দিনের খবর শেষ পাতা

ভাড়াটিয়াদের থেকে নেন ১২০ শতাংশ সুদ!

প্রভাবশালী বাড়িওয়ালা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভাড়াটিয়াদের ভাড়া দিতে বিলম্ব হলেই ভাড়ার ওপর ১২০ শতাংশ হারে সুদ বা জরিমানা আরোপ করেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন। দেশের কোথাও এ হারে সুদ না থাকলেও এটিই তার নিয়ম। এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগও করা হয়েছে। অন্যদিকে ভাড়াটিয়াদের থেকে নেওয়া অগ্রিম অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রেও জালিয়াতি করেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, লে. কর্নেল (অব.) নাছির উদ্দিন আহমেদ তার উত্তরার ৪ নং সেক্টরের ৫ নং রোডের ১২ তলা বাড়িটি ভাড়াটিয়া নির্যাতনের কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। ভাড়াটিয়াদের ডেকে এনে তাদের থেকে অগ্রিম অর্থ নিয়ে কিছুদিন পর শুরু করেন অভিনব নির্যাতন। ভাড়া দিতে একদিন দেরি করলেই তিনি ১২০ শতাংশ হারে জরিমানা আরোপ করেন এবং তাদের সঙ্গে তিনি চাকর-বাকরের মতো ব্যবহার করেন। তারা যাতে ব্যবসা না করতে পারেন, সেজন্য গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। পার্কিং নিয়ে ঝামেলা শুরু করেন। অতঃপর নোটিস দিয়ে বাড়িছাড়া করেন। এভাবে নতুন ভাড়াটে ডেকে এনে তাদের থেকে অগ্রিম নিয়ে পূর্বতনদের চলে যেতে বাধ্য করেন। তারপর ওইসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে হয়রানি করেন। নিজেকে সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছের লোক পরিচয় দিয়ে ভয়ভীতিও দেখান তিনি।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা মূলত গোয়েন্দা সংস্থার নাম ভাঙিয়ে নানারকম দালালি করেন। পাশাপাশি নিজের ক্ষমতার দাপট দেখান। কথায় কথায় তিনি সাবেক ও বর্তমান জেনারেলদের সঙ্গে সখ্যের কথা বলেন। পাশাপাশি র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের ক্ষমতা জাহির করেন।
সম্প্রতি সাবেক সেনা কর্মকর্তা নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগে দুটি প্রতিষ্ঠান মামলা করেছে। ভাড়ার চুক্তি ভঙ্গ করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সম্প্রতি একটি মামলা করেন ইন্টারন্যাশনাল ফুড ফ্র্যাঞ্চাইজ লিমিটেডেরর কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে (সিএমএম) করা ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়, ভাড়ার চুক্তিতে ২০১৬ সালের ১৫ জানুয়ারি ইন্টারন্যাশনাল ফুড ফ্র্যাঞ্চাইজ লি. ও বাড়িওয়ালা কর্নেল নাছির উদ্দিনের সঙ্গে উত্তরার ৪নং সেক্টরে প্লট-৪এ ঠিকানায় একটি ১২ তলা বিল্ডিংয়ের দুই হাজার ৯০০ বর্গফুট গ্রাউন্ড ফ্লোর ভাড়া নেওয়ার জন্য একটি লিখিত চুক্তিনামা হয়। চুক্তিনামা অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নাছির উদ্দিনকে জেসিএ নং-৬০৯২৩৫০ যমুনা ব্যাংকের মাধ্যমে এক কোটি টাকা অগ্রিম পরিশোধ করা হয়। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সে অর্থ ভাড়াটিয়াকে ফেরত না দিয়ে বাড়িওয়ালা নিজেই ভোগ করেন।
২০১৬ সালের ১৫ জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত চুক্তিনামা অনুযায়ী, চুক্তি অবসানের ৬০ দিনের মধ্যে অভিযোগকারীকে অগ্রিম আকারে প্রদানকৃত ওই টাকা ফেরত প্রদানের শর্ত ছিল। কিন্তু নাছির উদ্দিন ওই চুক্তির শর্তাদি ভঙ্গ করে ২০১৮ সালের ২৫ মার্চ আকস্মিকভাবে অভিযোগকারীকে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্ছেদের নোটিস দেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ২২ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করেন।
অন্যদিকে একই অভিযোগে ২০১৬ সালে নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করেন এসআর গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ রাব্বানী। ঢাকা সিএমএম আদালতে করা মামলার অভিযোগে বলা হয়, বাড়তি অর্থের বিনিময়ে ভাড়ার চুক্তিতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের শর্ত থাকলেও বাড়িওয়ালা নাছির উদ্দিন তা ভঙ্গ করে পরবর্তীকালে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের পরামর্শ দেন। পরবর্তীকালে বাদীপক্ষ উপায় না পেয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিস দেয়। নোটিসে ভাড়ার চুক্তি মোতাবেক সাত দিনের মধ্যে অগ্রিম বাবদ পরিশোধ করা এক কোটি ৫৩ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। পরবর্তীকালে বাড়িওয়ালা নাছির উদ্দিন অগ্রিম টাকা পরিশোধ না করে পাল্টা জীবননাশের হুমকি দেন।
জানতে চাইলে মামলা দুটির আইনজীবী রেজা এইচ পলাশ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সাবেক সেনা কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন যা করছেন, তা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত। তিনি ফ্লোর ভাড়ার নাম করে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নানা কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। এ ধরনের আইনবহির্ভূত কাজকে তিনি এক ধরনের পেশা বানিয়ে ফেলেছেন।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবনটি ভাড়া দেওয়ার সময় কাগজে-কলমে চুক্তিনামা ঠিক থাকলেও ব্যবসা শুরুর পর থেকেই গ্যাস, পানি বা বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে ভাড়াটিয়াদের ওপর শুরু হতে থাকে নানা ভোগান্তি। অন্যদিকে ভাড়াটিয়াদের কোনো মাসের ভাড়া প্রদানে একদিন বিলম্ব হলেই ১২০ শতাংশ হারে সুদ আরোপ করতে থাকেন সাবেক ওই সেনা কর্মকর্তা। অন্যদিকে তার নোটিস মোতাবেক বাড়ি ছাড়লেও ভাড়াটিয়াদের থেকে নেওয়া অগ্রিম অর্থ ফেরত না দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে বছরের পর বছর রেখে দিয়েও তার মুনাফা ভোগ করেন।
গ্রামীণফোন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, জেনি শুজ, ইন্টারন্যাশনাল ফুড ফ্র্যাঞ্চাইজ ও এসআর গ্রুপসহ এখন পর্যন্ত ভবনটিতে যতগুলো ভাড়াটিয়া এসেছে, তাদের কেউই সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেনি বলে জানান স্থানীয়রা।
এদিকে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা নাছিরের বিরুদ্ধে দুদকেও অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়াদের ভাড়া দিতে বিলম্ব হলেই কর্নেল নাছির উদ্দিন ভাড়ার ওপর ১২০ শতাংশ হারে সুদ আরোপ করেন। আর এটাই তার নিয়ম। নিজের স্বার্থ উদ্ধারে ভাড়াটিয়াদের ‘বাবা’ সম্বোধন করে কথা বললেও স্বার্থের বাইরে গেলেই তিনি অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। আর এসব কারণে তার অফিস স্পেস ভাড়া নিলেও মানসম্মানের ভয়ে তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, গ্রামীণফোন, জেনি শুজ ও ফুড চেইন এশিয়া। এসব কোম্পানিকে ভাড়া দেওয়ার পর শুরু হতো নানা ধরনের নিপীড়ন। ভাড়াটিয়াদের গ্যারেজ ব্যবহার করতে না দেওয়া, চুক্তিমতো বিদ্যুৎ না দেওয়া, সাইনেজ লাগাতে না দেওয়াসহ নিত্যনতুন অসুবিধার সৃষ্টি করে হয়রানি করাই কর্নেল সাহেবের কাজ। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সবাই বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। কর্নেল সাহেব মামলাবাজ। তিনি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেন। এক্ষেত্রে তিনি থানা, পুলিশ ও আদালতকেও প্রভাবিত করেন।
এ বিষয়ে কর্নেল (অব.) নাছির উদ্দিনের সঙ্গে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে রূঢ় ভাষায় কথা বলেন ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে কয়েক দফা চেষ্টা করলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ট্যাগ »

সর্বশেষ..