মত-বিশ্লেষণ

প্রবাসী শ্রমিকদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা দরকার

আবদুল মকিম চৌধুরী : মহিউদ্দিন কয়েক বছর সৌদি আরব ছিলেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা যথাসময়ে নবায়ন করতে পারেননি। এতে বৈধভাবে দেশটিতে অবস্থানের যোগ্যতা হারান। নিয়োগকর্তার প্রিয় ছিলেন। মহিউদ্দিনকে কয়েক দিন লুকিয়ে রেখেছেন তিনি।  কিন্তু এক দিন পুলিশের সামনে পড়ে যাওয়ায় ২৪ ঘণ্টা কারাবাস শেষে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাকে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট থাকায় পরবর্তী পাঁচ বছর দেশটিতে যেতে পারবেন না তিনি। কিন্তু দেশে এসে কী করবেন? কয়েক দিনের মধ্যে উপার্জিত অর্থ শেষ হয়ে এলো। আবারও তিনি দেশটিতে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াল ফিঙ্গার প্রিন্ট। রিক্রুটিং এজেন্সিকে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করেও ভিসা করিয়ে নিতে পারছিলেন না। তবে ফোনে যোগাযোগ হয় নিয়োগকর্তার সঙ্গে। তিনি অভয় দিয়ে বলছিলেন, তুমি কোনোভাবে চলে এসো। বিমানবন্দরে আটকে দিলে আমি ছাড়িয়ে নেব। অবশেষে সুযোগ এলো। হজযাত্রী হিসেবে সৌদি আরব যাবেন মহিউদ্দিন। সেখান থেকে পালিয়ে যাবেন। কিন্তু ফিঙ্গার প্রিন্টের মেয়াদ যে শেষ হয়নি। যদি এয়ারপোর্টে আটকে দেয়। হজ এজেন্সির কাছে তথ্য গোপন করে হজভিসা নিলেনÑকোনোভাবে বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা পার হতে পারলেই হয়। কিন্তু ভয় তো মনে থেকেই যায়Ñযদি ফিরিয়ে দেয়, তা হলে ধারদেনা করে সংগ্রহ করা প্রায় চার লাখ টাকা পরিশোধ করবেন কীভাবে। তিনি ভাবছিলেন, হজযাত্রী হিসেবে তার ফিঙ্গার প্রিন্ট যাচাই করা হবে না। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, নিয়তি আরেকÑযথারীতি ফিঙ্গার প্রিন্ট যাচাই হলো এবং বিমানবন্দরেই ঠেকিয়ে দেওয়া হলো তাকে। ইমিগ্রেশন অফিসারকে আঞ্চলিক আরবিতে বললেন, ‘আমাকে পুলিশে সোপর্দ করবেন না। আমি সৌদি আরবে অনেক দিন ছিলাম। আমার নিয়োগকর্তাই আমাকে এভাবে আসতে বলেছেন।’ মোবাইল ফোনের কল লিস্ট দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘এই দেখুন আমরা কতবার কথা বলেছি। আপনি দয়া করে তার সঙ্গে কথা বলুন।’ কেন জানি দয়া হলো অফিসারের। তিনি কথা বললেন নিয়োগকর্তা সৌদি নাগরিকের সঙ্গে। ওই নিয়োগকর্তা তাকে জানালেন, ‘আপনি মহিউদ্দিনকে বের হতে দেবেন না। আপনার কাছে বসিয়ে রাখুন। আমি ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে তাকে নিয়ে যাব।’ কথা রাখলেন তিনি। দেড় ঘণ্টার মধ্যেই কীভাবে ইমিগ্রেশন অফিসারকে প্রভাবিত করে মহিউদ্দিনকে ছাড়িয়ে নিজের সঙ্গে নিলেন। 

এদিকে মহিউদ্দিন পালিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে তাকে সৌদি আরব পাঠানো হজ এজেন্সি। এজেন্সির লোকজন বলছেন, এমন ঘটনায় তাদের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে। আবার মহিউদ্দিনের পরিবার থেকে এজেন্সিকে বলা হচ্ছে, ‘আমাদের লোককে কী করেছেন, সেটি জানান। মহিউদ্দিন তো সৌদি আরব পৌঁছেনি।’  

যা-ই হোক নিয়োগকর্তা মহিউদ্দিনকে বললেন, তুমি আপাতত আমার বাসার  আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকবে। চূড়ান্ত কাগজপত্র বের হলে প্রকাশ্যে আসবে। কিন্তু কয় দিন এভাবে থাকা যায়। মাঝেমধ্যে বের হন রাস্তায়। কিন্তু আরবীয় লম্বা আলখাল্লার পায়জামার সঙ্গে সব সময় পরে থাকেন লাখ টাকা দামের অ্যাডিডাসের বুট জুতা, যাতে উসাইন বোল্টের চেয়ে দ্রুতগতিতে দৌড়াতে পারেন। পুলিশের সঙ্গে দৌড়াতে হবে যে। বাংলাদেশি অবৈধ শ্রমিকদের অনেকেই দামি ব্র্যান্ডের বুট পরে থাকেন দৌড়ে সুবিধা পাওয়ার জন্যই।  

জীবিকার তাগিদে মহিউদ্দিন অবৈধভাবে সৌদি আরবে গেছেন। চার বছরেও কাগজপত্র জোগাড় করতে পারেননি তিনি। কিন্তু মহিউদ্দিনের মতো পালিয়ে থাকতে হচ্ছে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিককে, যারা বৈধভাবেই দেশটিতে এসেছেন। চাকরিও পেয়েছেন। কিন্তু চাকরির শর্ত অনুসারে পাসপোর্ট যে জমা রাখতে হয় নিয়োগকর্তার কাছে। তাতেও সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। সমস্যা হলো, কাজ করে নিয়োগকর্তাকে সন্তুষ্ট করা যায় না। ফলে বেতন প্রদানে গড়িমসি, বেশি সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য হওয়া প্রভৃতি বিড়ম্বনায়  পড়তে হয়। বৈধ কাগজপত্র নিয়োগকর্তার কাছে থাকা সত্ত্বেও পালিয়ে যান, হয়ে যান অবৈধ। এরপর যত দিন সম্ভব হয় পালিয়ে কাজ করেন তারা। অসহায়ত্বের সুযোগ হাতছাড়া করেন না নতুন নিয়োগকর্তা। বেশি পরিশ্রম করিয়ে কম বেতন দেন। ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেন। সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসী শ্রমিকদের এটি যেন সামষ্টিক নিয়তি। নিজ দেশের দূতাবাসের সহায়তা পান না তারা।

দেশে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানও শ্রমিকদের বিভিন্ন বিষয়ে অন্ধকারে রাখে। প্রবাসে গেলে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে, কেবল সেসবই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে  বলে বিদেশগামী শ্রমিকদের। দালালরা এমনভাবে বিবরণ দেয়, যেন কোনোভাবে বিমানবনন্দরে নামলেই চাকরিতে যোগ দেওয়া যাবে। অবশ্য বিমানবন্দরে অবতরণের পর তাদের ভাড়াটে লোকজনের লোকদেখানো আতিথেয়তায় বোঝারও উপায় নেই যে কোনো প্রতারণার শিকার  হতে পারেন তারা।

দেশে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) কেবল জরুরি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তির কথাগুলো মনে করিয়ে দেওয়াকে একমাত্র দায়িত্ব মনে করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছেÑএক. বিদেশ গমনেচ্ছুক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটস্থ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। দুই. ফিঙ্গার প্রিন্ট (আঙুলের ছাপ) বা রেজিস্ট্রেশন মানেই বিদেশে চাকরির নিশ্চয়তা নয়। তিন. কোনো ব্যক্তি বা দালাল রেজিস্ট্রেশন বা ফিঙ্গার প্রিন্ট (আঙুলের ছাপ) করে টাকা চাইলে বা বিদেশে চাকরি হয়েছে বলে প্রতারণা করলে আইন প্রযোগকারী সংস্থায় খবর দিন। চার. জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি এবং কর্মী নিয়োগের সত্যতা জেনে নিন। পাঁচ. নিয়োগ চূড়ান্ত হলে বিদেশ গমনের আগে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে আপনাকে অবশ্যই বহির্গমন ছাড়পত্র (স্মার্টকার্ড) গ্রহণ করতে হবে। ছয়. বিদেশ যাওয়ার আগে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করবেন, প্রয়োজনবোধে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে যাচাই করে নেবেন। সাত. চুক্তিপত্রে নিয়োগকর্তার নাম, আপনার নাম, পেশা, বেতন ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে কি না, পরীক্ষা করে নিন। আট. সরকার-নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ, চেক/পে অর্ডার/ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি রিক্রুটিং এজেন্সিকে পরিশোধ করবেন। নয়. বিদেশ গমনের জন্য দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী পরিত্যাগ করে সরাসরি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করুন।  

একজন সাধারণ শ্রমিকের পক্ষে কি কাগজপত্র যাচাই করা সম্ভব? সরকারের কোনো সংস্থা সে অর্থে কি শ্রমিকদের সহায়তা করে? দেশে দেশে শ্রমিকরা প্রতারিত-প্রবঞ্চিত হয়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছে, এমন তথ্য প্রায়ই গণমাধ্যমে আসে। কিছু ঘটনা পাষাণ হƒদয়কেও নাড়া দেয়। আমাদের দূতাবাস এগুলোকে কেবলই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উল্লেখ করে। ধরে নেওয়া যাক, এগুলো সত্যিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকদের সব হালনাগাদ তথ্য সরকারের কাছে নেই বলেই মনে হয়।

বিএমইটি বলছে, এ পর্যন্ত এক কোটি বাংলাদেশি শ্রমিক বিভিন্ন দেশে কাজ নিয়ে গেছেন। তবে কতজন শ্রমিক ফেরত এসেছেন আর বর্তমানে কতজন বিদেশে অবস্থান করছেন, সে হিসাব কোনো সংস্থার কাছেই নেই। এ তথ্য না থাকায় একদিকে অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে অব্যবহƒত থাকছে দেশে ফেরত আসা শ্রমিকদের অর্জিত দক্ষতাও।

এখন পর্যন্ত আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকাংশই অদক্ষ হিসেবে বিদেশে গেছেন। সেখানে গিয়ে তারা অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন কাজে দক্ষতা অর্জন করেন। প্রতি বছর প্রচুরসংখ্যক শ্রমিক দেশে ফেরেন দক্ষ হয়ে। কিন্তু বিএমইটির কাছে ফেরত আসা শ্রমিকের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছেও নেই এ তথ্য। সরকারের কাছে তথ্য না থাকায় ফিরে আসা শ্রমিকদের অর্জিত দক্ষতাও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বিদেশে যাওয়া, চুক্তির মেয়াদ ও অন্যান্য সূত্রের সহায়তায় ফেরত আসা শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ইমিগ্রেশন পুলিশ, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, বিএমইটি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা গেলে তথ্য সংরক্ষণ সম্ভব।

তথ্যভাণ্ডার অনেক কাজে লাগানো যায়। বাংলাদেশি অদক্ষ শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে দক্ষতা অর্জন করে ফেরেন। এ দক্ষ জনগোষ্ঠীর চাহিদা রয়েছে দেশে ও দেশের বাইরে। দক্ষ শ্রমিকদের সংখ্যা ও কোন কোন ক্ষেত্রে তারা দক্ষ, তা জানা থাকলে তা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। বিদেশ থেকে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা অনুযায়ী তথ্যভাণ্ডার থেকে শ্রমিক রপ্তানিও করা যাবে।

গণমাধ্যমকর্মী ধসপযু৯Ñমসধরষ.পড়স

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..