখতে পারে। সরকার প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করলে কোনো অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশু অবহেলিত থাকবে না এবং তৃষার মতো সব শিশু শিক্ষার সুযোগ পাবে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..