প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

প্রবৃদ্ধির সুফল অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে বৈষম্য কমাতে হবে

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় দেশের মানব উন্নয়ন নিয়ে মূল্যায়ন করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ‘জাতীয় মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন, ২০২১’-এ উঠে এসেছে দেশের গত পাঁচ দশকের বিভিন্ন খাতের পরিবর্তনের তথ্য। এতে কয়েকটি সূচকে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতির কথা উঠে এলেও উন্নয়নের সুবিধা সমহারে বণ্টিত না হওয়ায় সব খাতেই বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে বলে উল্লেখ করা হয়।

সরকারের মূল্যায়নেই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, এটিই আশার কথা। অভিযোগ রয়েছে, সরকার সাফল্যের বাইরের বিষয় ভাবতে পারে না। নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাপনের ব্যয়, ভোগ, শিক্ষা ও আয়ে বৈষম্য যে তীব্র হয়েছে, সরকার তা বুঝতে পারায় এটি এড়িয়ে যাবে না বলেই সাধারণ মানুষের ধারণা।

আমরা মনে করি, ‘বড় জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রেখে এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ছাড়া সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। উচ্চহারের প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও এটি চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে না। সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি না হলে বৈষম্য বাড়বে। এমনটি হলে এসডিজি অর্জন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চাকরিবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদপ্রবাহ বৃদ্ধি করে দারিদ্র্য ও অসমতা দূর করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অর্জন বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়েছে। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ সন্তোষজনক জায়গায় এসেছে, মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি গতি পেয়েছে, গড় আয়ু বেড়েছে প্রভৃতি। কিন্তু সব নাগরিক সহজে কম খরচে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না, এটিও সত্য। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র শহর ছাড়িয়ে ইউনিয়ন পর্যায়েও পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্য ব্যয় জোগাতে পারছে না। আমাদের ভাবতে হবে স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে, নাকি মানুষের সক্ষমতা কমেছে। কোনোটিই কাম্য নয়। সরকারি তথ্য বলছে, নাগরিকদের স্বাস্থ্যের পেছনে যত খরচ হয়, তার ৬৭ শতাংশই নিজের পকেট থেকে খরচ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবার খরচের বিষয়টি ঠিকমতো স্বীকার করা হয় না বলে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কমে যাচ্ছে বা দারিদ্র্য বেড়ে যাচ্ছে। ফলে দারিদ্র্যবিমোচন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।

প্রবৃদ্ধির সুফল সর্বজনীন করতে হলে স্বাস্থ্যব্যয় ও জীবনযাপনে বৈষম্য কমাতে হবে। কেবল সম্পদশালীদের আর্থিক সুবিধা দিয়ে অর্থনীতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা সম্ভব নয়। উন্নয়নকে টেকসই করতে অবশ্যই অর্থনীতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। কর আদায় বাড়ানো গেলে সামাজিক বৈষম্য নিয়ন্ত্রণে বেশি ব্যয় করা যাবে।

অনেকে বলেন, জাতীয় সংসদের ৮০ শতাংশ সদস্যই ব্যবসায়ী হওয়ায় অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন। সংসদ সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে আর্থিক খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে প্রবৃদ্ধির সুফল পাবে সাধারণ মানুষ। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বা স্থিতিশীল রাখতে বৈষম্য হ্রাসে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করার পাশাপাশি বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়নও প্রয়োজন।