প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট: দরিদ্র মেধাবীদের উচ্চশিক্ষায় স্বপ্নসারথি

সাদেকুর রহমান: সাতক্ষীরার সুন্দরবনঘেঁষা প্রত্যন্ত শ্যামনগর উপজেলার মাধবী রানী মণ্ডল শিক্ষা উপবৃত্তি পেয়ে বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত। আজ তিনি খুলনা বেতারের একজন তালিকাভুক্ত লোকসংগীত শিল্পী। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত সিলেটের রহিমা আক্তার মনি সুস্থ দেহে আবারও শিক্ষাজীবনে ফিরে গেছেন সরকারের আর্থিক সহায়তা পেয়ে। সাতক্ষীরার মাধবী রানী মণ্ডল কিংবা সিলেটের রহিমা আক্তার মনির মতো অসংখ্য শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন চলমান রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের কল্যাণে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট-দরিদ্র মেধাবীদের উচ্চশিক্ষায় স্বপ্নসারথি। দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক  হিসেবে দেশে-বিদেশে সুনাম কুড়ানো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দশটি বিশেষ উদ্যোগের অন্যতম এ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার উপযোগিতা ও উপকারিতা এখন প্রমাণিত। যেসব দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা থমকে যেত কেবল অর্থাভাবে, বর্তমানে এ ট্রাস্ট তাদের সে বাধা ডিঙ্গিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও আস্থা জোগাচ্ছে। ২০১২ সালে ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার পর থেকে ষষ্ঠ থেকে স্নাতক ও সমমান শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, এমনকি এমফিল-পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনেও সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের এ কর্মসূচিকে ‘যুগান্তকারী’ বলছেন অনেকেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ২০ এপ্রিল বৃত্তি প্রদানের জন্য একটি ‘ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে একটি লিখিত নির্দেশনা দেন। অর্থের অভাবে শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা নিশ্চিত করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। বিভিন্ন ধাপ ও যথাযথ প্রক্রিয়া শেষে ২০১২ সালের ১১ মার্চ নবম জাতীয় সংসদের দ্বাদশ অধিবেশনে ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট বিল, ২০১২’ পাস হয়। সংবিধানের ৮০ (২) অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতি একই বছরের ১৪ মার্চ বিলটিতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। একই তারিখে ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট আইন, ২০১২’ বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ট্রাস্ট আইনের ৩ (১) উপ-ধারার বিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট নামে একটি ‘ট্রাস্ট’ স্থাপন করা হয়। এ আইনের ৭ (১) উপ-ধারার বিধান অনুযায়ী, পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারপারসন। এ আইনের ৮ (১) উপ-ধারা অনুযায়ী ছাব্বিশ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘ট্রাস্টি বোর্ড’ গঠন করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন। প্রধানমন্ত্রী ট্রাস্টি বোর্ডের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

ট্রাস্টের আইনানুগ দায়িত্ব ও কার্যাবলির মধ্যে ষষ্ঠ থেকে স্নাতক ও সমমান শ্রেণি পর্যন্ত দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি ও উপবৃত্তি প্রদান; শিক্ষা কার্যক্রমে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং সমাজের বিত্তশালীদের সম্পৃক্তকরণ; শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধসহ সব পর্যায়ে শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিতকরণ; স্নাতকোত্তর পর্যায়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল ও পিএইচডি কোর্সে নিবন্ধিত বা গবেষণায় নিয়োজিতদের ফেলোশিপ ও বৃত্তি প্রদান প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে অর্থ মন্ত্রণালয় ২০১১-১২ অর্থবছরে সিডমানি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের স্থায়ী তহবিলে ১ হাজার কোটি টাকা প্রদান করে। এ অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর হিসাবে জমা রাখা হয় এবং এ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের উপবৃত্তি, আর্থিক সহায়তা, অনুদান ও উচ্চশিক্ষায় ফেলোশিপ দেয়া হচ্ছে।

বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২০ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় সর্বশেষ ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯ জন দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপবৃত্তি, টিউশন ফি, ভর্তি সহায়তা ও চিকিৎসা অনুদান বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেড় লাখ উপকারভোগীর সহায়তা পৌঁছে গেছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের এই উপবৃত্তি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এবারের কার্যক্রমের আওতায় সর্বমোট ৮৭ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার ৪০০ টাকার সহায়তা দেয়া হয়েছে। গত বছর মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা বিকাশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় ২ লাখ শিক্ষার্থী স্বচ্ছতা, দ্রুততা ও নিরাপত্তার সঙ্গে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে।

শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট থেকে ২০১৯ সালে সারাদেশের স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের ২ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর মাঝে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উপবৃত্তি ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টিউশন ফি বাবদ ১১০ কোটি ৯৮ লাখ ৯২ হাজার ৩৪০ টাকা বিতরণ করা হয়। ২০১৮ সালে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের মোট ২ লাখ ৬০ হাজার ৭০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিতরণ করা হয় ১৩৭ কোটি ৬০ লাখ ৮৪ হাজার ৪০ টাকা। ট্রাস্ট থেকে ২০১৭ সালে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৩৪  কোটি ২৪ লাখ ৭৫ হাজার ৪৬০ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে এর পরিমাণ ছিল ১১৩ কোটি ৬১ লাখ ৩৩ হাজার ৫৬০ টাকা।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় উপবৃত্তি প্রদান কার্যক্রমে ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ছাত্রীদের পাশাপাশি ছাত্রদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ওই বছর দেড় লক্ষাধিক স্নাতক ও সমমান শিক্ষার্থীর মধ্যে উপবৃত্তির অর্থ বিতরণ করা হয়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ে এক লাখ ৩০ হাজার ছাত্রীর মধ্যে প্রায় ৭৩ কোটি উপবৃত্তি বাবদ দেয়া হয়।

২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের দরিদ্র ও মেধাবী নির্বাচিত ৭৫ শতাংশ ছাত্রী ও ২৫ শতাংশ ছাত্রের মধ্যে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। এ সময়ে সর্বমোট ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬০৯ জন শিক্ষর্থীকে ৭৪৮ কোটি ৪৯ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব খাত থেকে সরাসরি জি-টু-পি পদ্ধতি অনুসরণ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে উপবৃত্তির অর্থ পৌঁছে দিতে ট্রাস্ট কাজ করেছে।

দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিশ্চিতকরণে আর্থিক সহায়তা প্রদান নির্দেশিকা-২০১৫-এর আলোকে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির আর্থিক সহায়তা বাবদ শিক্ষার্থী প্রতি মাধ্যমিক পর্যায়ে ৫ হাজার টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ৮ হাজার এবং স্নাতক ও সমমান পর্যায়ে ১০ হাজার টাকা হারে প্রদান করা হয়ে থাকে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৮৫৩  জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাবদ ৩১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্দেশিকার আলোকে ট্রাস্ট ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের এককালীন আর্থিক অনুদান বাবদ মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সর্বমোট ৩১ জন শিক্ষার্থীকে ৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট থেকে এমফিল ও পিএইচডি কোর্সে ফেলোশিপ ও বৃত্তি প্রদানের লক্ষ্যে প্রণীত নির্দেশিকা-২০১৭ অনুযায়ী ২০১৮ সাল থেকে এমফিল কোর্সে মাসিক ১০ হাজার টাকা এবং পিএইচডি কোর্সে মাসিক ১৫ হাজার টাকা করে ফেলোশিপ ও বৃত্তি দেয়া হচ্ছে। এমফিল ও পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হওয়া যে কোনো গবেষক গবেষণাকর্ম সম্পাদনে ওই ফেলোশিপ ও বৃত্তি পেতে পারেন। এ পর্যন্ত ১৬ জন এমফিল গবেষক এবং ১৫ জন পিএইচডি গবেষককে ফেলোশিপ ও বৃত্তি বাবদ দেয়া হয়েছে।

সরকারের মানবিক ও শিক্ষানুরাগী মনোভাব মেধাবী অথচ দারিদ্র্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত তারুণ্যকে শিক্ষার মূলধারায় টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট। এভাবেই প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট সরকারের এক অতি প্রশংসনীয় ও মানবিক উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট সার্বজনীন শিক্ষা অধিকার পরিকাঠামো গড়ে তুলতে ও রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে অবিরাম কাজ করে চলেছে। 

ট্রাস্টের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার আওতায় শিক্ষার মানোন্নয়নে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ ও এর বাস্তবায়ন; শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ; নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আত্মপ্রত্যয়ী নারী জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ; শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের মাধ্যমে তারুণ্যের শক্তিকে ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্তকরণ; সার্বজনীন শিক্ষা পরিকাঠামোর আওতায় সুবিধাবঞ্চিত সব শ্রেণির শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে সব ধরনের শিক্ষা সহায়তা, উপবৃত্তি প্রদান কার্যক্রমের সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে সফল করার লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের মতো এমন উদ্যোগ দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করবে। তাদের স্বপ্নিল ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষাবান্ধব বর্তমান সরকার গৃহীত ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাসহায়তা ট্রাস্ট প্রকল্প’ নিশ্চয়ই একট কালজয়ী উদ্যোগ হিসেবে ভূমিকা রাখবে। সাক্ষী হবে ইতিহাসের সুবর্ণ এক অধ্যায় হিসেবে।

পিআইডি নিবন্ধন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯০  জন  

সর্বশেষ..