প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

প্রভাব, জাল-জালিয়াতি দিয়েই আলীনগর আবাসিক প্রকল্প!

মহাজোটের প্রভাব খাটিয়ে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে জমি দখল করে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলেন সাবেক সংসদ সদস্য এমএ আউয়াল। সেই জমিতে প্লট বানিয়ে পুলিশ-সেনাবাহিনীসহ সরকারি পদস্থ কর্র্মকর্তাদের কাছে বিক্রি করেছেন। জমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব-মামলার কারণে প্লট কিনলেও মালিকানা ও দখল বুঝে পাচ্ছেন না সাধারণ ক্রেতারা। সে সঙ্গে একই প্লট একাধিক
ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। সংসদ সদস্য থেকে এমএ আউয়ালের ভূমিদস্যু ও প্রতারক আবাসন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠা নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিকের আজ দ্বিতীয় পর্ব

পলাশ শরিফ: ‘আমি বংশপরম্পরায় পরিবার-স্বজনদের নিয়ে বসবাস করছি। বাবার কাছ থেকে কিছু জমি পেয়েছি। আর সেই জমিই এখন আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বছরের পর বছর মিথ্যা মামলার ঘানি টানতে হচ্ছে। ছেলেদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে। ক্রসফায়ারের ভয় দেখানো হচ্ছে। সবাই সবকিছু জানে, কিন্তু অর্থ, প্রভাবশালী ও সন্ত্রাসীদের ভয়ে কেউ কিছু বলছে না। সবাই সবকিছু জানলেও বিপদের দিনে কেউ পাশে নেই।’ মিরপুরের উত্তর কালশীর বাউনিয়ায় নিজ বাড়ির সামনে বসে কথাগুলো বলছিলেন ভাগ্যবিড়ম্বিত এক প্রবীণ।
জইনুদ্দিন, বয়স ৭০ ছুঁই-ছুঁই। চুল-দাড়ি মেহেদীর রঙে রাঙানো। চেহারাটা বেশ দৃষ্টিনন্দন, কিন্তু চোখ-মুখজুড়ে কেবল হতাশার ছাপ। অজানা আতঙ্কের ছাপও স্পষ্ট, যে কারণে শুরুতেই পরিচয় জানতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করলেন। তারপর জানালেন কয়েক দশক ধরে বয়ে চলা দুঃসহ জীবনের গল্প। হতভাগ্য মানুষটির সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এলো সাবেক সংসদ সদস্য ও হাভেলি গ্রুপের কর্ণধার এমএ আউয়ালের বেআইনি কর্মকাণ্ডের তথ্য।
জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে জমি রেজিস্ট্রি ও সন্ত্রাসীদের সহায়তায় জমি দখলের অভিযোগ সম্পর্কে হাভেলি প্রপার্টি ডেভেলপমেন্টের দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির কলাবাগান মিরপুর রোডের প্রধান কার্যালয়ে কয়েক দফায় যোগাযোগ করা হলে ‘এমডি এমএ আউয়াল অফিসে আসেননি’ বলে জানানো হয়েছে। তার ব্যক্তিগত দুটি সেলফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। এসএমএস পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা প্রসঙ্গে আলাপকালে জইনুদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে আউয়াল সাব এখানে প্রকল্পের কাজ শুরু করে। লাভের আশায় আমার ভাইয়েরা কিছু জমি বিক্রি করেছে। এরপর জালিয়াতি করে আরও জমি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। বাধ্য হয়ে আমি এমপি আউয়াল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেছি। পরে মোমিন বখশসহ স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের ভয় দেখাতে শুরু করে। এ নিয়ে মারামারিতে মোমিন বখশ ও তার সহযোগীদের হাতে কলেজছাত্র চঞ্চল মারা গেছে। এরপর মোমিন বখশও রহস্যজনকভাবে নিখোঁজের পর খুন হয়েছে। মোমিন বখশ হত্যা মামলায় আমি, আমার স্ত্রী ও দুই ছেলেসহ স্বজনদের জড়ানো হয়েছে। আমরা মিথ্যা মামলায় জেলও খেটেছি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৪ সালে আবাসন কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন নেয় হাভেলি প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড। রাজধানীর মিরপুরের উত্তর কালশীর বাউনিয়া মৌজায় প্রায় ১২০ বিঘা (প্রায় ৪০ একর) জমি নিয়ে ২০১০ সালে ‘আলীনগর আবাসিক প্রকল্প’ শুরু করে হাভেলি গ্রুপ। ওই গ্রুপটির কর্ণধার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লায়ন এমএ আউয়াল। ২০১২ সালে আবাসন কোম্পানি হিসেবে রিহ্যাবের সদস্যপদ নেয় প্রাইভেট কোম্পানিটি। শুরু থেকে অদ্যাবধি পদে পদে প্রতারণা ও আইন লঙ্ঘনের অনন্য নজির স্থাপন করেছে কোম্পানিটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে নামমাত্র মূল্যে জমি ক্রয়, জাল-জালিয়াতি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে জনৈক মোহাম্মদ আলীর ১৩ পুত্র-কন্যার প্রায় পৌনে ১০ একর জমিও করায়ত্ত করার চেষ্টা করছে হাভেলি প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট, যার ওপরে গড়ে উঠছে আলীনগর আবাসিক প্রকল্পের বড় একটি অংশ। প্রকল্পের বাকি অংশের জমিও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে ভয়-ভীতি দেখিয়ে দখল কিংবা নামমাত্র মূল্যে রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওই মোহাম্মদ আলীর উত্তরসূরি জইনুদ্দিন ও তার পরিবারের সদস্যরা জমি হারানো ও হয়রানির আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
জইনুদ্দিন আরও বলেন, ‘আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসার পর আমার ছেলেদের বিরুদ্ধে মাদক-অস্ত্র আইনসহ বিভিন্ন আইনে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে। ছেলেরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় কখনও কখনও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অল্প কিছু টাকা নিয়ে সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে বলা হচ্ছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাভেলি প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড কর্তৃপক্ষ মোহাম্মদ আলীর মেয়ে শুক্কুরী বেগমের কাছ থেকে ২০১০ সালের ২৮ নভেম্বর দলিলের মাধ্যমে (যার নং-১৫০১২) প্রায় ২৬ শতক জমি কিনেছে বলে দাবি করছে। অথচ শুক্কুরী বেগম ২০০৭ সালের ১০ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর তিন বছর পর জমির দলিল রেজিস্ট্রি করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে বানেছা বেগম তার অংশের প্রায় ৩৮ শতক জমি বিক্রির জন্য তার ভাই জইনুদ্দিনকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আমমোক্তারনামা) দিয়েছেন। তিনি নিজে কোনো জমি বিক্রি করেননি। তাই দুই বোনের প্রায় ৫২ শতক জমি জালিয়াতির মাধ্যমে রেজিস্ট্রির অভিযোগ এনে মিরপুরের সাব-রেজিস্ট্রার, হাভেলি প্রপার্টির এমডি এমএ আউয়াল ও তার স্ত্রী শারমীন নাহারের বিরুদ্ধে ২০১২ সালে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করেছেন জইনুদ্দিন। হাভেলি গ্রুপ তার দুই বোনের ৫২ শতক জমি জাল দলিলের মাধ্যমে রেজিস্ট্রিসহ প্রায় ৭৬ শতক দখলে নিয়েছে।
এদিকে আবাসন প্রকল্পে মাটি ভরাটসহ উন্নয়ন কাজ দেওয়া, প্লট বিক্রির অর্থের অংশ কমিশন হিসেবে দেওয়ার প্রলোভন ও সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে ভয়-ভীতি দেখিয়ে জইনুদ্দিন ও তার স্বজনদের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে কিনে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। কাগজে-কলমে কিনে নেওয়া জমির সঙ্গে জইনুদ্দিন ও তার স্বজনদের নামে থাকা জমিতে প্লট বানিয়ে বিক্রির চেষ্টা এবং জমিতে সাইনবোর্ড টানানো নিয়েও হাভেলির লোকজনের সঙ্গে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে। ওই জমি নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষের জেরে ২০১৫ সালের ১৪ মে এমএ আউয়ালের ভাড়া করা সন্ত্রাসী মোমিন বখশ ও তার লোকজনের হাতে খুন হয়েছেন কলেজছাত্র আবদুর রহমান চঞ্চল। এরপর ওই জমির ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন আদালত।
পুলিশের তথ্য অনুসারে, মিরপুরের টেকেরবাড়ি-পল্লবীর একসময়কার দাপুটে অপরাধী ছিলেন মোমিন বখশ। তার বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতা, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল। ২০১১ সালের দিকে প্রকল্পের শুরুতে বিরোধ থাকলেও পরে চিহ্নিত সন্ত্রাসী-ভূমিদস্যু মোমিন বখশকে সঙ্গে নিয়ে আবাসন প্রকল্পের কাজ শুরু করেন এমএ আউয়াল। ওই মোমিন বখশের ভয়েই প্রকল্প এলাকার জমির মালিকরা নামমাত্র মূল্যে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হন। হাভেলি প্রপার্টিকে জমি দখল করে দেয় স্থানীয় ওই সন্ত্রাসী ও তার বাহিনী। ২০১৪ সালের ৮ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে নিখোঁজ হওয়ার চার দিন পর ১৪ জুলাই কালশীতে তার মরদেহ পাওয়া যায়। মোমিন বখশ খুন হওয়ার পর ভুক্তভোগী জমির মালিক জইনুদ্দিনকে এবং সংঘর্ষে মোমিন বখশের হাতে নিহত কলেজছাত্র চঞ্চলের আত্মীয়-স্বজনদের সেই হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। তারা এরই মধ্যে গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছেন। মোমিন বখশের মৃত্যুর পর সন্ত্রাসী দিয়ে জমির মালিকদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা বিফল হওয়ায় কয়েক বছর ধরে ভুক্তভোগীদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর শূন্য লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে উপনির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে এমএ আউয়াল প্রথমবার সংসদ সদস্য হন। তরিকত ফেডারেশনের প্রার্থী হিসেবে মহাজোটের মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিবের পদ হারান, দল থেকেও বহিষ্কৃত হন। এরপর জাকের পার্টির হয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হন। কিন্তু ঋণখেলাপের অভিযোগে তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। আবাসিক প্রকল্পের নামে এমএ আউয়ালের জালিয়াতি-প্রতারণার গল্প এখনও লোকচক্ষুর অন্তরালে।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..