প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

‘প্রতিষ্ঠানে ফিমেল-ফ্রেন্ডলি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার ওয়াটারএইড বাংলাদেশের মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগের প্রধান রাজিয়া সুলতানা লুনা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

রাজিয়া সুলতানা লুনা ওয়াটারএইড বাংলাদেশের মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগের প্রধান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উইমেন এন্ট্রিপ্রেনারশিপের ওপর এমফিল ও আইবিএ থেকে ‘লিডারশিপ সার্টিফিকেট ইন ম্যানেজেরিয়াল কমিউনিকেশন’ কোর্স সম্পন্ন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্টের (বিএসএইচআরএম) একজন সম্মানিত লাইফ ফেলো ও প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট।

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই…

রাজিয়া সুলতানা লুনা: ক্যারিয়ার শুরু করি বাংলাদেশ উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে। এরপর ১৯৯৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে পারসোনেল অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের অ্যাসিসট্যান্ট ডিরেক্টর (এইচআর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ২০০১ সালে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনে (পিডিবিএফ) যোগ দিই। ওইখানে চার বছরের বেশি সময় মানবসম্পদ বিভাগের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০০৫ সাল থেকে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের প্রধান মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে কেন বেছে নিলেন?
রাজিয়া সুলতানা: মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগে ক্যারিয়ার গড়ব এমন পরিকল্পনা ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর শেষে উš§ুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে যোগদানের পর বুঝতে পারি আমি এই পেশা উপভোগ করছি না। ম্যানেজমেন্টে পড়ালেখার সুবাদে রেড ক্রিসেন্টে পারসোনেল অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে যোগ দিই। মানুষ নিয়ে কাজ করতে বেশ উপভোগ করছিলাম। তখন বুঝতে পারলাম মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করলে আমি ভালো করব। তাই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে বেছে নেওয়া।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে একজন দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই…

রাজিয়া সুলতানা: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবর্তনশীল ব্যবসায়িক পরিবেশে কোনো প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার জন্য দরকার দক্ষ মানবসম্পদ। আর প্রতিষ্ঠানে মানুষকে দক্ষ সম্পদে পরিণত করতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের গুরুত্ব অনেক। প্রতিষ্ঠানে যোগ্য কর্মী নির্বাচন করা, তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ করেন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে একজন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?
রাজিয়া সুলতানা: সব কাজের মধ্যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হয়। যোগ্য কর্মী নির্বাচন, ক্রমাগত উন্নয়ন ও দক্ষ কর্মীদের প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের জন্য অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। এছাড়া প্রতিষ্ঠানে লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট আরেকটি চ্যালেঞ্জ। আবার চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের পরিবর্তন আসে, যেমন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, প্রযুক্তির নানা ব্যবহার, কাজের ধারা, কালচার প্রভৃতির সঙ্গে বিদ্যমান কর্মীদের উপযোগী করে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এছাড়া কিছু কমপ্লায়েন্স ইস্যু রয়েছে, যা কমপ্লাই করে চলাও অনেক সময় চ্যালেঞ্জের।

শেয়ার বিজ: বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনেক নারী কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলেও মধ্য বা উচ্চপর্যায়ে এ সংখ্যার হার অনেক কম। বলা যায়, নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন নারী কর্মীর সংখ্যা নগণ্য। এমনটা হওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?

রাজিয়া সুলতানা: আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির একটু প্রভাব তো রয়েছেই। তাছাড়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই পিরামিডের মতো ওপরের লেভেলে কর্মীসংখ্যা কমতে থাকে। আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীদের সুযোগ নেই তা বলব না, তবে কিছু প্রতিষ্ঠানে নারীদের সুযোগের কথা বলা হলেও সত্যিকার অর্থে তেমনটি দেখা যায় না। তাই নারীদের নিজ প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে হয়। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরতে হয়। আর সামাজিক কিছু প্রতিবন্ধকতা, যেমন স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী হলে সন্তান লালনপালন, বাসার কাজ সামলানো- সবকিছুর জন্য দেখা যায় স্ত্রী চাকরি ছেড়ে দেয়। এছাড়া যেসব নারী কর্মক্ষেত্রে আছে তাদের ক্ষেত্রে যদি কোনো সহোযোগিতার ঘাটতি হয়, তাহলে ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। কর্মক্ষেত্র, পরিবার, সন্তান-সবকিছু সমন্বয় করতে গেলে চাকরিতে মনোনিবেশ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে নারীরা পিছিয়ে যায়।

শেয়ার বিজ: টপ ম্যানেজমেন্টে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কী কী বিষয় জরুরি?
রাজিয়া সুলতানা: প্রতিষ্ঠানগুলোয় ফিমেল-ফ্রেন্ডলি পরিবেশ গড়তে হবে। যথাযথ কার্যকর করতে হবে। নারীদের জন্য আলাদাভাবে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য টপ ম্যানেজমেন্টের সহযোগী মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ। আর নারীদের নিজেদেরও এগিয়ে আসতে হবে। ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে যে, ‘আমরাও পারি।’

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে নারী কর্মীদের প্রেরণার জন্য কিছু বলুন…
রাজিয়া সুলতানা: বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগ প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন নারী কর্মীরা। কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। অনেক নারী প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ পরিচালনা করছেন, তাহলে আপনি কেন পারবেন না? শেখার আগ্রহ থাকতে হবে। আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে। পরিশ্রম করতে হবে আর ইচ্ছাশক্তি থাকাটা জরুরি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপককে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
রাজিয়া সুলতানা: চমৎকার একটি পেশা। প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক। বর্তমানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব ও কর্তব্য বেড়েছে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া, কিংবা লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

শেয়ার বিজ: সফল মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হতে হলে আপনার পরামর্শ?
রাজিয়া সুলতানা: কেবল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই হবে না, প্রতিষ্ঠানের স্ট্র্যাটেজিক বিজনেস পার্টনার হিসেবে কাজ করতে হবে। ব্যবসায় ভূমিকা রাখতে হবে। হিউম্যান রিসোর্সকে কীভাবে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানে সফলতা নিয়ে আসা যাবে, সে-সম্পর্কিত কলাকৌশলগত সহযোগিতা করতে হবে। পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। প্রতিষ্ঠান ও কর্মী উভয়ের স্বার্থ বিবেচনা করে এগিয়ে যেতে হবে। সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও নৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। সব বিষয়ে স্বচ্ছ হতে হবে।