প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

প্রতি বর্গফুট চামড়া প্রক্রিয়াকরণে খরচ বাড়ছে ২০ টাকা

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছে ট্যানারি শিল্প। তবে সাভার শিল্পনগরীটি এখনও প্রস্তুত নয়। এতে শুরু থেকেই দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা, যার প্রভাব পড়ছে দেশি বাজারের পাশাপাশি রফতানিতেও। এসব নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের দ্বিতীয় পর্ব আজ

 

নাজমুল হুসাইন: ‘এমএস ট্যানারি লিমিটেড’-এর নিজস্ব কোনো কারখানা নেই। রফতানি আদেশ অনুয়ায়ী সাভারের শিল্পনগরীতে প্রতিষ্ঠানটি ৭০ হাজার বর্গফুট চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কাজ করাচ্ছে ভাড়ায়। আগে হাজারীবাগে ‘সমতা লেদার’-এর কারখানায় তাদের কাজ চলতো। কিন্তু সাভারে সমতা লেদারের কারখানায় এখনও ক্রাশড ও ফিনিশিং করার সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। এ কারণে ক্রাশড প্রক্রিয়ার জন্য ‘এমএস ট্যানারি’-কে যেতে হয়েছে ‘আজমীর ট্যানারি’ নামক অন্য একটি কারখানায়। সেখানেও সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা নেই। ‘আজমীর ট্যানারি’ থেকে ওয়েট ও মেজারমেন্টের জন্য ওই চামড়া আবার নিয়ে যেতে হবে ‘মদীনা ট্যানারি’-তে। এভাবে একাধিক কারখানায় টানা- হেঁচড়ার কারণে এবার চামড়া সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকরণে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

এমএস ট্যানারির এসব কার্যক্রম পরিচালনাকারী মনির হোসেন বলেন, ‘সমতা লেদারে হ্যাঙ্গিং পর্যন্ত হবে। এরপর চামড়া পরিবহন ও লেবার খরচ দিয়ে আরও দুটি ট্যানারিতে নিতে হবে। এতেই শুধু পরিবহন খরচ বাড়বে প্রতি বর্গফুটে প্রায় ৪-৫ টাকা, যা অতিরিক্ত।’

তিনি আরও জানান, আগে হাজারীবাগে চামড়া ডায়িং এ প্রতি ঘণ্টায় ২৫০ টাকা খরচ হতো। এখন গুনতে হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকা। ৩০০ কেজি চামড়ার ওয়েটের খরচ ছিল ২৫০ টাকা। সে হিসেবে ৬০০ কেজি চামড়ার জন্য দ্বিগুণ খরচ হবে। কিন্তু সাভারে সেই পরিমাণে চামড়া ওয়েটে এক হাজার ২০০ টাকা নিচ্ছে ট্যানারিগুলো।

চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে হাজারীবাগে প্রতি স্কয়ারফুট চামড়ায় ফিনিশিং পর্যন্ত খরচ হতো ৭৬ টাকা। এখন খরচ হচ্ছে প্রায় ৯৬ টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ সাভারে এখন প্রতি বর্গফুট চামড়া সম্পূর্ণ প্রকিয়াকরণে প্রায় ২০ টাকা খরচ বেড়েছে।

ট্যানারি মালিকরা বলছেন, কারখানায় গ্যাসের সংযোগ নেই। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে এসব কাজ চলছে অধিকাংশ ট্যানারিতে। ফলে খরচও বেড়ে গেছে দ্বিগুণ। পাশাপাশি দুই জায়গায় বাড়তি পরিবহন খরচও বহন করতে হচ্ছে। শ্রমিকদের খরচ বেড়েছে। ফিনিশড না করে চামড়া রফতানিসহ কোনো পণ্য  তৈরি সম্ভব নয়। এ প্রক্রিয়া করতে জ্বালানি খরচ অনেক বেড়েছে।

সালমা ট্যানারির স্বত্বাধিকারী ও বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত উল্লাহ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গ্যাসের সংযোগ নেই, এমন অনেক ট্যানারিতে ক্রাশড ও ফিনিশিংয়ের কাজ হচ্ছে। যেখানে গ্যাসে প্রতিদিন পাঁচ হাজার টাকা গুনতে হতো সেখানে ডিজেলের খরচ ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। এরপরও একটি মেশিন চালানো সম্ভব হলে অন্যটি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। শ্রমিকদের বেকার বেতন দিতে হচ্ছে।’

 

তিনি জানান, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে তিন স্তরে কাজ করতে হয়। সাভারে বর্তমানে প্রথম স্তরে ওয়েট ব্লু কাজ হচ্ছে প্রায় অর্ধশত ট্যানারিতে। কিন্তু সেই চামড়া ফিনিশড না করে রফতানিসহ কোনো পণ্য তৈরি সম্ভব নয়। এ প্রক্রিয়া চলছে আটটি ট্যানারিতে। সেগুলোয় বেড়েছে প্রচুর কাজের চাপ। বেড়েছে খরচও।

 

আজমীর লেদারের স্বত্বাধিকারী সাইদ উল্লাহ বলেন, ‘চার মাস আগে গ্যাসের জন্য আবেদন করেছি। ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু এখনও সংযোগ পাইনি। কবে নাগাদ গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হবে তারও ঠিক নেই। এতে আগের দরে কাজ করানো সম্ভব হচ্ছে না।’

মদীনা ট্যানারির ম্যানেজার টিপু সুলতান বলেন, ‘আমাদের স্পের কাজ হয় চার তলায়। লিফট চালু না হওয়ায় শুধু চামড়া ওঠাতে প্রতিটি চামড়ায় দুই টাকা শ্রমিক খরচ দিতে হচ্ছে।’

 

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘হাজারীবাগে গ্যাস, বিদ্যুৎ-সংযোগ কেটে দেওয়ার পর চামড়া খাতে আরও বিপর্যয় ঘনীভূত হয়েছে। এক হাজার ১০০ কোটি টাকার রফতানি আদেশ বাতিলের ঝুঁকিতে রয়েছে। যাদের হাতে রফতানি আদেশ আছে তারা লোকসান দিয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করছে।’

তিনি বলেন, ‘শিল্পনগরীতে কারখানা ভবন নির্মাণ, নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি, পুরোনো যন্ত্রপাতি স্থানান্তর ইত্যাদি কাজে উদ্যোক্তারা প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন। এতে অধিকাংশ উদ্যোক্তা অর্থ সংকটে পড়েছেন। কিন্তু উদ্যোক্তাদের আয় বন্ধ হলেও শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পরিবহন খরচ, ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ ইত্যাদি ব্যয় যথারীতি বেড়েছে। এখন সবকিছুর প্রভাব পড়ছে চামড়া খাতে। নতুন করে লোকসানের ঘানি টনতে হবে উদ্যোক্তাদের।’

 

প্রসঙ্গত, হাজারীবাগে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ হতো সনাতন যন্ত্রপাতিতে। সেগুলো কয়েক বছর আগে কেনা। এসব যন্ত্রপাতি দিয়ে আরও অন্তত পাঁচ-ছয় বছর কাজ চালানো যাবে। কিন্তু সাভারের আধুনিক পরিবেশে এ যন্ত্রপাতি স্থাপন করা যাচ্ছে না। কোনো কোনো যন্ত্রপাতি সাভারে স্থাপনের সময় ভেঙে যাচ্ছে। এগুলোর বেশিরভাগই সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। অনেক বড় বড় যন্ত্রপাতি বহনও কঠিন হয়ে পড়েছে ট্যানারি মালিকদের। অনেকের নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি করার সামর্থ্যও নেই। সেক্ষেত্রে ট্যানারির অবকাঠামো সম্পূর্ণ হলেও চামড়া প্রক্রিয়াকরণ বন্ধ রয়েছে। এমতাবস্থ্যায় আটটি ট্যানারি সম্পূর্ণ চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করতে পারছে। সেগুলোয় ক্রাশড ও ফিনিশিংয়ে খরচ বেশি হচ্ছে। কাজের চাপও প্রচুর। বাকিরা শুধু কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করছে।