প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

‘প্রতিষ্ঠানের উন্নতি-অবনতির পেছনে ভূমিকা রাখে মানবসম্পদ বিভাগ’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার স্নোটেক্স আউটারওয়্যার লিমিটেডের মানবসম্পদ ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের ডিজিএম এএইচএম কামরুজ্জামান চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

এএইচএম কামরুজ্জামান চৌধুরী স্নোটেক্স আউটারওয়্যার লিমিটেডের মানবসম্পদ ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের ডিজিএম। স্নাতক শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। পরে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এমবিএ ও স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। এছাড়া ইন্টারনাল অডিটর, লিড অডিটর ট্রেনিং কোর্সসহ কিছু পেশাগত কোর্স সম্পন্ন করেছেন তিনি

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ার গড়ার পেছনের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই…

এএইচএম কামরুজ্জামান চৌধুরী: ক্যারিয়ার শুরু করি ১৯৯৪ সালের শেষদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটা কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে। স্টোর সহকারী হিসেবে যোগ দিলেও কাজের ফাঁকে পারসোনাল অফিসার হিসেবে সকাল ও ছুটির সময়ে নানা কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আট মাস পর একটি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানে যোগ দিই। ছয় মাস কাজ করার পর মামার সঙ্গে ব্যবসা শুরু করি। ব্যক্তিগত কারণে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসি। দেশেই পারসোনাল অফিসার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তা করি। কিছুদিন পর চট্টগ্রামে একটি গার্মেন্টে টাইমকিপার হিসেবে কাজ শুরু করি। ১৯৯৭ সাল থেকে আমি ওই প্রতিষ্ঠানে টাইমকিপার হতে পারসোনাল ম্যানেজার হই। ২০০৪-এর মে মাসে চাকরি ছেড়ে দিই। ২০০৪ সালের জুনে ঢাকায় আসি। তখন এইচআর ম্যানেজার থেকে এখন ডিজিএম (এইচআর অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স) হিসেবে স্নোটেক্স আউটারওয়্যার লিমিটেডে কাজ করছি। এর মাঝে ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন (এইচআরএম), ইএমবিএ’র (এইচআরএম) পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্যারিয়ার উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে এইচআরকে কেন বেছে নিলেন?

কামরুজ্জামান চৌধুরী: শ্রমিকদের কর্মঘণ্টার হিসাব রাখা, যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করাই এক সময় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার কাজ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রয়োজনের তাগিদে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাজের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। আজ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রথাগত পারসোনাল ম্যানেজমেন্ট থেকে ভিন্ন। বর্তমানে এ বিভাগে কর্মরতরা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানের পাত্র। তাছাড়া বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন বাংলাদেশেও এ পেশার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে চলছে। তাই ইচ্ছে থাকলে এ পেশায় যথেষ্ট কাজের সুযোগ আছে। মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকতে ওই স্বল্পপরিসরের কাজকে ঘিরে আমার মধ্যে যে ভালোলাগার জন্ম নিয়েছিল সে ভালোলাগা থেকেই এ পেশায় আসা।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন…

কামরুজ্জামান চৌধুরী: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে এইচআরের ভূমিকা অপরিসীম। কারণ, তিনি কর্মচারীদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলেন। কাজের পরিধি বিন্যাস করে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহযোগিতা করেন। তাই প্রতিষ্ঠানের উন্নতি কিংবা অবনতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখে মানবসম্পদ বিভাগের কার্যক্রম।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে এইচআর ম্যানেজারের জন্য কেমন চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

কামরুজ্জামান চৌধুরী: অনেক সময় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা এবং আইনি চাহিদাগুলোর মাঝে সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া আধুনিক চাহিদাগুলোকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এইচআর ম্যানেজারকে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্য বিভাগের অসহযোগিতা কিংবা এইচআরকে নন-প্রোডাক্টিভ বিভাগ ভেবে জরুরি বিষয়গুলোকে অনেক জায়গায় উপেক্ষা করা হয়। এগুলোই প্রধান চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশে এইচআর প্র্যাকটিস সম্পর্কে বলুন…

কামরুজ্জামান চৌধুরী: বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সারা বিশ্বে শিল্পবিপ্লব শুরু হলে তুমুল প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের দিয়ে অবৈধভাবে কাজ করিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। এজন্য শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে থাকে। মূলত এই শ্রমিক অসন্তোষের ফলেই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ধারণার জন্ম হয়। তৎকালীন সময়ে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার কাজ ছিল শ্রমিকদের কর্মঘণ্টার হিসাব রাখা। তাদের যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা। কিন্তু সেখান থেকে আমরা অনেকটাই বেরিয়ে আসতে পেরেছি। এখন আমাদের প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলোয় এইচআর প্র্যাকটিস চালু আছে। মধ্যম সারির অনেক প্রতিষ্ঠানও ইতোমধ্যে শুরু করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলোয় যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে কর্মীদের দক্ষ তথা সম্পদে রূপান্তরিত করার কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের সঠিক মূল্যায়ন, প্রেষণা, সঠিক ব্যবহার, শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি তথা মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করা প্রভৃতি বিষয়ের চর্চা চলছে।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে এইচআর ম্যানেজারকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

কামরুজ্জামান চৌধুরী: বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠানে ‘মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ বিভাগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর অনেক মালিক ইতোমধ্যে এ বিভাগের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পেরেছেন। আমরা অনেকেই যার যার অবস্থান থেকে উদ্যোক্তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, একটি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়ন ও সাফল্য অর্জন অনেকাংশেই সে প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। যেহেতু এ পেশায় মানুষকে নিয়ে যথেষ্ট কাজ করার সুযোগ আছে, তাই পেশা হিসেবে এইচআর ম্যানেজারের পদটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার বিজ: যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন…

কামরুজ্জামান চৌধুরী: এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে লেখাপড়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। যোগাযোগে দক্ষ হতে হবে। মানুষকে বোঝা ও তাদের নিয়ে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে, যে কোনো যোগ্যতার কর্মীই সম্পদ। প্রতিষ্ঠান তার ক্রেতা। ওই সম্পদের মানোন্নয়ন ও সঠিক ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের চাহিদানুযায়ী মানসম্পন্ন ফল বের করে আনাই তাদের কাজ। প্রথমেই যে সবকিছু জেনে আপনি চাকরিতে যোগ দেবেন তা নয়। কিন্তু কিছু মৌলিক বিষয় যেমন সংশ্লিষ্ট আইন, মানবাধিকার, শ্রম আইন প্রভৃতি সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞান থাকলে এক ধাপ এগিয়ে থাকবেন তারা।

শেয়ার বিজ: সফল এইচআর ম্যানেজার হতে আপনার পরামর্শ কী?

কামরুজ্জামান চৌধুরী: কর্মীদের কর্মপ্রবণতা বৃদ্ধি, দক্ষ কর্মী গড়ে তোলা, নিজ প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি অনুযায়ী কর্মস্থলে মানবসম্পদের যথাযথ মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা একজন সফল এইচআর ম্যানেজারের মূল কাজ। ধরুন, আমি যদি গাছে ওঠার দক্ষতা দেখে মাছের মূল্যায়ন করি, তাহলে তো হবে না; তাই না? একইভাবে কর্মীর সঠিক মূল্যায়ন করতে তার নাগালের মধ্যে রেখেই কেপিআই সেট করতে হবে। যেন কোনো কিছু আকাশকুসুম না হয়। তাহলেই কর্মীরা আপনার ওপর আস্থা পাবেন। তাদের কাছে কি চাইছি? কেন চাইছি তাও বুঝিয়ে দিতে হবে। সফল এইচআর ম্যানেজারকে ধৈর্যশীল হতে হবে। অন্যের মতামতকে সম্মান দিতে হবে। সুবিবেচনা, নিয়মানুবর্তিতা, জানার আগ্রহ থাকতে হবে। নতুন বিষয় কিংবা চাহিদা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে হবে।