প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

প্রবাসে শ্রমিকের অপমৃত্যু কাম্য নয়

 

দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রবাসে বাংলাদেশি শ্রমিকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। এসব মৃত্যুর ৯৪ শতাংশ ঘটছে স্ট্রোক, হƒদ্রোগ ও দুর্ঘটনায়। দেশে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ জন প্রবাসী শ্রমিকের লাশ আসছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিমানবন্দর দিয়ে। লাশ দেশে আনার ক্ষেত্রেও রয়েছে অনিয়ম ও ভোগান্তির অভিযোগ। সরকারি হিসাবমতে, ২০০৫ সালেও প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ এসেছিল এক হাজার ২৪৮টি। ২০১২ নাগাদ তা বেড়ে তিনগুণ হয়েছে। গত বছর এসেছে তিন হাজার ৪৮১ জনের লাশ, আর ২০১৫-তে এ সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৩০৭। বিষয়টি বহুল আলোচিত, সে কথা বলা যাবে না। প্রবাসে অক্লান্ত পরিশ্রম করে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে যারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখায় অবদান রাখছে সবচেয়ে বেশি, বলা যায় তারাই বেশি অবহেলার শিকার। নিয়োগকর্তার নির্যাতন, অতিরিক্ত কাজের চাপ, আত্মীয়-পরিজন দূরে, দীর্ঘদিনের একাকী জীবনÑএসব কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে অধিকাংশের মৃত্যু ঘটছে বলে জানিয়েছে প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থাগুলো। ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েও একটি বড় অংশের মৃত্যু ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে রাখা হয়। পরিবহনও করা হয় ছোট গাড়িতে গাদাগাদি করে। এসব ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ড ও সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর শঙ্কা বাড়ে।

বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকের সুনাম রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তাদের অংশগ্রহণ বেশি। অথচ প্রবাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের একটি বড় অংশ সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়ে। জমিজমা বিক্রি ও উচ্চসুদে ধারদেনা করে পাড়ি জমায় তারা। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর যথেষ্ট মনিটরিং রয়েছে, তা বলা যাবে না। অভিযোগ রয়েছে অধিক রেমিট্যান্সের আশায় দক্ষ ও সচেতন না করেই প্রবাসে শ্রমিক পাঠানোর। নতুন দেশের কাজের ধরন, জীবন ও খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশÑএসব নিয়ে শ্রমিকদের বড় অংশের প্রস্তুতি থাকে না। এতে তারা মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হয়। তাদের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোর স্থানীয় কর্তৃপক্ষও সব ক্ষেত্রে সদাচরণ করে, তেমনটি নয়। বিপুল বিনিয়োগ করে বিদেশে গিয়ে সহজে ফিরে আসাও সম্ভব হয় না। বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে আনা বা ঋণ পরিশোধের চাপও রয়েছে। সব মিলিয়ে ভয়ানক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয় তাদের অনেককে। বিপদে পড়লে বাংলাদেশ দূতাবাস ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আশানুরূপ সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নিজেদের প্রবাসী শ্রমিকের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় ভারতের অবস্থান কিন্তু কঠোর। অথচ প্রবাসী শ্রমিক সুরক্ষায় এখন পর্যন্ত আমরা শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারিনি। সেসব দেশের সঙ্গে বারগেইনিংয়েও পিছিয়ে রয়েছি। সন্দেহ নেই, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় অবদান রয়েছে। সেটিকে পুঁজি করে সেসব দেশে আমাদের শ্রমিকদের অবস্থান আরও উন্নত পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব ছিল, তেমনটাই আমাদের বিশ্বাস।

প্রবাসে শ্রমিক অপমৃত্যুর হার ক্রমে বেড়ে যাওয়াকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাদের সুরক্ষায় সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে। জনশক্তি রফতানির প্রক্রিয়া ও প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনমানের বিষয়গুলোও যথেষ্ট রেগুলেট করা আর ভালোভাবে দেখা প্রয়োজন।