Print Date & Time : 29 October 2020 Thursday 7:50 am

প্রবাসীদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিতে হবে

প্রকাশ: August 5, 2020 সময়- 12:23 am

ইকবাল হাসান: বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটা নির্ভর করে রেমিট্যান্সের ওপর। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশগুলোয় কাজের খোঁজে যান। অভিবাসী হওয়ার ঢলে সারা বিশ্বে বাংলাদেশিরা রয়েছেন ষষ্ঠ অবস্থানে। ২০১৯ সালের হিসাবমতে, বাংলাদেশের ৭৮ লাখ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাস করছেন। তাদের অধিকাংশ জীবিকার তাগিদে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অস্থায়ীভাবে অভিবাসন নিয়েছেন। আবার কেউ উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে স্থায়ী অভিবাসী হয়েছেন। তিন দশকে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এভাবেই বছরের পর বছর এ দেশের লাখ লাখ মানুষ জীবিকার তাগিদে ও ভালো থাকার আকাক্সক্ষায় দেশান্তরি হচ্ছেন।

বাংলাদেশে চাকরির নিরাপত্তা কিংবা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা অন্যান্য দেশ থেকে কম। কতটা অসহায় হলে কোনো মানুষ তার চেনা-জানা পরিবেশ, আত্মীয় সবকিছু ছেড়ে জীবিকার জন্য অন্য দেশে চলে যায়! সে দেশে কাজ নাও পেতে পারে, মারাও যেতে পারে তবুও তার আশা আর যাই হোক বাংলাদেশে থাকার চেয়ে অন্য দেশে ভালো থাকবে! অনেকে বৈধ পথে যায়, অনেকে বাধ্য হয়ে নিয়ম-কানুনের অবাধ্য হয়ে নদীপথে পাড়ি দেয় একটা নতুন জীবনের আশায়। সবাই সুন্দর জীবন পায় না। অনেকে মারা যায় স্বপ্নের দেশে যাওয়ার পথে, আবার অনেকে দালালের হাতে নিঃস্ব হয় কিংবা অবৈধ অভিবাসী হয়ে পৃথিবীর নরকে জ্বলতে থাকে।

লিবিয়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনার কথাই ধরা যাক! যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ লিবিয়া। একক সরকার না থাকায় ছোট ছোট মিলিশিয়া বাহিনী কর্তৃত্ব দেখাচ্ছে এবং তাদের হাতেই খুন হয় ২৬ বাংলাদেশি।

শুধু লিবিয়া নয়, প্রায় দেশগুলোয় একই সমস্যা। সৌদি আরব থেকে শুরু করে মালয়েশিয়া কোথাও নিস্তার নেই। আমরা মালয়েশিয়ার ঘন জঙ্গল থেকে একের পর মরদেহ উদ্ধার হতে দেখেছি। তবুও থেমে নেই দালালের দৌরাত্ম্য। ২০১৯ সালে এক বছরে শুধু মালয়েশিয়ায় ৭৮৪ বাংলাদেশি মৃত্যুবরণ করেছেন। গত ১০ বছরে বিদেশ থেকে মোট ২৬ হাজার ২৫৮ জনের লাশ ফিরেছে। ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে এক হাজার আট, কুয়েত থেকে ২০১, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২২৮, বাহরাইন থেকে ৮৭, ওমান থেকে ২৭৬, জর্ডান থেকে ২৬, কাতার থেকে ১১০, লেবানন থেকে ৪০ জনের লাশসহ মোট তিন হাজার ৫৭ জনের লাশ দেশে ফিরেছে।

সাম্প্রতিক সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো রায়হান কবিরের ঘটনা। অথচ মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের খোঁজখবর রাখার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) রায়হান কবিরের ব্যাপারে কিছুই জানে না বলে জানিয়েছে। মালয়েশিয়া নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। মালয়েশিয়ায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে পাঁচ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন বলে ধারণা করা হয়। প্রায় অভিবাসীর কাছে মালয়েশিয়া স্বপ্নের দেশ। রাস্তার দুই পাশে আকাশছোঁয়া সব অট্টালিকা, অসংখ্য ফ্লাইওভার ও প্রশস্ত সব সড়ক দেখে মুগ্ধ হবেন যে কেউ! কিন্তু সেখানে অন্যান্য অভিবাসীদের থেকে বাংলাদেশি অভিবাসীরা বেশি দুরবস্থায় থাকেন। রায়হান কবির শুধু কিছু সত্য তুলে ধরেছেন মাত্র! মে মাসে কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে নিজের বন্ধুদের আটক হতে দেখে আবেগাক্রান্ত হয়ে ওই বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। সেই বক্তব্যের জন্য তাকে আটক ও কালো তালিকাভুক্ত করা হয়, যাতে পরবর্তী সময়ে তিনি আর মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে না পারেন। বাকস্বাধীনতায় এ রকম হস্তক্ষেপ নিয়ে নানা জন নানা মন্তব্য করলেও রায়হান কবিরকে ‘স্পষ্টভাষী’ উল্লেখ করে তাকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এছাড়া ঢাকাতেও অভিবাসীদের সংগঠন ও অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করে এরকম ৬৪টি সংগঠন বৃহস্পতিবার প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমেদের বক্তব্য রায়হান কবিরের প্রতি অবহেলার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি বৃহৎ স্বার্থের দিক বিবেচনা করে ব্যক্তির রাষ্ট্র থেকে সাহায্য পাওয়ার অধিকার ক্ষুণœ করছেন। অন্যান্য দেশে যেখানে নাগরিককে এ রকম বিপদ থেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়, এমনকি ফৌজদারি অপরাধ করলেও নিজ দেশে এনে বিচারের ব্যবস্থা করা হয়, সেখানে বাংলাদেশ শ্রমবাজারকে ঢাল বানিয়ে সাহায্যের হাত গুটিয়ে নিয়েছে।

আগের গণমাধ্যগুলো দেখলে এরকম ভূরি ভূরি উদাহরণ পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ থেকে যারা কাজের জন্য বাইরের দেশে যান, তারা বাংলাদেশে কাজ না পেয়েই অন্য দেশে  যাওয়ার চিন্তা করেন। বাংলাদেশ মানবসম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে। আবার প্রবাসীরা যখন নিজে খেটে দেশের জন্য টাকা পাঠান, তখনও বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে এবং বাংলাদেশ সরকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা দেখায়। বাইরের অচেনা পরিবেশে যখন কোনো বাংলাদেশি অসুবিধায় পড়েন, তখন তার সাহায্যের অন্যতম মাধ্যম হলো সে দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে প্রায়ই বাংলাদেশিদের সেখান থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়। দুর্বলের প্রতিই এই পৃথিবীর যত অত্যাচার! মালয়েশিয়াও একই নীতিতে চলছে। মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের অক্ষমতা দেখেই তাদের মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে অবজ্ঞা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব থেকে দলে দলে গৃহকর্মীরা গর্ভবতী হয়ে যখন ফিরে এসেছিলেন, সেই সময়ও বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সে দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে সে রকম জোরালো পদক্ষেপ দেখতে পাওয়া যায়নি। করোনার কারণে প্রায় কোনো দেশই এখন আর শ্রমিক নিচ্ছে না। যারা ফেরত এসেছিলেন তাদের মধ্যে অনেকে দেশেই রয়ে গেছেন। এই পরিস্থিতিতে বহির্বিশ্ব থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যদি না বাংলাদেশ অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে আমাদের অর্থনীতির ক্ষতি।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। সরকারকে শুধু রেমিট্যান্স থেকে আয় দেখলেই হবে না, যারা আয় করছেন তাদেরও দেখতে হবে। তাদের সমস্যা ও অসুবিধা দেখার জন্য বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দেশে অবস্থিত দূতাবাসকে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সহযোগিতা করতে হবে; তা না হলে আরও অনেকের অবস্থা রায়হান কবিরের মতো হতে পারে।

ফ্রিল্যান্স লেখক