শেষ পাতা

প্রবৃদ্ধির সুফল পালিয়েও যাচ্ছে

বিআইডিএসের সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির যে সুফল সবার পাওয়ার কথা, তা আমরা পাচ্ছি না।’

গতকাল রাজধানীর লেকশোর হোটেলে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ‘রিসার্চ অ্যালামনাক, ২০১৯’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এসব কথা বলেন।

এম এ মান্নান বলেন, ‘যাদের পরিশ্রমে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশের কাছে এর সুফল পৌঁছাচ্ছে না। এখানে নানা ধরনের বিকৃতি আছে। কৃষি খাতের ভর্তুকিতে বিকৃতি আছে, কর রেয়াতে বিকৃতি আছেÑযার ফলে প্রবৃদ্ধিজনিত যে সুফল আমাদের পাওয়ার কথা ছিল, তা পাচ্ছি না। প্রবৃদ্ধির সুফল পালিয়েও যাচ্ছে। বিদেশ চলে যাচ্ছে। যেটাকে ক্যাপিটাল ফ্ল্যাইট বলা হয়। অন্যান্য জায়গায়ও সরে যাচ্ছে। এখানে আমাদের সরকারের আরও কিছু কাজ করার অবকাশ রয়েছে।’

দু’দিনব্যাপী ওই অনুষ্ঠানের সমাপনী অধিবেশনে বর্তমান সরকারের অর্জিত উচ্চ প্রবৃদ্ধির ফলাফল বিশ্লেষণ করে বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদরা। এ সময় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা ড. রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও বৈষম্য প্রকট। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কর্মসংস্থান হচ্ছে না, দারিদ্র্যও সে হারে কমছে না।’

বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন দারিদ্র্য কমিয়ে আনার ওপর জোর দেন এবং মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন। এসময় তিনি ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনারও পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ একটি বড় অনুষঙ্গ। কিন্তু এ খাতে এখন প্রকৃতপক্ষে ২৫ শতাংশের মতো খেলাপি ঋণ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে তথ্য দেয়, তা প্রকৃত তথ্য নয়।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, ‘দেশের আমদানি নীতি বাস্তবসম্মত কি না, তা ভেবে দেখতে হবে। এখানে স্থানীয় শিল্প প্রসারের কথা বলে কিছু খাতে অনেক বেশি কররেয়াত সুবিধা দেওয়ার পরও ওই খাতগুলো বছরের পর বছর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।’

বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সেইসব অর্থনীতিবিদের মতামতকে সমর্থন দিয়েছেন, যারা মনে করেন, ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত যাই থাকুক না কেন বা আসুক না কেন, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নয়নের প্রয়োজনে কীভাবে সংযুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতির আকার নির্ধারণ করা হবে। কেননা উন্নয়নের প্রয়োজনগুলো বদলাচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি আসছে। এই পরিবর্তনকে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আয়ত্ত করে নেয়, তাহলে সেই আয়ত্ত করার ধরনের ওপর নির্ভর করবে আমাদের অর্থনীতিতে বর্তমানে যে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে, তার ফলে আমরা কি একটি পুণ্যচক্রের মধ্যে ঢুকে যাব, নাকি একটি দুষ্টচক্রে আটকে যাব।’

অনুষ্ঠানের শেষ দিনে বেশ কয়েকটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ সময় নগরায়ণ ও সামাজিক পরিবর্তনের ওপর ঢাকায় বসবাসকারীদের জীবনযাপন ও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা কীভাবে স্মার্ট জীবনযাপন করছে, তার ওপর দুটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকাবাসীর ৯১ দশমিক ৫০ শতাংশই যানজটের কবলে পড়ছে। বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছে ৬৬ শতাংশ। বিশুদ্ধ পানির অভাবে রয়েছে ৬১ শতাংশ। রাস্তাঘাটের দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। জলাবদ্ধতার শিকার ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন ৪২ দশমিক ৭০ শতাংশ। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ পাচ্ছে না ৪০ শতাংশ। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ঢাকার ৩৭ শতাংশ মানুষ। ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে ২৮ দশমিক ২০ শতাংশ।

ঢাকাবাসীর স্বাস্থ্য নিয়ে ওই গবেষণায় বলা হয়, ৩০ দিনে নির্বাচিত ১২ হাজার ৪৬৮টি পরিবারের মধ্যে ৬৮ শতাংশেরই কেউ না কেউ অসুস্থ ছিল বলে জানিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার পেছনে ঢাকার বিভিন্ন শ্রেণীর আয়ের মানুষের বড় ধরনের ব্যয় হচ্ছে। এর মধ্যে আকস্মিক ব্যয় হয় প্রায় ৯ শতাংশ। এর মধ্যে একেবারে নি¤œআয়ের মানুষগুলো চিকিৎসার পেছনে তাদের মাসিক আয়ের ৬৭ শতাংশ অর্থ খরচ করছে। চিকিৎসাব্যয় বাবদ গড় অর্থনৈতিক খরচ হচ্ছে সাত হাজার ৪১৭ টাকা। এর মধ্যে সরাসরি মেডিক্যাল খরচ গড়ে দুই হাজার ২৫০ টাকা। বাকিটা রোগীদের পকেট থেকে যাচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালে যাতায়াত খরচ ৭৯২ টাকা এবং অসুস্থতার কারণে আয় কমে যাচ্ছে গড়ে চার হাজার ৩৭৪ টাকা।

গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়, গত ১০ বছরের হিসেবে বরিশাল থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঢাকায় এসেছে। এরপর রয়েছে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, ভোলা এবং সবচেয়ে কম মানুষ এসেছে শরীয়তপুর থেকে। তবে গত পাঁচ বছরের হিসাবে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঢাকায় এসেছে কিশোরগঞ্জ থেকে। এরপর রয়েছে বরিশাল, ময়মনসিংহ, ভোলা, কুমিল্লা, ফরিদপুর, রংপুর, চাঁদপুর ও নোয়াখালী। আর সবচেয়ে কম মানুষ টাঙ্গাইল থেকে এসেছে।

অপর এক গবেষণায় বলা হয়, ঢাকায় বছরে যেসব মানুষ মারা যায়, তার মধ্যে বায়ুদূষণজনিত অসংক্রামক রোগে মারা যাচ্ছে ১০ দশমিক আট শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে শ্বাসকষ্টে মারা যায় আট শতাংশ, কিডনি রোগে দুই দশমিক ৩০ শতাংশ এবং ফুসফুসের রোগে মারা যাচ্ছে শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ মানুষ।

এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন, কার্বন নিঃস্বরণের ওপর একাধিক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয় ওই অনুষ্ঠানে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..