প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় পড়ছে ৭২-৮১ টাকা

ইসমাইল আলী: দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ১৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদা না থাকায় গ্রীষ্মকালেই উৎপাদন করা হয়েছে সর্বোচ্চ সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। শীতে তা সাত হাজারে নেমে যাওয়ার শঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশই বসে থাকছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা বিবেচনা না করে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই দুই বছর আগে বেসরকারি খাতে নতুন কয়েকটি ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ। ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) নামক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বোঝা টানতে হবে ১৫ বছর। ফলে বিদ্যুৎ খাতের বোঝা হয়ে উঠেছে এসব কেন্দ্র।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে ব্যয়বহুল কেন্দ্র ছিল সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীতে স্থাপিত প্যারামাউন্ট বিট্রাক এনার্জি। কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা ২০০ মেগাওয়াট। ডিজেলচালিত এ আইপিপিটি থেকে গত অর্থবছর বিদ্যুৎ কেনা হয় দুই কোটি এক লাখ ৬৫ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা। যদিও কেন্দ্রটিতে বছরে কমপক্ষে ১৪৪ কোটি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
সক্ষমতার মাত্র দেড় শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও গত অর্থবছর কেন্দ্রটির জন্য ১২৮ কোটি ৬৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে পিডিবিকে। এতে কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়ে ইউনিটপ্রতি ৮১ টাকা দুই পয়সা।
একই অবস্থা ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের ব্রাহ্মণগাঁওয়ে নির্মিত এগ্রিকো পাওয়ার সল্যুশন কেন্দ্রটির। ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গত অর্থবছর বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ ছিল। ফলে মাত্র দুই কোটি ৯২ লাখ ৭৯ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। তবে কেন্দ্রটির জন্য গত অর্থবছর ১৭২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়। এতে কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়ে ইউনিটপ্রতি ৭৫ টাকা ৭৮ পয়সা।
এদিকে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে স্থাপন করা হয়েছে বাংলা ট্র্যাকের ২০০ মেগাওয়াটের আইপিপি কেন্দ্রটি। কেন্দ্রটিতে বছরে কমপক্ষে ১৪৪ কোটি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছর এতে মাত্র পাঁচ কোটি ৩৪ লাখ ৮১ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। সক্ষমতার মাত্র চার শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও গত অর্থবছর কেন্দ্রটির জন্য ৩৪৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়। এতে কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়ে ইউনিটপ্রতি ৭৪ টাকা ৮৮ পয়সা।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের একই চিত্র ঢাকার পাশে কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ে নির্মিত এপিআর এনার্জির। ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আইপিপি কেন্দ্রটিতে বছরে কমপক্ষে ২১৬ কোটি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছর এতে মাত্র আট কোটি ৩৬ লাখ ৯২ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। সক্ষমতার মাত্র চার শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও গত অর্থবছর কেন্দ্রটির জন্য ৪৬৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়। এতে কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়ে ইউনিটপ্রতি ৭২ টাকা ৬৮ পয়সা।
এদিকে যশোরের নওয়াপাড়ায় বাংলা ট্র্যাকের ১০০ মেগাওয়াটের ডিজেলচালিত দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ করা হয়েছে। কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় ১১ কোটি ৬৩ লাখ ৯১ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা, যা সক্ষমতার ১৬ শতাংশ। এ কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা বেশি হওয়ায় ব্যয় অনেক কমে গেছে। এতে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়ে ৩১ টাকা ৫৪ পয়সা। এ পাঁচটি কেন্দ্রই দুই বছর আগে স্থাপন করা হয়।
এর বাইরে ছয় বছর আগে নির্মাণ করা হয় নারায়ণগঞ্জের সামিট মেঘনাঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। ৩৫৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি থেকে গত অর্থবছর বিদ্যুৎ কেনা হয় ২৭ কোটি ৪৬ লাখ ৫৩ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় পড়ে ৩১ টাকা ৪০ পয়সা।
পিডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিজেলের বিদ্যুৎকেন্দ্র রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে উঠেছে। ২০০৯ ও ২০১০ সালে ভাড়াভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্র ছিল ডিজেলচালিত। সেগুলো তিন-পাঁচ বছরের জন্য লাইসেন্স দেওয়া হলেও পরে তা বাড়ানো হয়। তবে সেসব কেন্দ্রে গড়ে ব্যয় পড়ত ইউনিটপ্রতি ২০-২৫ টাকা। এরপরও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে ১৫ ও ২২ বছরের জন্য আবারও ডিজেলচালিত আইপিপি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এখন কেন্দ্রগুলো বছরের বেশিরভাগ সময় বসে থাকছে। অথচ ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে পিডিবিকে।

ট্যাগ »

সর্বশেষ..