সুশিক্ষা

প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকজয়ী রাবির সাত শিক্ষার্থী

কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত শিক্ষার্থী মনোনীত হয়েছেন ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’-এর জন্য। এ সাফল্যের পেছনে ভূমিকা রেখেছেন বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য অথবা শিক্ষক। আবার সবকিছু ছাপিয়ে কারও পাশে ছিলেন স্বামী। কার উৎসাহে এতদূর আসা? আর পেছনের গল্পটাই বা কেমন ছিল? স্বর্ণপদকজয়ী এসব শিক্ষার্থীর গল্প বলছেন মুজাহিদ হোসেন

মোছা. মিতু পারভীন

অর্থনীতি বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৩১৪

আমার বাড়ি সিরাজগঞ্জে। এসএসসি পরীক্ষার পর আমার বিয়ে হয়। এইচএসসি পরীক্ষার পর কোলজুড়ে সন্তান আসে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্বামীর সহায়তায় আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হই। ভর্তির তিন মাস পর অসুস্থ হয়ে পড়ি। ভেবেছিলাম আমার আর পড়ালেখা হবে না। তবে দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার ক্লাসে মনোযোগ দিই। পড়ার সময় কম থাকায় চিন্তিত ছিলাম পরীক্ষা নিয়ে। তারপরও আমি প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় ৩.৮১ পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করি। আত্মবিশ্বাস ফিরে পাইÑএখান থেকেই যেন আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু হলো। মনে মনে অনেক সাধনা করতাম যেন আমি আমার স্থান ধরে রাখতে পারি ও ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’ অর্জন করতে পারি। আমার স্বামী ব্যবসায়ী। পড়াশোনা নিয়ে আমি হাল ছেড়ে দিলেও সে কখনও হাল ছাড়েনি, সব সময় আমার পাশে থেকেছে। বইসহ পড়ালেখার সামগ্রী কেনা, ভর্তি, বিভাগের কিছু অ্যাকাডেমিক কাজ প্রভৃতি দেখভাল করত। মনে হতো, আমি শুধু হলে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসতাম। আজ আমি স্বর্ণপদক পেয়েছি। এ অর্জন জীবনসঙ্গীকেই উৎসর্গ করতে চাই। আমার ছেলের একটা কথা খুব বেশি কানে বাজে এখন, ‘মা তুমি আমাকে ভালোবাস না, তুমি বইকে ভালোবাস।’

অরিন্দম বিশ্বাস

আইন বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৩১৪

স্বর্ণপদক প্রাপ্তির যাত্রাটা হয়েছিল যখন প্রথম বর্ষে প্রথম হই। এরপর স্বপ্ন দেখা শুরু স্বর্ণপদক অর্জনের। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চার বছর শেষে সিজিপিএ ৩.৫৫ পেয়ে অনার্সে প্রথম হই। আমি এটা বলব না যে, ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’ আমার একার অর্জন, এটা আমার বিভাগেরও অর্জন বটে। ছাত্রজীবনের কৃতিত্বপূর্ণ ফলের জন্য পুরস্কার বা স্বীকৃতি যেকোনো শিক্ষার্থীর জীবনে অনেক বড় পাওয়া। আর সেই পুরস্কারটা যদি হয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে, তাহলে তা যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্যই স্মরণীয় ঘটনা হয়ে রবে।

আমি মনে করি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ শুধু একটা বিভাগই নয়, এটা একটা পরিবার। শিক্ষকরা শিক্ষাদান ও ভালো ফল অর্জনে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি আমাকে সার্বিকভাবে সাহায্য করেছেন। শিক্ষকদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

সাম্মে আমেনা তাসমিয়া

পরিসংখ্যান বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৩১৪

বাবা-মায়ের সততা এবং বড় ভাইয়ের নিয়মানুবর্তিতা ও মমত্ববোধ এতদূর পৌঁছে দিয়েছে। দেখিয়েছে অসীমকে জয় করার পথ। বিভাগের শিক্ষকদের কাছে কৃতজ্ঞ আমি। পরিসংখ্যান বিভাগ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। এ বিভাগে পড়ালেখা করতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত। ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’ তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আমার নামটি তালিকাভুক্ত করেছে জেনে ভীষণ ভালো লেগেছে। এটা ভেবে আরও ভালো লাগছে যে, প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে দেওয়া পদকটি আমার গলায় শোভা পাবে।

মো. সোহেল রানা

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি শিক্ষাবর্ষ: ২০১৩-১৪

‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’ অর্জন সবার জন্য আনন্দের, আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। অনেক ভালো লাগছে। আসলে এ ভালো লাগার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার এ অর্জনের পেছনে বাবা-মায়ের অবদান বেশি। তারা অনেক কষ্ট করেছেন আমার জন্য। তাদের এ কষ্ট অনুপ্রাণিত করেছে। আসলে এ অর্জনটা তাদের জন্য সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আসলে মেধা সবারই আছে, কিন্তু পরিশ্রম সবাই করতে চায় না। আমি মনে করি, পরিশ্রম করলে যে কেউ এটা অর্জন করতে পারবে।

সাবিনা ইয়াসমিন

ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিভাগ শিক্ষাবর্ষ: ২০১১-১২

জীবন চলার পথে সময়ের আবর্তে নতুন স্বপ্ন যোগ হয়। এরপর স্বপ্নগুলো একে একে ডানা মেলে, বাস্তবায়নে পথ খোঁজে। এমন এক স্বপ্ন নিয়ে আমার পথচলা শুরু হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকে কোনো পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতায় প্রথম দিকে নিজের নাম দেখলে ভীষণ ভালো লাগা কাজ করত। আর গুরুজনদের অনুপ্রেরণা নিয়ে যেত নতুন দিগন্তে। সে রেশ ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার প্রথম দিক থেকে নিজেকে শত ভিড়ের মধ্যে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। এ স্রোতে আমার সাফল্য আমাকে আজকের এ সম্মান এনে দিয়েছে। এজন্য বিভাগের শিক্ষকদের কাছে কৃতজ্ঞ। বাবা-মাসহ পরিবারের সবার অবদান রয়েছে। বন্ধুবান্ধবের কাছেও কৃতজ্ঞ আমি।

মাহফুজুর রহমান

ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইসিই), শিক্ষাবর্ষ: ২০১৩-১৪

দিনের কাজ দিনে শেষ করার চেষ্টা করছি চার বছর ধরে। সব অর্জনই ভালো লাগার। ঠিক তেমনই স্বর্ণপদকপ্রাপ্তিও বড় অর্জন। আমার এ সাফল্যের পেছনে অনেকের অবদান রয়েছে। তাদের মধ্যে আম্মু ও আব্বু অন্যতমÑতারা সব সময় আমার পাশে ছিলেন। শিক্ষকদের কাছে কৃতজ্ঞ তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরামর্শের জন্য।

আবু বকর ছিদ্দিক

আরবি বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৩১৪

আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল কওমি মাদরাসায় কোরআন হিফজ করার মধ্য দিয়ে। অনেকের উৎসাহ আমাকে সাহস জুগিয়েছে। এ সাফল্যের পেছনে আমার শিক্ষানুরাগী মা-বাবার অবদান সবচেয়ে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক, ২০১৮’ সালের জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছি জেনে ভীষণ ভালো লাগছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর বিভাগের শিক্ষকদের আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ হয়েছি। বিভাগে প্রথম হওয়া ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তারা আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হয়ে তাদের লেকচার শুনতাম। প্রচলিত শিট বা নোটের ওপর নির্ভর না করে গ্রন্থাগার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নোট তৈরি করতাম। আমার অর্জিত জ্ঞান যেন দেশ ও জাতির কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে পারি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..