প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

প্রধান অর্থ কর্মকর্তার অবস্থান কোম্পানির হৃদয়ে

 

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইওর সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) গোপাল চন্দ্র ঘোষ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

গোপাল চন্দ্র ঘোষ আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। সম্পন্ন করেছেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি ও কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্সি পেশাগত ডিগ্রি। তিনি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ ও ইনস্টিটিউট অব পাবলিক অ্যাকাউন্ট্যান্টসের ফেলো

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ার গড়ার পেছনের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই…

গোপাল চন্দ্র: একনাবিন অ্যান্ড চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের অডিট অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ম্যানেজার হিসেবে ১৯৯৬ সালে কর্মজীবনের শুরু। এরপর ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের টেকনিক্যাল অ্যান্ড রিসার্চের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এরপর প্রায় ১১ বছর কাজ করেছি লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট লিমিটেডে। সেখানে করপোরেট অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার হিসেবে ছয় বছর ও হেড অব ইন্টারনাল অডিটর হিসেবে দুবছর ছিলাম। সব শেষে ফাইন্যান্সিয়াল কন্ট্রোলার অ্যান্ড ইন্টারনাল কন্ট্রোল কো-অর্ডিনেটর হিসেবে তিন বছর কাজ করেছি। এরপর ভিয়েলাটেক্স গ্রুপের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে দুবছর কাজ করি। সব শেষে ২০১৪ সালে আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সিএফও হিসেবে যোগদানের আগে বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছি।

শেয়ার বিজ: আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ সম্পর্কে কিছু বলুন…

গোপাল চন্দ্র: এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী একটি বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠান। এর পথচলা শুরু ১৮৩৪ সালে। বর্তমানে এ গ্রুপে ১৮টি বৃহৎ ও অন্যান্য ছোট অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে টেক্সটাইল সেক্টরে রয়েছে চারটি কোম্পানি। বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালসে চারটি। পলিমার, জুট, অটোমোবাইল, রিয়েল এস্টেট ও ফার্নিচার অ্যান্ড হোম ডেকর সেক্টরে একটি করে। এছাড়া ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে রয়েছে দি সিটি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্শিয়াল ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ফাইন্যান্স ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিসহ পাঁচটি কোম্পানি। বর্তমানে আমরা নতুন ব্যবসায় না গিয়ে বিদ্যমান পণ্যে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছি। আসলে নতুন নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণ ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় যাওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ। এর পরিবর্তে আমরা রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আগেই যা বলেছি, নতুন নতুন পণ্য বাজারে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানে অনেকে আছেন যারা দীর্ঘদিন কাজ করছেন। অনেকের চাকরির শুরু ও অবসর এখানেই। অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিয়ে নতুন পরিবেশে এগিয়ে যাওয়া চ্যালেঞ্জের।

শেয়ার বিজ: ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) কোম্পানির ওপর কীরূপ প্রভাব ফেলবে?

গোপাল চন্দ্র: আমি মনে করি, সামগ্রিকভাবে কোম্পানির স্বচ্ছতার ওপর প্রভাব ফেলবে। আইনটি নিরীক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। তবে এর মাধ্যমে খুব একটা লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কম। কেননা সফল হওয়ার জন্য অনেক পিলার দরকার। এটি একটি মাত্র স্তম্ভ বা পিলার। কিন্তু অন্যান্য পিলারে যদি খাদ রয়ে যায়, তবে এ উদ্যোগ কোনো কাজে আসবে না।

ধরুন, একটি প্রতিষ্ঠান কোনো এক অডিট ফার্মের ভুয়া সিল-স্বাক্ষর দিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করে চালিয়ে দিতে চাচ্ছে। সেক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষ যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তবে তারা চুপ থাকবে। অর্থাৎ চূড়ান্তভাবে কোনো স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। সুতরাং কর্তৃপক্ষই যদি কোনো বিষয়ে চোখ বুজে থাকার মতো মানসিকতা প্রদর্শন করে, তাহলে অডিটরের কোনো ভূমিকা থাকে না। আমার মনে হয়, বাজারে এমন ৪০ শতাংশ রিপোর্ট আছে, যা কোনো অডিটরই ইস্যু করেননি। তার মানে দাঁড়ায়- শুধু ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট হলেই যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, তা নয়।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের করনীতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

গোপাল চন্দ্র: করনীতি ব্যবসাবান্ধব নয়। এর অনেক ধারাই অযৌক্তিক। অনৈতিক অর্থ লেনদেনের সুযোগ আছে এখানে। ইচ্ছামতো ‘ডিল’ করারও সুযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আপনি শতভাগ কর দিয়েও দায় থেকে মুক্ত হতে পারবেন না। আপনাকে নাজেহাল করা হতে পারে। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সবকিছু সম্পন্ন করতে গলদঘর্ম হয়ে উঠবেন। এমনকি বাধ্য হয়ে তখন ঘুষ দিয়ে মুক্তি পেতে চাইবেন। অথচ ঘুষ দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করতে পারবেন না। এনবিআর তাদের ক্ষমতা জিইয়ে রেখেছে। সব বিচার-বিশ্লেষণের এখতিয়ার কেবল তাদেরই আছে- এমনই মনে করে এনবিআর। সরকারি কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। ধরুন তারা গ্রস প্রফিট (জিপি) রেশিও ২৫ শতাংশ করে দিতে চাইবে। কিন্তু আমরা জানি কোনো কোম্পানির জিপি রেশিও ১৫ শতাংশের বেশি হওয়া কঠিন। ধরুন একটি প্রতিষ্ঠান লোকসান করেছে। এমন পরিস্থিতিতে কর কর্তৃপক্ষ প্রমাণ করতে চাইবে প্রতিষ্ঠানটি লাভ করেছে। তখন ওই প্রতিষ্ঠানকে লোকসানের ওপরও কর দিতে হবে। একে তো লোকসানের কারণে অর্থ খোয়ালো, ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এলো কর। এরপরও তাদের কোনো বিচার হয় না। ইচ্ছেমতো অ্যাসেসমেন্টের জন্য খুব কমই তাদের বিচার হয়।

শেয়ার বিজ: এনবিআর অ্যাকাউন্ট্যান্টদের তৈরি গ্রস প্রফিটের ফিগারটি বিশ্বাস করতে চায় না কেন?

গোপাল চন্দ্র: কারণ তারা ধরেই নেয় যে, সবাই চুরি করে। তারা কখনও নির্দিষ্ট ফিগার নিয়ে কিছু বলে না। প্রায়ই কমিয়ে বা বাড়িয়ে বলে। তাদের ধারণা আপনি ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যুক্তিসংগতভাবে নয়, বরং ধারণার ওপর ভিত্তি করেই বিচার-বিবেচনা করে। এমন সব কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো নৈতিকতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ভবিষ্যতেও নেবে। যদি সঠিকভাবে কর দিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হয়, তাহলে করদাতারাও অসদুপায় খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

শেয়ার বিজ: বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিদেশি সিএ (চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট) ফার্মের সাহায্য নেয়। এ ধরনের প্রবণতা কেন?

গোপাল চন্দ্র: এর একটি কারণ হতে পারে ব্র্যান্ডিং। আর দ্বিতীয়ত আমরা বড় বড় নামকরা ফার্মের সহায়তা নিয়ে থাকি তাদের মানের জন্য। এটা ঠিক যে, আমাদের দেশি ফার্মের মানও ভালো। আমি বলতে চাই, আমরাও কোনো অংশে কম নই। তবে ব্র্যান্ডিং হয়ে গেছে বলেই অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের বেছে নিচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর বাইরের ফার্ম দিয়ে অডিট করার বিষয়ে চাপ থাকে। যে কারণে তারা বিদেশি ফার্ম দিয়ে অডিট করে। এছাড়া কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংয়ের ইস্যুও কাজ করে।

শেয়ার বিজ: কোম্পানিতে সিএফও’র জন্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকে?

গোপাল চন্দ্র: বাংলাদেশের মানুষ অতিরিক্ত স্বাধীনচেতা। শৃঙ্খলা মানতে চায় না। শৃঙ্খলাবোধ আমাদের আত্মসম্মানে লাগে। সমাজের সব ক্ষেত্রে একই অবস্থা। উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত একই চিত্র- সবাই চায় ক্ষমতা দেখাতে। জবাবদিহি চায় না। অথচ আর্থিক বিষয়াদিতে শৃঙ্খলা তখনই আসে যখন পরিচালনাগত শৃঙ্খলা ঠিক থাকে। প্রায় সবার মধ্যেই শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এ সবকিছু শৃঙ্খলার মধ্যে আনার কাজে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা সহজ নয়। শৃঙ্খলার মধ্যে থাকলে আর্থিক খাতে সুশাসন চলমান রাখা সম্ভব। দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানই অনানুষ্ঠানিক (আনস্ট্রাকচারড) ও পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা বেশ সময়সাপেক্ষ।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে সিএফওকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

গোপাল চন্দ্র: প্রধান অর্থ কর্মকর্তার অবস্থান কোম্পানির হৃদয়ে। পেশাগত প্রয়োজনে অন্যদের চেয়ে ব্যবসা সম্পর্কে অনেক জ্ঞান রাখেন তিনি। আমরা শুধু অ্যাকাউন্টস নিয়ে কাজ করি না। তথ্য-প্রযুক্তি, পরিকল্পনা, কৌশল নির্ধারণ প্রভৃতি নিয়ে কাজ করতে হয়। আমরা মূলত ২০ শতাংশ সময় ফাইন্যান্স নিয়ে কাজ করি। বাকি ৮০ শতাংশ সময় ব্যয় করি কোম্পানির পরিচালনাগত দায়িত্ব পালন ও নীতি নির্ধারণে। এর মধ্যে রয়েছে কৌশলগত বিভিন্ন বিষয় ও ব্যবসা উন্নয়ন। ব্যবসা পরিচালনা করতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন সিএফও।

শেয়ার বিজ: সফল সিএফও হওয়ার জন্য আপনার পরামর্শ কী?

গোপাল চন্দ্র: খুবই বাস্তববাদী হতে হবে। ব্যবসা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখতে হবে; বুঝতে হবে। ব্যবসার পরিবেশ সম্পর্কে জানতে হবে। স্ট্র্যাটেজিক ভিউ থাকতে হবে, যেন সঠিক দিকে অগ্রসর হওয়া যায়।